ইস্রাফিল আকন্দ রুদ্র’র লেখা ছোট গল্প ‘না’

ইস্রাফিল আকন্দ রুদ্র

নয়নের ঘুম ভাঙে তার মায়ের ডাকে, নয়ন অবাক হয় মা আজ তাকে এতো নরম স্বরে ডাকছে কেন! “নয়ন ,নয়ন,তোর বাপের যেনো কী অইছে।চখ উল্টাইয়া দিতাছে, শরীর কাপতাছে, তাড়াতাড়ি উঠ বাপ “- তার কান ও মায়ের উচ্চারণ করা শব্দকে বিশ্বাস করতে পারছে না।দৌড়িয়ে বাবার রুমে গেল। যাওয়া মাত্রই বাবা চাতকের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। বাবার মনে তখন– নয়নের ছোট্টবেলা। সাইকেলে করে প্রতি বৃহস্পতিবার বাজারে নিয়ে যাওয়া, কাঁধে নয়নকে আর কোমরে কিংবা এক হাতে কলসি নিয়ে নদী থেকে পানি আনা, দীর্ঘ রাত পর্যন্ত পাশে রেখে গল্প বলা, ঈদের কাপড় কিনে দিতে না পারায় ধানক্ষেতের আইলে বসে কাঁদা। কোনো সুখ দিতে পারেনি নয়নকে। শোকে শোকার্ত করেছে নয়নের জীবন। শেষমেষ বাবা তৃষ্ণার্ত কন্ঠে বললো “বাপরে আমারে মায় ডাকতাছে ,আমি যাই।” এরপর আর কোনো কথা, কোনো শব্দ নেই । একদম নিশ্চুপ । রাতের মতো। সমীর চাচা ডান হাত দিয়ে বাবার চোখ বুজে দিলো। যে চোখ একসময় কাঁদতো,হাঁসতো ,রাগতো সেই চোখ আজ থেকে সারা জীবন এর জন্য স্তিমিত।নয়ন মানতেই পারছে না কিছুতেই, বুঝতেই পারছে না কী হলো! কী থেকে কী ! মায়ের শোকে কেঁদে শান্তি পাওয়া যায় বাবার শোকে কাঁদাও যায়না; আজন্ম নিরবে বয়ে যেতে হয় কষ্টকে।

দুঃখে কেটে যায় চল্লিশ দিন। বাবার আত্মার মাগফিরাত এর উদ্দেশ্যে আজ বাসায় মিলাদের আয়োজন। ব্যবস্থা যৎসামান্য। হুজুর, তিনজনেষষ মুরব্বি, সমীর চাচা,মা ও নয়ন। সমীর চাচা নয়নদের বাসায়-ই থাকে।বিয়ের সাতদিন পরই সমীর চাচার স্ত্রী পালিয়ে গেলো আরেক নাগরের সাথে।সে থেকে সমীর চাচা একা।একা বলা ভুল হবে , নয়ন ও তার পরিবারের একজন স্থায়ী সদস্য।আজ দশবছর হয় তাদের সাথে থাকছে, খাচ্ছে ।সচারচর এ যুগে এইরূপ বন্ধন সহোদরদের মধ্যে দেখা যায় না । মানুষ যত বড় হয় ভাই বোনের সাথে সম্পর্ক ততই দূর্বল হতে থাকে। ছেলেবেলায় একজন আরেকজনের প্রাণ থাকে -যতই ঝগড়া থাকুক। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রাণ গুলো মান হারায়।এটাই হয়তো প্রকৃতির রীতি নীতি।সেদিক থেকে সমীর চাচার সাথে সম্পর্ক এখনও যথেষ্ট সবল।

নয়ন এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য পুরো দমে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাবার মৃত্যু শোক কিছুতেই কাটছে না ! এর মধ্যে আরেক চিন্তা প্রায়শই হানা দেয় , পরীক্ষার ফলাফল যেনো কী হয়।এ ভয়টা মনের মধ্যে সর্বক্ষণ গুনগুন করে। অবশ্য আরেকটা ভয় তো আছেই, তারিনকে হারানোর ভয় ! তারিনের বাবার অর্থ সম্পদ অঢেল।কী যেনো ব্যবসার সাথে জড়িত।তারিন নিজেও জানে না। বাংলা সিনেমার মতো যেনো তাদের পরিস্থিতি না হয় এর জন্য মন খুলে দোয়া করে । বড়লোক নায়িকা , গরিব নায়ক।তারিনরা বিত্তশালী ,আর নয়নরা অর্থহীন। কোনো দিকেই শান্তি পাচ্ছে না নয়ন। সবদিকেই হারানোর ভয়, একাকিত্বের ভয়।

নয়নের ভাবনার সাগরে অবগাহন- তারিনের সাথে বিকাল পাঁচটায় দেখা করার কথা। রোজার মাস। মেজাজ এমনিতেই খিটখিটে,তিন মাইল হেঁটে বারেকপুর গ্রামে পৌঁছালো। পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তারিনের নানান কথা, বকাবকি, রাগারাগি-ঝগড়ায় মাখামাখি।তারিন-নয়ন জানে শতকোটি বছর ঝগড়ার পরও তারা মুখোমুখি বসে থাকবে।কেউ কাউকে ছাড়বে না। ঝগড়া এক প্রকার ভালোবাসা।ঝগড়া ছাড়া কোনো সম্পর্ক এগোয় না।যে সম্পর্কে ঝগড়া নেই, বুঝতে হবে সে সম্পর্ক একটা ভুল সম্পর্ক।নয়ন তারিনকে বললো আমাকে সবদিক থেকে ভয় আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরেছে। বাবাকে হারিয়েছি চিরতরে।এবার তোমাকে হারানোর ভয় করছে। জানো পিচ্চি ছেলেও তোমার দিকে তাকালে আমার ভয়ংকর রকম হিংসে হয়,কেউ তোমার সাথে হেঁসে কথা বললে ইচ্ছে করে তার দাঁতগুলো ভেঙে ফেলি। তুমি মারা গেলে সে শোক হয়তো কাটানো যাবে কিন্তু অন্যের হয়ে গেলে তা মানবো কীভাবে?অন্যের ঠোঁটের স্পর্শ পাবে, অন্যের হাতের স্পর্শ তোমার স্তন, যোনিতে বিরাজ করবে, কাম বাসনার সঙ্গী হবে! ‘না ,না ,না’ আমি মানতে পারছি না; পারবো না(কান্না শুরু করে দিলো নয়ন)। প্লিজ আমাকে ছেড়ে কোথাও যেয়ো না।থাকতে পারবো না। সবশেষে দিন পেরিয়ে তুমিই আমার অসুখের ওষুধ। তারিন জড়িয়ে ধরে কান্না!না , তুমি আমাকে হারাবে না। আজন্ম আমি তোমার ভালোবাসার হুকুমদার হয়ে থাকবো। আমি তোমাকে হারাবো না । এতো গুলো ‘না’! হয়তো থাকার আকাঙ্ক্ষা।অথচ এই ‘না’ – শব্দের মাধ্যমে রোজ অগোচরে কতশত সম্পর্ক ভেঙে যায় কেউ রাখে না তার খোঁজ।এই একটাই ভয় নয়নের মনে। ভাবনার ডুব থেকে ভেসে উঠে ইমনের ডাকে।ইমন নয়নের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। পাশাপাশি বাড়ি।বেড়ে উঠা একসাথে।এক প্লেটে খাবার খায়, একজনের ভেতর আরেকজনের প্রাণ ভোমরা!ইমন বলে চল বটতলায় যাই।

নয়ন সন্ধ্যার পরপরই বাসায় আসে। নিরবে বসে কিছুক্ষণ ভাবে বাবা,মা ও তারিনের কথা।মা তাকে কতটা ভালোবেসেছে,কতটা কষ্ট দিয়েছে।বাবা তার জন্য কষ্ট করেছে।তারিন তাকে ছাড়বে না, কোনো ‘না’ শব্দের অজুহাতে ,এটা তার তীব্র বিশ্বাস। ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ হয়ে যায়, কান্না পায়।মায়ের ভালোবাসা ও মন্দ বাসা।মাকে ডাকছে মা,মা, ও মা। সাড়াশব্দ নেই।ঘরেও নেই, সমীর চাচার রুমও বাহির থেকে ছিটকিনি দেওয়া।মা ও সমীর চাচা পালিয়েছে।সৎ মা।সৎ অর্থ ভালো অর্থাৎ সৎ মা মানে ভালো মা , কিন্তু তা তো না। আপন মায়ের ভালোবাসা ,সৎ মায়ের
মন্দ বাসা।নয়ন বুঝতে পারলো তেপান্ন দিন আগে খুব ভোরে নরম স্বরে ডাকার কারণ।বাবা পাগল ছিল না।আড়ালে আবডালে সৎ মা ও সমীর চাচা বাবাকে অত্যাচার করে পাগল করে তুলেছে। বাবা বলেছিল ‘আমারে মায় ডাকতাছে’,নয়ন বুঝতে পারলো তার বু নয় তার মা ডেকেছে-এটাই বুঝিয়েছে বাবা। এতদিনে স্পষ্ট মা আত্মহত্যা করেছে সমীর চাচার-ই কারণে। লোকমুখে প্রচলিত বাবা তিনবছর গঞ্জে থাকা সত্ত্বেও মায়ের গর্ভে সন্তান,নয়ন বিশ্বাস করেনি।এ অবিশ্বাস আজ বিশ্বাস হলো! সাতদিন পর আরেক শোকের ছায়া বক্ষ ভেদ করে ফুটে উঠেছে-ইমন ও তারিন পালিয়ে বিয়ে করেছে।অবশ্য ‘না’ শব্দটি তারিন বললো ‘না’ , কিন্তু বিশ্বাস যে রাখতে পারলো ‘না’।ইমন তার প্রাণ ভোমরা , কিন্তু ‘না’!

নয়ন উচ্চ মাধ্যমিকে রাজশাহী বোর্ডে প্রথম হয়েছিল।অথচ সে আজ অর্ধশতাধিক মামলার আসামি;শহরের শীর্ষ সন্ত্রাসী নয়ন। নয়’না’ তাকে ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েও ভালো পথে আনতে পারছে ‘না’। কারণ সে যে কাউকে আর বিশ্বাস করে ‘না’।কেটে যায় তার জীবন,কারো ভালোবাসায় যে কাটে ‘না’ !

 

আপনার মতামত দিন