অন্য জীবন~ পর্ব: ১০

মাসুদ চয়ন

ধীর গতিতে অন্ধকার বেড়ে চলেছে। ওরা দু’জন জঙ্গলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রর বিস্ময় বিস্তৃতি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। ইমরুল একটু বিশ্রাম নিইরে ভাই,জঙ্গলের মধ্যেতো এসেই পড়েছি।শুভ্রের অনুরোধ মিশ্রিত আবেদনে ইমরুল সায় দেয় ; হ ভাই,একটু জিরিয়ে নেয়া দরকার। এমন ঢালপথ ধরে এক নাগারে ত্রিশ মিনিট ধরে হাঁটতেছি। অতঃপর তারা জিরিয়ে নেয় মিনিট দশেকের মতো। তারপর আবারও কিছুক্ষণ রাস্তার ঢাল ধরে হেটে জঙ্গলের মধ্যে চলে আসে। চারদিকে শুনসান নিস্তব্ধতা। ভীষণ অন্ধকারে সবুজ বিচরিত চারপাশকে কাল্পনিক বিভ্রাটের মতো মনে হচ্ছে। জঙ্গলের আশেপাশে প্রায় দু’তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোনো লোকালয়ের অস্তিত্ব নেই। এমনিতেই অন্ধকার রাত্রি,তার উপর নেমে এসেছে নিঝুম নিস্তব্ধতার অস্পষ্ট শব্দ বিভ্রাট। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে ধেয়ে চলা রাস্তাটি গ্রামীণ মেঠো পথের মতো মোটামুটি প্রশস্ত। তবে পথটি ছোটো আকৃতির জঙ্গলাকীর্ণ উদ্ভিদ দ্বারা আচ্ছাদিত। ঝিঝি পোকার ডাক অনেকক্ষণ হতে শোনা যাচ্ছে। আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন ; মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শিরিশিরি নিঃশব্দ অনুরনন তুলেছে হিমেল বাতাস। ইমরুল তার হাতের টর্চ লাইটটা ইতিমধ্যে জ্বালিয়ে নিয়েছে ; উত্তরসূরী হয়ে পথ চলার নির্দেশনা দিয়ে চলেছে সে। শুভ্র ইমরুলের পিছু ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তুইতো মারাত্মক সাহসী ছেলেরে ইমরুল! বিশ্বাস কর ভাই এমন ভয়ংকর রাস্তা দিয়ে একা যাওয়ার সাহস কখনোই হতোনা আমার। ইমরুল শুভকে সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ করে ; শুভ্র ভাই মাথা উঁচু করে পথ চলছেন কেনো! দেখছেন না পথের দু’ধারে কচু গাছের সাড়ি। ওগুলো কিন্তু নালার মধ্যে পড়েছে। একটু অসচেতন হলেই নালার মধ্যে নাকামি চুবানি খেতে হবে। পুরো নালা ভর্তি কাদায়। তা তো দেখতেই পাচ্ছিরে ইমরুল। রাস্তার দু’ধার দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে দু’টি নালা। নালার ওপার আর এপার ছড়িয়ে রয়েছে গহীণ জঙ্গলে।
শুভ্রকে ইঙ্গিত করে ইমরুল প্রশ্ন করে ; এই কচুর জাত নাম কি বলেনতো ভাই?
তাতো বলতে পারবোনারে ইমরুল। তুই কি জানিস?
হুম জানি ভাই..
এ হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত এক সবজি। শহরে প্রচুর চাহিদা রয়েছে।
এ কচুর জাত নাম হলো বাক্স কচু। শুটকি মাছ দিয়ে রান্না করলে অদ্ভুৎ সুন্দর এক গন্ধ তৈরি হয়। খেতেও দারুণ লাগে ভাই। তবে সংগ্রহ করাটা বেশ ঝামেলার।
সমস্যাটা কিসের রে ইমরুল!
দু’ধরনের সমস্যা আছে ভাই। প্রথম সমস্যা হচ্ছে মোটা মোটা জোঁক। রক্তের গন্ধ পেলেই এরা কিলবিলিয়ে ছুটে আসে। আমাদের গ্রামের ভাষায় এই জোঁককে ভৈশালী জোঁক বলা হয়। প্রচুর রক্ত চুষে নেয় ভাই।
প্রথম সমস্যাটা বেশ ভয়ংকর। এখন দ্বিতীয় সমস্যাটা বল।
ভাই দ্বিতীয় সমস্যাটা আরও ভয়ংকর। এই পানিতে প্রচুর চুলকানি আছে। পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই চুলকানির তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়।
শুভ্র বিস্মিত হয়ে ইমরুলের দিকে তাকিয়ে আছে। এতো চুলকানি কোথা থেকে এলোরে ইমরুল।
কচু গাছেই তো চুলকানির আখড়া ভাই। ওই কচুগাছগুলো পঁচে কাদার সাথে লেপ্টে যায়। এভাবে বারবার পঁচনের ফলে চুলকানির তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়।তবুও দূরের গ্রাম থেকে কিছু দরিদ্র পরিবার ভোরবেলা এই কচু সংগ্রহ করতে আসে। দুপুর পর্যন্ত অনেক কষ্টে যা সংগ্রহ করে তা গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করে ।
এভাবে গল্প গুজবে পথ চলতে চলতে ওরা সেই প্রশস্ত নালার সামনে এসে পড়ে। নালার কিনারে বেঁধে রাখা ভ্যালাটা দেখে ইমরুলের মনে হাসির ঝিলিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুভ্র ভাই ভ্যালাটা বেশ চওড়া বুঝলেন ; দুইজন মানুষ অনায়াসে উঠে বসা সম্ভব। এই বলে বাঁশের লাঠিটা হাতে নিয়ে এক লাফে সে ভ্যালায় উঠে বসে।
কি হলো ভাই,ভয় পাইতাছেন ক্যান! আরে ভাই উইঠ্যা পড়েনটা। আরও দুইজন উঠলেও এই ভ্যালা ডুববেনা। শুভ্র ভ্যালায় উঠে বসে পড়ে। ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে। সন্ধ্যা সাতটা ত্রিশ বেজে গেছে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ইমরুল খুব দ্রুততার সাথে বাঁশের লাঠি দিয়ে বইঠা বাইছে। ভ্যালাটা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। নালার মধ্যে জন্ম নিয়েছে শাপলা শালুক,কলমি লতা। দেখে মনে হচ্ছে উহাদের ঝাঁক যেনো পুরো নালার বিস্তৃত এলাকাকে দখল করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে দু’একটা সাদা বক কালো পানকৌড়ি চোখে পড়ছে
চারদিকে প্রচুর বাতাস বইছে। শুভ্রের কাছে বেশ উপভোগের মনে হচ্ছে এই সময় পরিক্রমা। এভাবে দেখতে দেখতে পনেরো বিশ মিনিট সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। ভ্যালাটা তুরাগ নদের প্রবেশ মুখে এসে থেমে যায়। ইমরুল ভ্যালাটাকে পানি থেকে ডাঙ্গায় টেনে তোলে। ভ্যালাটাকে টানার সুবিধার্থে তার সাথে একটা মোটা রশি বেঁধে নিয়েছে। তারপর টানতে টানতে জঙ্গলের কাছে এক গর্তের মুখে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয়। গর্তের মুখে ঝোপঝাড় ঘাস লতাপাতা গুজে দেয়; যাতে অচেনা কারোর দৃষ্টিগোচর না হয় ভ্যালাটা। শুভ্র খুব মনোযোগের সাথে ইমরুলের কার্জ পরিক্রমা লক্ষ্য করছিলো। তারপর একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ইমরুলের কাধে হাত রেখে তাকে বিজয় সূচক সম্ভাষণ জানায়। শাবাস ইমরুল!
শাবাস!
তোর কাজের গতি পরিক্রমা ও নিখুঁত কৌশল দেখে আমি আজ মুগ্ধ হয়েছি।
মিনিট পনেরোর হাটা দূরত্ব অতিক্রম করে ওরা দু’জনে ইমরুলের কাঁশের ঘরে পৌঁছে যায়।
ভীষন পিপাসা পেয়েছেরে ইমরুল। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আয়না ভাই। ইমরুল বাহিরে রাখা মাটির কলসি থেকে এক গ্লাস পানি এনে শুভ্রের হাতে তুলে দেয়। এক চুমুকে পানি শেষ করে ফেলে শুভ্র।
এ কি খাওয়ালি আমাকে ইমরুল!
এতো পানি নয় যেনো এক গ্লাস শীতল প্রশান্তি।
ইমরুল শুভ্রের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। ভাই এটা মাটিয়া কুয়ার পানি। আপনারা যে রেফ্রিজারেটরের পানি পান করেন,এটা তার চেয়েও সুস্বাদু।
আজ আমার এই ঘরেই থাকতে হবে বুঝলি। ট্রিপলটা বিছিয়ে নিতে হবে।
ইমরুল শুভ্রকে একটা কাঠের পিড়ি এগিয়ে দেয়। আপনি এখানে বসে থাকেন শুভ্র ভাই। আজকেতো আবহাওয়া বেশ পরিচ্ছন্ন। ঠান্ডা হাওয়া বইছে বেশ।
তুই কি এখন রান্না করবি?
ইমরুল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে।
শুভ্র ওকে উৎসাহিত করে! আমারও প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে।বেশি কিছু করার লাগবেনা..
ডিম থাকলে ভেঁজে নে,ওতেই হয়ে যাবে।
এ রাতটি ইমরুলের কাঁশের ঘরেই কাটিয়ে দেয় শুভ্র। অবশ্য মধ্যরাতে তাদেরকে মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। প্রচন্ড দমকা বাতাসে কাঁশের ঘরটা পাখির বাসার মতো দুলতে আরম্ভ করেছিলো। দু’জনেই ভয়ে কুঁকড়ে উঠেছিলো। তবে বিপর্যয় ঘটার আগেই ঝড় থেমে গিয়েছিলো।
পরদিন ভোর সকালে ইমরুল মাছ শিকারে বেড়িয়ে পড়ে। শুভ্র তুবাদের বাসার দিকে রওনা দেয়। পথে তোয়াব আলীর মেয়ে তসলিমার সাথে দেখা হয়।শুভ্রকে দেখে তসলিমা সালাম ঠুকে দাঁড়িয়ে পড়ে। শুভ্র ভাই আপনি! এ গ্রামে কি করে ঢুকলেন! চারপাশেতো সেনাবাহিনীর সদস্য টহল দিতাছে। শুভ্র সবকিছু খুলে বললে তসলিমার সংশয় দূর হয়ে যায়। তসলিমা শাঁড়িতে তোমাকে সুন্দর মানিয়েছে। তসলিমা অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে নিমিষে.. শুভ্র ভাই শাড়ি তো শখ কইরা পড়িনাই। আমারে পড়তে বাধ্য করছে!
হঠাৎ অশ্রুসিক্ত তসলিমার চোখের দিকে কয়েক মিনিট নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শুভ্র। তারপর সেই তীব্র সংশয় বুকে চেপে ওকে প্রশ্ন করে। তোমার বিয়ে হয়েছে তাইনা?
হুম শুভ্র ভাই। রুহুল চেয়ারম্যানের সাথে। মায়ের খুব অসুখ হইছিলো। চেয়ারম্যান কইছিলো তারে বিয়া করলে চিকিৎসার ব্যবস্থা কইরা দিবো। বিয়া হইলো। ব্যবস্থা করবে করবে বইলা এক সপ্তাহ কাটাই দিলো।ব্যবস্থা আর হয়নাই শুভ্র ভাই। তার আগেই মা মইরা গ্যাছে।
কেদোনা তসলিমা। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তোমার ভবিষ্যৎ এখন তোমাকেই ঠিক করতে হবে। যেহেতু বিয়ে হয়ে গেছে সেহুতু ওটাই এখন তোমার বাড়ি। তবে অমন বয়স্ক এক ব্যক্তির সাথে এতো অল্প বয়সে তোমার বিয়ে হয়েছে,বিষয়টা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তোমার সাথে কি চেয়ারম্যান শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন করেছে?
তসলিমা লজ্জানত মস্তকে হাঁ সূচক সাই দেয়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পুঁজিপতিরা নারীর শরীর ভক্ষণ করে এক রকম নিস্বর্গীয় সুখ লাভ করতে চায়,সেই নারী যদি কিশোরী বা শিশু হয়, তাহলে তাদের সন্তুষ্টির মনন আকাশ নিবিড়তায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আরও কয়েকশ গুন।যেনো তারা স্বর্গকে হাতে পেয়েছে; জীবন্ত স্বর্গটা যখন তার হাতের মুঠোয় তখন সে স্বেচ্ছাচারী হয়ে তার রুপ রস আচ্ছাদন করবে ;তারপর বিস্ময়!  সত্যিই একাকাশ বিস্ময়। সুখ পঁচে গেলে বা নিঃশেষ হয়ে গেলে তাকে তারা ছুড়ে ফেলে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনা। সাবধানে থেকো বোন।সংগ্রাম করে বেঁচো।

আপনার মতামত দিন