উপকূলের শিশুদের পাশে কিশোর শাহিন

মোঃ সোহেল রানা (১৮)
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম শাহিন আলম। এ বয়সে ছেলেরা পড়ালেখার বাইরে সময় পেলেই হাতে বল ব্যাট নিয়ে মাঠে ছুটে চলে যায়। কেউবা দল বেধে আড্ডায় মাতে। এমনকি অবসর পেলেই ইন্টারনেট তো কথায় আছেই। এ বয়সটাই হলো প্রফুল্লতার। তাইতো ঘুরাঘুরি ও আড্ডায় সবাই ব্যস্ত।

কিন্তু শাহিন যেন সমাজের অন্য ছেলেদের থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। শাহিন সময় পেলে অন্যদের মতো ইন্টারনেট গেইম খেলা বা ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকে না। খেলার মাঠে না গিয়ে পূর্বের আকাশে ভোরের আলো উকিঁ দেওয়ার সাথে সাথেই নৌকায় একগাদা ত্রাণ নিয়ে ছুটে চলে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনা কয়রায়। এ দুই উপজেলার উপকুলের অসহায় পরিবারের মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর উপকূলের মানুষ যে কতটা ভয়াবহ অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করে তা খুব কাছ থেকে দেখেছে কিশোর শাহিন। মানুষকে কতটা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়।

ছোট্ট বয়সে শাহিনদের উপরে প্রাকৃতিক দূর্যোগ আইলা আঘাত হেনেছিলো। জোয়ারের পানি ঘরের ভিতরে ওঠায় সে সময়ে দীর্ঘদিন ঘরের মধ্যে মাচান করে ছিলেন পরিবারের সকলের সাথে। সে আইলার দূর্যোগের সময়ে শাহিন দেখেছে বড়দের জন্য ত্রান আসলেও দেখা মিলতো না গর্ভবতী ও শিশুদের জন্য আলাদা কিছু খাবার।

কিশোর শাহিন ছোট্ট থেকে লড়াই করে বড় হচ্ছে। এর মাঝেই চারপাশে দেখে আসছে এই পরিস্থিতি। বেশিরভাগ সংগঠনগুলো বড়দের জন্য কাজ করে। এর ফলে শিশুদের সহযোগিতায় তেমন কোনো সংগঠন নেই। শিশুদের জন্য আলাদা করে কেউ কিছু নিয়ে আসত না। শিশুদের ঝরে পড়া, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা বিভিন্ন সমস্যা চারপাশে বেড়েই চলছে। সব সময় এসব দেখে কষ্ট পেতো এবং অবহেলিত শিশুদের জন্য কিছু করা দরকার এগুলো নিয়েই ভাবতেন কিশোর শাহিন। তাই তার ভাবনা ও লক্ষ্য পূরন করতে মাঠে নামে ছাত্রজীবন থেকেই। উপকুলের শিশুরা যেন ঝরে না পড়ে, তাদের ভবিষ্যৎ যেন সুন্দর হয় সে কথা ভেবে অসহায় পরিবারের সন্তানদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন শিশু ভিক্তিক ছবিযুক্ত বর্ণ কবিতাসহ বিভিন্ন বই কিনে দেয়। এছাড়া উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাবার, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার, খেলনাসামগ্রীরও ব্যবস্থা করে। এমনকি গর্ভবতী মায়েদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা এবং অসহায় পরিবারের কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা ভেবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ঘরে ঘরে গিয়ে পৌঁছে দেয়।

বর্তমানে এ মহামারী সময়েও নিজেকে ঘরে না রেখে মানুষদের সর্তক করতে বিভিন্ন প্রচাোনা চালাচ্ছেন। অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে মহামারী করোনার মাঝেও পিছ পা হোননি শাহীন। শাহিনের এসব কাজে প্রথমে কেউ না থাকলেও এখন পাশে দাড়িয়েছে বন্ধুরা। শাহীনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছবি তোলা। প্রতিটি ছবিই যেন কথা বলে। তাই সব সময়ে উপকূলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ছবিসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কেউ যেতে পারে না, সেসব জায়গাতে গিয়ে ফেসবুক লাইভে উপকূলের মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন। এবং অল্প বয়সেই থেকেই এসব মানুষের কথা তুলে ধরেছেন স্থানীয়সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব কর্মকান্ড পত্রিকা ও ফেসবুক লাইভে দেখে দেশ-বিদেশের বিত্তবান মানুষসহ বিভিন্ন সংগঠন উপকূলবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে। উপকূলের শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে প্রাণটা ভরে যায় এই কিশোর শাহিনের এবং নিজেকে সফল মনে করেন।

উপকূলে বসবাস করায় ছোট্ট জীবনে সব থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছে আবার সবচেয়ে বেশি আনন্দও পেয়েছে এই উপকূলে অসহায় পরিবারের শিশুদের সাথে মিশে। ভোর থেকে সন্ধ্যো সারাদিন কাটিয়ে দেয় এই শিশুদের সাথে। তাদের সাথেই মেতে ওঠে খেলাধুলা ও আনন্দ উৎসবে, তাদের মাঝেই ফিরে পায় শাহিন শৈশবের হারানো দিনগুলি। এদের আনন্দ দেখে সবচেয়ে ভালো লাগে।
কিশোর শাহিন শুধু উপকূলের সকল মানুষের পরিচিত মুখই নয় সকলের বন্ধু বটে এছাড়া শিশুদের হৃদয়ের যেন ঠাই করে নিয়েছেন।

আপনার মতামত দিন