ঈশ্বরের প্রেমিকঃ সুফিতত্ত্ব, বাউল ও বৈষ্ণব দর্শনের মিথস্ক্রিয়ায় সর্বজনীন প্রেমকথা

  • আব্দুস সবুর

রাজু অনার্য। অসামাজিক পদাবলি’র কবি এবং বাউলতত্ত্ব ও বাউল শব্দকোষ প্রণেতা। বিচরণ করেন দর্শনের গূঢ়লোকের আলো-আঁধারি রহস্যাবৃত জগতে। সেই পথে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যান সুফিদের সাকি,সুরা আর তন্বাঙ্গিনী রূপসীর ঘুঙুরের নিক্বণে আবেশ ঘেরা মজলিশে, বাউলের ইরা-পিঙ্গলের রহস্যলোকে আর বৈষ্ণবের মথুরার শ্রীবৃন্দাবনে ! কী খোঁজেন এই সান্ধ্যলোকে? কাকে তালাশ করে ফেরেন এই অবোধ্য নগরে!

‘ঈশ্বরের প্রেমিকে’ র কাছে জানতে চাইবো এসব প্রশ্নের উত্তর। আমরাও পিছু নেব প্রয়োজনে এই ‘অমৃতস্য পুত্রে’র। সতর্ক দৃষ্টি ফেলে জেনে নেব তার অন্বিষ্ট অভিপ্সা! কিন্তু কেন এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা তালাশ করবো এই পথে এত দূর অগ্রসর হয়ে? কোন শক্তি চালিত করে নিয়ে যাচ্ছে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এই সন্ধানীলোকে? উত্তর জোগাবে ‘ঈশ্বরের প্রেমিক’?

‘ঈশ্বরের প্রেমিক’ রাজু অনার্যের চতুর্থ কবিতার বই। পেছনের ধুলোমাটি সরিয়ে, বিস্মৃতির অচলায়তন ভেঙে ফেলার একটা সাহসী সিদ্ধান্ত আছে এই বইয়ে। বাঙলার জলা-জংলার দেহতত্ত্ববাদী আউলা-বাউলার গূঢ়তত্ত্ব ভেদ করে পাঠকে নিয়ে যেতে যান পরমেশ্বরের আরশে আজিমে। যে কণ্টকাকীর্ণ বন্ধুর পথে তাঁকে তালাশ করে মস্তক হারিয়েছেন ‘আনাল হকে’র বক্তা মনসুর হাল্লাজ, পরম বিশ্বাসী হয়েও কাফের-মুরতাদের তকমায় গ্লানী বয়ে বেড়িয়েছেন আল্লামা ইকবাল ; তারও আগে মৃত্য পরোয়ানা মাথায় নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে সমাজবিচ্ছিন্ন নিদারুণ মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন ‘তাবু নির্মাতা’ ওমর খৈয়াম! ঠিক অগ্নিতে আত্মাহুতি দিয়েও পতঙ্গের যেমন রূপতৃষ্ণা মেটে না,তেমনি পরমের সন্ধানে এসব মরমীদের প্রাণপাতেও যেন তৃপ্তি হয় না!

বিজ্ঞানের যুক্তি-বুদ্ধি প্রেমিকের প্রেমসত্তার নিকট পরাভূত। জ্ঞানের তুলাদণ্ডে প্রেমিকের আস্থা নেই, তার দৃষ্টি আরো ওপরে; দিব্যলোকে অসীমের সন্ধানে অতীন্দ্রিয় রশি ধরে তার তালাশ-অনুসন্ধান! প্রেমই সেখানে চরম ও পরম সত্য! লাইলির প্রেমে যেমন মজনু, শিরিনের মদে যেমন মাতাল ফরহাদ, ইউসুফ প্রেমে যেমন ব্যাকুল জোলেখা– আশেক- মাশুক, জীবাত্মা-পরমাত্মার ছদ্মাবরণে মূলত পরমের জন্য মরমীর চরম ব্যাকুলতা।

বোঝবার জন্য ‘ঈশ্বরের প্রেমিকে’র শরণাপন্ন হবো– “প্রেমে মগ্ন এক একটি মুহূর্ত সৃষ্টি করে অনন্ত মহাকাল, প্রিয়া সান্নিধ্যের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় জন্মায় মত্ততার মদিরাময় আবেশ,… এভাবে প্রেমিকা হয় প্রেমিকের ঈশ্বর; প্রেমিক অন্ধভক্ত, প্রণয় পূজারী!… প্রেমের মত্ততা হয় ঈশ্বরকে পাবার ব্যাকুল বাসনা,… দয়িতার প্রত্যেকটি আলিঙ্গন-মিলনে হয় পরমেশ্বরের অমিয় সান্নিধ্যপ্রাপ্ত প্রেমিক মানবের নবজীবন!”

২.

ধর্ম সাধনার তিনটি পথ- কর্মমার্গ, জ্ঞানমার্গ ও ভক্তিমার্গ।বৈষ্ণব, সুফি, বাউলেরা বেছে নেন ভক্তিমার্গের পথ। ভক্তির অপর নাম প্রেম। ভক্তি বা প্রেমের অরূপ রশি ধরে অতীন্দ্রিয় পথে ভক্ত পৌঁছে যান পরমের নিকট।বৈষ্ণবের যিনি পরমাত্মা, সুফির কাছে যিনি পরম বন্ধু- স্রষ্টা আর বাউলের পরমগুরু আলেক সাঁই। ভক্তিমার্গে প্রেম ভিন্ন গতি নাই। এ পথ সাধনার পথ; সেই সাধনা প্রেম সাধনা! অনাদিকাল ধরে প্রেমাস্পদের নিকট প্রেম নিবেদনের মাধ্যম হয়ে আছে সঙ্গীত অথবা কবিতা। প্রেমিক এখানে মিস্টিক কবি, আর তার গান-কবিতা মিস্টিক সং! এ দুয়ের সমন্বয়ে সাহিত্যে মিস্টিসিজম- মরমিবাদ বা অধ্যাত্মবাদ।

মিস্টিসিজম বা মরমিবাদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে শ্রীশচন্দ্র দাশ জানাচ্ছেন, যে অখণ্ড দৃষ্টির সাহায্যে কবি ভগবৎ তথা বিশ্ব সৃষ্টির পরম সত্যকে উপলব্ধি করে তাঁর সহিত একাত্মতার পরম আনন্দ লাভ করতে পারেন, সাহিত্যে সেই বোধি-দৃষ্টি-সাধনাকে আমরা মিস্টিসিজম নামে অভিহিত করতে পারি।
এই ‘বোধিদৃষ্টি বশতই দেহতত্ত্ববিদ বাউল কবি’ খুঁজে পান তাঁর পরমগুরু আলেকসাঁইকে, ‘উচ্চতর দিব্যদৃষ্টি বলে’ বৈষ্ণব কবি বিশ্বরূপে তালাশ করেন রাধাকে আর প্রেমদৃষ্টি বলে প্রেমিকার পূজায় সুফি কবি আরাধনা করেন জগদীশ্বরকে।

প্রেম সাধনায় মরমি কবির অনিবার্য অবলম্বন রূপক-প্রতীক-উপমা।প্রেমভাব উন্মত্ত মিস্টিক কবির ভাষা জনসাধারণের কাছে তাই হয়ে পড়ে দুরধিগম্য, রহস্যাবৃত, দুর্বোধ্য! শাস্ত্রী মহাশয়ের ভাষায় যা ‘সান্ধ্যভাষা বা আলো আঁধারি ভাষা–যার খানিক বোঝা যায়, খানিক বোঝা যায় না’! এই গূঢ়তত্ত্বাভিসারী প্রতীকধর্মী ভাষাশৈলীর কারণে মরমী কবি পরিণত হন সমাজ, রাষ্ট্র আর ধর্মের চক্ষুশূলে!’আপনা মাংসে হরিণা বৈরি’!

৩.

রাজু অনার্য সুফি, বৈষ্ণবের প্রেম দরিয়া মন্থন করে জগদীশ্বরের অরূপ দর্শনে মদিরাসেবীর উন্মদানায় তরুণী রাধা কি তন্বী রূপসীর রূপের পূজায় নিবেদিত হন। প্রেমের সার্বভৌম জগতে প্রেমিকের তখন একচ্ছত্র রাজত্ব।

তোর প্রেমেতে স্বর্গ তুচ্ছ, হুরপরি আর শরাব ফিকে
তাইতো আমি সকল ভুলে কেবল ছুটি তোর দিকে।

সুফি কবি ওমর খৈয়াম যেমন বলেন,

করছে ওরা প্রচার– পাবি স্বর্গে গিয়ে হুরপরী
আমার স্বর্গ এই মদিরা, হাতের কাছে সুন্দরী।

সুফি দর্শন অনুযায়ী, মদিরা বা মদ প্রেমের প্রতীক, মদের পাত্র যেমন মদের আধার তেমনি মানুষও প্রেমের আধার আর প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের যে ব্যাকুলতা তা তো পরমেশ্বরকে পাওয়ার অধীরতা! ‘ঈশ্বরের প্রেমিক’ কাব্যের ২২ সংখ্যক পদ-
অথবা, ২৩ সংখ্যক পদের দুটি চরণ-

এই খেলাতে জিতলে আমি তোকে চুমু খাবো
হারলে পরে আমিই ফের তোরই চুমু পাবো।

-প্রেম সাধনায় পরাজয়ের অস্তিত্ব নেই, আশেক-মাশুক কিংবা জীবাত্মা-পরমাত্মার ছ্দ্মাবরণে প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

প্রেমের অনিবার্য পরিণতি মিলন।তাই সুফি গজলে ও বৈষ্ণব সাহিত্যে ‘মিলনপিপাসু বিরহী আত্মার করুণ কান্না শুনতে পাই’।আপাতদৃষ্টিতে প্রেমিকের সাথে প্রেমাস্পদের এ মিলন পঙ্কলীলা বলে মনে হলেও মূলত পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার এ মিলনব্যাকুলতা পঙ্কে পঙ্কজের জন্ম দেয়-

এমন পিরিতি কভু দেখি নাহি শুনি
পরাণে পরান বাঁধা আপনা আপনি
দুঁহু কোড়ে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া
তিল আধ না দেখিলে যায় যে মরিয়া।

সমসুর ধ্বনিত হয় ‘ঈশ্বরের প্রেমিক’ কাব্যের ১২ সংখ্যক পদে-

চাটিনি, তুই প্রাণেশ্বরী, দিসনে’ক আজ বাধা
আজ মিলনে মিলবে দেখিস কৃষ্ণ এবং রাধা।

অথবা, ২৬ সংখ্যক পদে-

তুই আমি যখন মিলি আত্মায় মেলে আলেক সাঁই
প্রেমে ভক্ত-ভগবান খেলে আমরা উপলক্ষ তাই।
মিলন মুহূর্তে প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ যেন পরমেশ্বের উপস্থিতি অনুভব করেন। জালালুদ্দিন রুমির দেওয়ানের দুটি চরণ-

এ এক অন্য সোনা, যা তোমার ভালোবাসার
সময়ে তোমার বুকের মধ্যেই জ্বলজ্বল করে।

সর্বোপরি, মরমী সাধনায় বাউলের পরিশুদ্ধ আত্মার স্বরূপ উপলব্ধি, বৈষ্ণবের একান্ত প্রেমসাধনা আর সুফির ‘ফানা বা আত্মলীন বোধ ও বাকা বা আমার মাঝে সবই’র বিচারে ‘ঈশ্বরের প্রেমিক’ কতটুকু সুফি ঘরানার, কতটুকই বা বাউল ও বৈষ্ণব দর্শনের সেই তর্ক উসকে দিয়েও এই সিদ্ধান্তে মোটামুটি উপনিত হওয়া যায়, সুফিতত্ত্ব এবং বাউল ও বৈষ্ণব দর্শনের মিথস্ক্রিয়ায় ‘ঈশ্বরের প্রেমিক’ সর্বজনীন প্রেমকথা।

বইটি বোদ্ধা পাঠকের হাতে ছড়িয়ে পড়ুক, আলোচনা জমে উঠুক এর তত্ত্ব-দর্শন ঘিরে। জগত প্রেমময় হোক।
( লেখক: আব্দুস সবুর, কবি ও কলেজ শিক্ষক)

ঈশ্বরের প্রেমিক ( কাব্যগ্রন্থ)
কবি: রাজু অনার্য
প্রকাশক: বেহুলাবাংলা
প্রচ্ছদ: সারাজাত সৌম
মূল্য: ১৩৫ টাকা

আপনার মতামত দিন