অপেক্ষা

মোঃ আলাউদ্দীন

বছর দুই আগে থেকে পিতৃহারা কামাল ও মারুফ। সংসার চালাতে তাই তাদের মা রহিমা বিবি অন্যের বাড়িতে ছোটখাট কাজ করে। ছোটভাইটার পড়াশোনা মাস তিন চলেছিল বড় ভাই কামাল গার্মেন্টস এ চাকরি নেওয়ার ফলে। কিন্তু মায়ের হঠাৎ শ্বাসকষ্টের সমস্যাটা বেড়ে যাওয়ায় মারুফের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তারপরে গ্রামের বড়বাজারে একটা চায়ের দোকানে সেও কাজ নিল।
মাস ছয়েক হল পরিবারের অবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য করোনা ভাইরাস যেন সব এলোমেলো করে দিয়েছে আবার। মাত্রই নিজেদের মত বাঁচতে শেখা এ যোদ্ধারা এখন নতুনভাবে যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মরণব্যাধী করোনা ভাইরাসের জন্য সব গার্মেন্টস বন্ধ হওয়ায় কামাল এখন বাড়িতে। কি করবে ঠিক ভেবে উঠতে পারছিল না। ছোটভাইটার চায়ের দোকান তখনও চলছিল বলে তিনজনের পরিবার মোটামুটি চলছিল। কিন্তু দোকানপাট সব বন্ধ হওয়ায় দুজনেই এখন বাড়িতে বেকার।
অসুস্থ মা এখনও অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারটা চালানোর চেস্টা করছে। যে বাড়িতে কাজ করত তারা দুইদিনের মত চাল, ডাল এবং অন্যান্য সামগ্রী দিয়েছে। দুদিনের তা দিয়ে চারদিন করল কামালের মা। একটু হলেও যেন বিরক্ত মা ছেলেদের উপর। রাগের সুরে একদিন কামালকে বলেই ফেলল যে,
-“জন্ম দিয়েছি এখন নিজের পথ নিজে দেখে নে”। কামাল মাথা নিচু করে সব শুনল। আবার তার মা বলল,
-“খাবার না যোগাড় করতে পারলে নিজে মর নাহয় আমাকে মেরে ফেল”।
কামাল আর সহ্য না করতে পেরে বাড়ি থেকে একদিকে বের হয়ে গেল। সেদিনের মত ঝগড়া এ পর্যন্ত শেষ করে ঘরের একটা খুঁটি ধরে কাঁদতে লাগল।
এরমধ্যে খবর এলো গার্মেন্টস পুনরায় খুলবে। কোনভাবে ট্রাকে করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পরদিন মাঝরাত হয়ে গেল। যেয়ে শুনতে পেল গার্মেন্টস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ে গেল কপালে। গত মাসের বেতনও পায়নি এখনও। এ অবস্থায় বাড়ি যাওয়ার সম্বল বলতে কাছে দুইশ ষাট টাকা অবশিষ্ট। সবার মত তাই সেও বেতনের ভরসায় সেও অপেক্ষা করতে লাগল। রহিমা বিবিও পাশের বাড়ির সাত্তারের নিকট থেকে শুনল সব। মা তো মা-ই। সাত্তারের মোবাইল থেকে মিনিট তিনেকের মত কথা বলে কামালের খোঁজখবর নিল। কথা শেষ হলে আবার কাঁদতে কাঁদতে রওনা দিল বাড়ির দিকে।
এদিকে বাড়ির অবস্থা আগের থেকে খারাপ। চক্ষুলজ্জায় কারো কাছে কিছু বলতেও পারেনা কামালের মা। মাঝে একদিন ক্ষেতে ধান কাটতে গিয়েছিল মারুফ। কিন্তু ছোট বলে পরদিন আর কাজে নেয়নি তাকে। একদিনের মজুরি দিয়ে চলল আরো দুদিন কোনমতে। কামালের কাছে যা অবশিষ্ট ছিল তাও শেষ হয়েছে প্রায়। এই অবস্থায় বাড়িতে ফেরার অবস্থাও নেই। তাই অপেক্ষা করতে লাগল।
পরিবারটার জন্য মায়ের চিন্তার শেষ নেই, দুচোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। এভাবে কখন যে একটু চোখজোড়া লেগে এসেছিল টেরই পায়নি। দরজায় ঠকঠক শব্দে ঘুম ভাঙল তার। দরজা খুলে দেখল পোশাক পরা দুজন পুলিশের সদস্য হাতে একটা ছোট প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর কিছু নগদ টাকাসহ সেগুলো দিয়ে পুলিশ সদস্যরা চলে গেল এবং যাওয়ার সময় একটা মোবাইল নম্বর দিয়ে গেল এই বলে যেন খাবার শেষ হলে এই নম্বরে যোগাযোগ করে আর বড় ছেলেকেও নম্বরটা দেয়।
কতক্ষণ কামালের মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে টেরই পায়নি। ভাবতে থাকল কবে যে এই অবস্থা থেকে সে মুক্তি পাবে। ভাবতে ভাবতে একসময় একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো “আল্লাহ! তোমার এই বান্দাদেরকে তুমি সকল বিপদ থেকে হেফাজত কর…”

আপনার মতামত দিন