অপেক্ষা করে প্রস্তুতি নিতে হয় পরবর্তী ট্রেনের জন্য !

 অনুপ্রেরণার গল্প ও নাহিন স্যার

মিশকাত রাসেল

করোনার এই মহামারী কেড়ে নিলো একটি তাজা প্রাণ। প্রিয় শিক্ষকের জীবন। যিনি নিতেন আমাদের বাংলা ক্লাস। পরবর্তীতে হয়েছিলেন প্রধান শিক্ষক। দাদার নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের শিক্ষক প্রধান। আমাদের প্রাণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলহাজ্ব ধনাই বেপারী মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের। আজ সেই আমজাদ হোসেন নাহিন স্যারকে নিয়ে একটা স্মৃতিচারণ করছি। তখন ২০১১ সাল। এসএসসির টেষ্ট পরীক্ষা দিয়েছি। প্রায় সবকটি বিষয়ের পরীক্ষা ভালো হলেও ইংরেজি আর গণিত ভালো হয়নি। আমাদের সময়ে গণিতের নতুন সৃজনশীল পদ্ধতি শুরু হয়েছে। সৃজনশীল বলতে তেমন কিছু বুঝি না। শিক্ষকরাও তখন এ নতুন পদ্ধতিতে ট্রেনিং নেননি। নিজেরা যতটুকু বুঝেন সেই অনুযায়ী ক্লাস নিতেন। আমাদের ক্লাস নিতেন আব্দুল বাসেন বিএসসি স্যার। তিনি গণিতের নামকরা শিক্ষক। সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সবার প্রিয়। উনার কোনো মেয়ে সন্তান নাই। তাই হয়তো মেয়েদের বেশি স্নেহ করতেন। তাদেরকে বিশেষভাবে ক্লাসে গণিত বুঝিয়ে দিতেন। যথারীতি টেষ্ট পরীক্ষার রেজাল্টের পর দেখা গেলো আমি গণিত আর ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছি। মানে, ফেল মেরেছি। ইংরেজিতে এমনিতেও আমি খুব কাঁচা। রেজাল্ট দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছে। তখন কৈশোর বয়স। নানান অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ ভাবনা মাথায়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর লেখাপড়া করবো না। বাড়ি থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবো। কি লজ্জ্বা!
কিন্তু দেখা গেলো আমার সাথের অনেকেই তিন-চার বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েও রেজিষ্ট্রেশন করছে। এসব দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলাম। চিন্তা করলাম রেজিষ্ট্রেশন করতে পারলে লেখাপড়ায় মন দিবো। ভালো করে পড়ে ফাইনাল পরীক্ষাটা দিবো। এ জন্য এক ভোরে মা’কে নিয়ে গেলাম আব্দুল আউয়াল (বাংলা) স্যারের কাছে। তিনি সম্পর্কে আমার মায়ের জেঠাতো ভাই হন। তাই মা বিশেষ আশ্বাস নিয়ে উনার কাছে গেলেন। আমাদের দেখেই তিনি এমন ভাবে তাকালেন মনে হচ্ছিল আকাশ দেখছেন। ভ্রু জোড়া কুঁচকিয়ে কপালে ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মা’কে, ‘কি অইছে?’
উত্তরে মা বললেন, ‘রাসেলের ফরম ফিলাপের লাইগ্যা কতা কইবার আইছি।’
তিনি মুখ ভেঙচিয়ে বললেন, ‘অ। আমার এনো আইছত ক্যা? হুম! আমি এইত্তা জানি না। আমার অনেক কাম। গরু ফার্মো নিমু। ইশকুল যামু।মাস্টর্নি….অ মাস্টর্নি…’ ডাক পারতে পারতে তিনি চলে গেলেন। আমাদের দিকে ফিরেও তাকালেন না। আমি আগেই জানাতাম কোনো লাভ হবে না। তবুও কেনো জানি আমাদের নানাবাড়ি পরিবারের সবাই কিছু হলেই দুইটা মানুষের কাছে যায়। খুব যায়। গিয়ে বারবার প্রতারিত হয়। তবুও যায়।
মা হাল ছাড়লেন না। দৌড়ালেন আরেক বাড়িতে। আব্দুল বাতেন স্যারের কাছে। সম্পর্কে মা’য়ের বড় বোনের ছেলে। মা গিয়ে স্যারকে বললেন, ‘মামু, আমনের ছোডু ভাইয়ে পরীক্ষা দিতো চাইতাছে।’
তিনি মা’র একথা শুনে আমার দিকে তাকালেন। আমিও তাকালাম। চোখে চোখাচোখি হয়ে গেলো। আমার মনে পড়ে গেলো একদিনের কথা। একবার এক বিশেষ পরিস্থিতিতে স্যারকে সাবাহ্ গার্ডেনে দেখে ফেলেছিলাম। ভিতর থেকে হাসি পেলো। হাসলাম না। তাকিয়েই রইলাম। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে চোখমুখ খিচিয়ে বললেন, ‘খালা, এই শয়তানডা তো গারো পাড়া পইড়া থাহে। ডাইল খায়।’
এ কথা শুনে আমার সহজসরল মা বললেন, ‘এল্যা মামু! ডাইল খাওয়া হিয়াইছে তো ছাত্তার মামু তাবলীগ জামাতো নিয়া।’
‘বেডি, এই ডাইল হেই ডাইল না।’
‘বাড়িত তো আমি মশারির ডাইল আর মাসকলাইয়ের ডাইল রান্দি। রাসেলে তো মাসকলাইয়ের ডাইল খাইতো চায় না।’
মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে তিনি আর কিছু বললেন না। মুখে খুড় চালাতে থাকলেন বয়স ঢাকার জন্য। আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসলাম। এসে বাড়িতে বসে আছি। নানান চিন্তা মাথায়, বাড়ি থেকে দূরে পালিয়ে যাবো। আপন মানুষেরা যা অপমান করেছে! আত্মহত্যা করবো। বেঁচে থাকার প্রয়োজন নাই। এমন অদ্ভুত চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ দুপুরের দিকে মাথায় আসলো নাহিন স্যারের কথা। মা’কে বললাম। মা তখনই আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন। প্রায় বিকেলের দিকে গিয়ে উঠলাম স্যারের বাড়িতে। স্যার বাড়িতে নাই। স্যারের স্ত্রী আমাদের বসতে দিললেন। খেতে দিলেন দুটি রসগোল্লা। বললেন, ‘নাহিন স্যার বোর্ডে গেছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের টাকা জমা দিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করতে।’ তখন লাইনে দাঁড়িয়ে বোর্ডে কাগজপত্র জমা দিতে হতো। এবার আমার আর কোনো আশা রইলো না। অজান্তে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এমনটা দেখে নাহিন স্যারের স্ত্রী আমার কাছে আসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। স্যারকে ফোন দিয়ে বললেন কথা বলতে। আমি কথা বলতে পারছিলাম না। বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছিলো। ওপার থেকে স্যার বলতে থাকলেন, ‘হারামজাদা এমনিতে তো খুবই বদমায়েশি করতে পারছ। সারাদিন সামনে সামনে থাকতে পারছ। টেস্টের রেজাল্ট দেওয়ার পর থেকে তো তরে স্কুলে একদিনও দেহি নাই। তরে জুতাইয়্যা লাম্বা বানামু আমি। পুলাপান তিন-চার বিষয়ে ফেইল কইরা রেজিষ্ট্রেশন করছে। আর তুই আইছত অহনে।’ এটুকু বলে তিনি থামলেন। আমি শব্দ করে কেঁদে দিলাম। স্যার আবার ধমক দিলেন। আমি কান্না থামালাম। নিচু স্বরে তিনি কয়েকটা কথা বললেন, ‘বাবারে, জীবনটা রেলগাড়ীর মতো। আমরা হচ্ছি যাত্রী। অনেক সময় নানান করনে প্রত্যাশিত ট্রেন ধরতে পারি না। তাই বলে জীবন থেমে থাকে না। অপেক্ষা করে প্রস্তুতি নিতে হয় পরবর্তী ট্রেনের জন্য।’ এটুকু বলে তিনি ফোন রেখে দিলেন। না-কি কেটে গেলো বুঝতে পারিনি। কিন্তু স্যারের এই কয়েকটি কথা হৃদয়ে গেঁথে গেলো। পড়ায় মন দিলাম। নিয়মিত ক্লাস করতে থাকলাম। তখন আমাদের গণিত ক্লাস নিতেন তোফাজ্জল স্যার। আবার সময় মতো পরীক্ষা দিলাম। টেষ্ট পরীক্ষায় সবগুলো বিষয়ে কৃতকার্য হলাম। তখন আমার স্যারের সেই কথাটি মনে পড়ে গেলো,’অপেক্ষা করে প্রস্তুতি নিতে হয় পরবর্তী ট্রেনের জন্য।’

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আলহাজ্ব ধনাই বেপারী উচ্চ বিদ্যালয় (ব্যাচ-২০১৩)

পড়ুন: https://porichoy.net/ব্যাঙ্গমা-আর-ব্যাঙ্গমির/

আপনার মতামত দিন