অন্য জীবন~পর্ব:১৫

মাসুদ চয়ন

শুভ্র সিলং জঙ্গলের পাশ ঘেঁষে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে একটি ঝর্নার কাছে চলে আসে। ঝর্নাটি বেশ দীর্ঘ। এতোটাই দীর্ঘ যে তার উচ্চতার সীমারেখা দেখা যাচ্ছেনা স্পষ্টতায় । হয়তো মাথাভাঙা পাহাড়ের চূড়ার সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত রয়েছে ঝর্নাটি। ঝর্নার অবিরাম জলধারার দিকে চেয়ে জেঁকে বসা ক্লান্তিতে কিছুটা সুস্থিরতা নেমে আসে তার। শুভ্র ব্যাগ হতে পানির জারটা বের করে ঝর্নার পানি প্রবাহের দিকে এগিয়ে যায়। এই জারটা সাথে করে নিয়ে এসে বেশ ভালো কাজ করেছে সে। প্রায় দশ লিটারের মতো পানি ধারণ ক্ষমতা জারটির।শুভ্র অগ্রসর হয়ে ঝর্নার হাত ছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে। সাঁই সাঁই শব্দে আলোড়ন তুলে তীব্র বেগে বাতাস বইছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে ঝর্নার জল প্রবাহের প্রচন্ড শব্দ। এমন পরিবেশে এর আগে কখনো আসেনি সে। ঝর্নার কাছে এসে নিথর মমির মতন দাঁড়িয়ে থাকে শুভ্র। কারণ পেছন থেকে কে যেনো তাকে চিৎকার করে ডাকছে। চিৎকারের স্বর অস্পষ্ট শোনা গেলেও শুভ্র বুঝতে পারে যে তাকে থেমে যাওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে হাত নেড়ে। শুভ্র ঝর্নার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রচন্ড বেগে বয়ে চলা পানি প্রবাহের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে। এই প্রকৃতি তাকে কাব্যিক উপলক্ষে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। চারিদিকে শুধু জল আর সবুজ। এ যেনো জল সবুজ আচ্ছাদিত নবজন্মা এক পৃথিবী বিস্তৃতি.।
লোকটা শুভ্রের কাছে এসে হাঁপাতে থাকেন। অই জল নিবেননা বাবু! যদি জানে বাঁচতে চান অই জল থেকে দূরে সরে আসুন। লোকটি শুভ্রর হাত ধরে টানতে টানতে জঙ্গলের পাশের মেঠো পথটাতে নিয়ে আসে। এখান থেকে ঝর্নাটা কয়েক’শ গজ দূরে। তাই শব্দটাও অস্পষ্টতায় রুপ নিয়েছে। লোকটি শুভ্রের হাত ছেড়ে দিয়ে মুক্ত নির্মল আকাশের দিকে চেয়ে আছে। আইজ আকাশে ম্যাঘ নাই।ভ্যাঁপসা গরম পরছে খুব। বৃষ্টির খুব দরকার ছিলো বাবু।
শুভ্র ওনার কথায় হ্যাঁ সূচক সায় দেয়।
হুম ঠিক বলেছেন আপনি। চারদিকে এতো এতো বৃক্ষ লতাপাতা! তবুও গরমটা খুব করে জেঁকে বসেছে।
লোকটি বেশ খর্বাকার আকৃতির। উচ্চতা পাঁচ ফুটের মতো। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলাটে। পড়নে খাঁকি পোশাক। দেখে মনে হচ্ছে পাহারাদার বা তেমন কিছু একটা। কিন্তু শুভ্র বুঝে উঠতে পারছেনা এই প্রাকৃতিক গভীর নির্জন জঙ্গলের কেউ পাহারাদার হবেন কি জন্য। এতো জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার মতো কঠিন এক বিরম্বনা। লোকটি পেছনের পকেট থেকে একটা ছোটো আকৃতির বোতল বের করে গলগল করে গিলে ফেলেন সবটুকু।শুভ্র গন্ধ শুঁকেই বুঝে যায় ইহা বাঙলা মদ।
প্রচুর নেশা পেয়েছে বাবু। তাই আপনার অনুমতি না নিয়েই গিলে ফেললাম।ভুল হলে মাফ করে দিয়েন বাবু।
শুভ্র হাত নেড়ে সায় দেয়,ও কিছুনা একটু আধটু খাওয়ার অভ্যেস আমারও রয়েছে। তো আপনার নামটা কি যেনো।
আমার নাম বদরুল আহমেদ। প্রায় সাড়ে তেরো বছর থাইকা এই জঙ্গলে পইড়া রইছি।জঙ্গলী পশুপাখিরাও আমারে চেনে।
তবে ভাই আপনারে দেইখা ট্যুরিস্ট মনে হইতাছে। আবার নিশ্চিত হইবারো পারতাছিনা। ট্যুরিস্টতো দলবল নিয়া আসে, আপনি একেলা। সাথে তেমন লট্টর পট্টরো দেখিনা।
আপনি কি পথ হারায় ফালাইছেন বাবু।পথ হারায় ফালাইলে ভয়ের কিছু নাই। আইজ রাইতটা আমার মাচা ঘরে কাটায় দিয়া পরদিন সড়কে নিয়া গাড়িতে ওঠায় দিতে পারমু আপনারে। শুভ্র লোকটাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়…
তার আর দরকার হবেনা। আমি এই জঙ্গলে বসবাস করার জন্যই এসেছি।তবে মাথাভাঙা পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার তীব্র ইচ্ছে রয়েছে। ওখানে নাকি প্রতি সন্ধ্যায় জ্বীন পরীদের আডডা বসে। আমার খুব ইচ্ছে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করার।
বদরুল বিস্ময় ভরা চোখ নিয়ে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিসব আজগুবি কথা কইতাছেন ভাই!আপনার মাথা ঠিক আছেতো?
হ্যাঁ ঠিক আছে। আমি অবশ্য জ্বীন পরীতে বিশ্বাস রাখিনা। আমার ধারণা জ্বীন পরী বলতে আদৌ কিছু নেই। এসব মানুষের বানানো রুপকথা।
রুপকথা হবে কেনো বাবু! এগুলা তো সত্যি সত্যিই আছে।
শুভ্র বদরুলের কাঁধে হাত রাখে।তোমাদের জন্যই ওসবের প্রতি এতো আগ্রহ আমার।যদিও আমার বিশ্বাসে আমি শতভাগ অটূট।
আচ্ছা বদরুল ভাই তার আগে বলুন আমাকে কেনো ওই ঝর্নার পানি সংগ্রহ করতে বাধা দিলেন?ওই পানি কি পান করার উপযোগী নয়!কেনই বা নয়!দেখেতো স্বচ্ছ সুপেয় মনে হয়েছিলো।
ওই পানি পাহাড়ি জোঁকে ভরা। এ জন্য আপনাকে বাধা দিয়েছি।এতো বেশি পরিমানে জোঁক যে আপনি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারবেননা। জোঁকগুলো বিশাল বিশাল আকারের। এদের শরীরের রঙ পুরাপুরি পানির রঙের মতো।এ জন্য পানির মধ্যে চলাচল করলেও আলাদাভাবে এদের অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায়না।
তাই নাকি!বেশ আশ্চর্যের বিষয় তোহ!
বদরুল ভাই আপনি দেখছি শুদ্ধ ভাষাতেও কথা বলতে পারেন বেশ।
পারি এই আর কি একটু আধটু। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করছিলাম। তয় এখন ভুইলা গেছি।এই জঙ্গলে কথা কওনের মানুষতো পাইনা।
বদরুল ভাই আপনার খাঁকি পোশাকের রহস্য কি উন্মোচন করবেন?
এই পোশাকের পেছনে এক অনেক বড় হিস্টিরি আছে বাবু।
একবার এই জঙ্গলের মধ্যে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পেইন বসছিলো।ক্যাম্প ভাঙ্গার পর যখন সব আর্মি দল বল নিয়া চইল্যা যায়,তখন ভুলোক্রমে তাদের ক্যাপ্টেইন মিসিং হয়া যায়। তিনি পুরা জঙ্গল ঘুরেফিরে বের হওয়ার পথ খুঁজতাছিলেন।চার চারটা জঙ্গলী শিয়াল ঘিরা ফালাইছিলো ওনারে। ওনার জান নিয়া ফিইরা যাওয়ার কথা আছিলোনা। আমি আমার মাইয়্যা নাতাশারে নিয়া খড়ি কাটবার যাচ্ছিলাম।সাথে কুড়ালটা আছিলো ভাগ্যক্রমে। কুড়াল হাতে অনেকক্ষণ জবরদস্তি হইছিলো শিয়ালগো লগে। বাপরে বাপ! এমন খ্যাপাটে শিয়াল বাপের জন্মেও দেখিনাই এ্যার আগে! আমারে সহ ছিইড়া ফালাইবার ফন্দি আঁটছিলো। তারপর অনেক কষ্টে জর্জরিত হইয়া শিয়াল তাড়াইছিলাম।সেনাবাহিনীর ক্যাম্পেট খুশী হইয়া কইছিলো আইজ থাইক্যা তুমি হইলা এই বনের অঘোষিত প্রহরী। তিনি প্রতি বছর গাড়ি নিয়া আমার মাচা ঘরে আসেন। প্রতিবার দুই সেট কইরা এই খাঁকি পোশাক দিয়া যান।
সন্ধ্যা নাইমা আইতাছে বাবু। চলেন আমার মাচা ঘরে যাই। আইজ রাইত না হয় এখানেই কাটাইলেন।

ও আচ্ছা।ঠিক আছে চলুন।
আপনার মাচা ঘর আর কত দূরে?
এখান থাইকা উত্তর দিকে হাঁটা শুরু করমু বাবু।হাফ কিলোমিটারের মতন দূরত্ব। তয় রাস্তা বেশ ভালো।এই রাস্তায় জঙ্গলী জানোয়ার জন্তুর ভয় নাই। ওসব জীব গহীন জঙ্গলের মধ্যে চলাফেরা করে। তয় রাইত বাড়লে জঙ্গলের পাশের এই রাস্তায় চইল্যা আসে। আমি থাকতে আপনি কোনো বিরম্বনায় পরবেননা বাবু। মানুষের লাইগ্যা এই বদরুল জান বাজি রাখে সব সময়। হউক সে চেনা কিংবা অচেনা মানুষ। বদরুল চরিত্রের মানুষটার প্রতি ভালোবাসা ও সন্মান এক নিমিষেই গভীরে পৌঁছে যায় শুভ্রের।
শুভ্র তুলনা করতে থাকে এই বনবাসী মানুষটির সাথে সভ্য সমাজের মানুষগুলোকে।
সভ্য সমাজের মানুষগুলোর কাছে আত্মস্বার্থই মূলকথা। আর এই বনবাসী বদরুল অচেনা মানুষের জন্যও নিজের জীবন পর্যন্ত বাজি রাখতে প্রস্তুত থাকেন।
নির্জন পথ ধরে হেঁটে চলেছে দু’জনে। অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ়ো আকার ধারণ করছে।সেই গাঢ়ো অন্ধকার ভেদ করে পথ চলতে শুভ্রর একটুও খারাপ লাগছেনা।
আকাশে নক্ষত্রের মেলা বসেছে। জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে ঝিঝি পোকার চ্ছিস চ্ছিস নৈশব্দ। মাঝে মাঝে দু’একটা শেয়াল ঝোঁপঝার কাঁপিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে যাচ্ছে এপার থেকে ওপারে।
রাস্তার ডানপাশ ঘেঁষে লেপ্টে আছে নিবিড় নিস্তব্ধ সিলং জঙ্গল।বাম পাশ ঘেঁষে শুধু জল আর জল।জলের অথৈ সমারোহ।
এই জল আচ্ছাদিত বিলটার নাম অবশ্য শুভ্রের জানা নেই। ও বদরুলকে প্রশ্ন করেই উত্তর পেয়ে যায়। বিলটার নাম তুড়ণ বিল।বিলের জলে শাপলা শালুক পদ্ম পরিপূর্ণ শৈল্পিক আবহ টেনে এনেছে।রাতের অন্ধকারেও সেই শিল্পের সতেজতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়ে যায়নি।

আপনার মতামত দিন