একাত্তরের নিরব সাক্ষী ফরিদ মিয়া

চয়ন মন্ডল:

২৯ মে’র পূর্ব পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী সবগুলো দলের নেতৃত্ব দিতেন জাফর মিয়া ও বাচ্চু রাজাকার। ২৯ মে গ্রামবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় জাফর মিয়া নিহত হলে শান্তি কমিটির দলগুলোর নেতৃত্ব দেয় বাচ্চু রাজাকার ও খোকন রাজাকার। জাফর রাজাকার ২৯ মে নিহত হলে নগরকান্দা জাফর মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত শান্তি কমিটির দলের সবাই আত্মগোপন করে। ২৯ মে মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসিদের হামলায় খোকন রাজাকার আহত হন। ঐ দিন আহত অবস্থায় তিনি ফরিদপুর সদরে পালিয়ে যান।

১ জুন নগরকান্দা, কোদালিয়া শহিদনগরের গণহত্যায় পাকিস্তানি সেনাদের পার্শ্ববর্তী এলাকার শান্তি কমিটির সদস্যগণ গণহত্যায় সাহায্য করে। তারা পার্শ্ববর্তী এলাকার হওয়ায় গ্রামবাসী তাদের চিনতে পারেনি। তবে খোকন রাজাকারকে মো. কলম শেখ চিনতে পারে। ঐদিনের ঐ গণহত্যায় শতাধিকের উপরে মানুষ শহিদ হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ফরিদ মিয়া (৬৫) গণহত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘‘ঐদিন আমি আমার মা-বাবার সাথে আমাদের মিয়াবাড়ির জঙ্গলে গিয়ে লুকাই। এখান হতে আমাদেরকে পাকিস্তানি সেনারা উঠিয়ে নিয়ে আসে। আমাদের তিন ভাগে ভাগ করে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরষ, মহিলা ও শিশুদেরকে আলাদা করে রাখে। আমার মা-বোন, ভাবি, চাচিদের মাদ্রাসার মাঠে বসিয়ে রাখে। ভাঙ্গা, মুকসুদপুর, নগরকান্দা ও ফরিদপুর হতে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ পাকিস্তানি সেনারা আমাদের এখানে চলে আসে। পাকিস্তানি সেনারা আমাদের গ্রামের তিন জনকে পুড়িয়ে হত্যা করে।
মিলিটারিরা আমাদের সবাইকে পানি খাওয়ায় এবং কলেমা পড়ায়। ঐ দিন আমার চাচা ও পুড়াপাড়ার একজনকে (কুটি মিয়া) আমার সামনে গুলি করে হত্যা করে। আমি ১০-১৫ হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাদের পশ্চিম দিক মুখ করে গুলি করা হয়। যখন মিলিটারিরা মাদ্রাসার মাঠে থাকা ২০-২৫ জন নারী শিশুকে গুলি করে আমি তখন ২০০ গজের মতো দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মিলিটারিরা তিন দিক (উত্তর, দক্ষিণ পূর্ব দিক) দিক হতে গুলি করে ১৭ জনকে হত্যা করে।

কোদালিয়া শহিদনগার গণহত্যায় শহিদের গণকবর।

আমার এক ফুফু ছিল (আকরামুন্নেছা) তাকে কিছু লোক খবর দেয় তার ছেলে আবুল হোসেনকে মিলিটারিরা মেরে রাস্তার পাশে ফেলে গেছে। ঐ খবর পেয়ে আমার ফুফু ২ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে কান্না করতে করতে আমাদের বাড়ি আসেন। সবাইকে হত্যা করার পরে আমাদের গুলি করার আইটেমে বসায় এবং তিন দিক থেকে মেশিন সেট করে, কিন্তু পরে গুলি না করে, আমাদের মাথায় লুট করা মালামাল উঠিয়ে দিয়ে নগরকান্দা নিয়ে যায়। আমাদের দিয়ে বন্ডসই নেয় এবং বলে যে আমরা বাকি ৪-৫ জন মিলিটারির লাশ কাল তাদের সাথে থেকে খুঁজে দিবো এই বলে আমাদেরকে ছেড়ে দেয়। তখন পর্যন্ত আমাদের কারোই হুঁশ ছিল না। ছেড়ে দেওয়ার পরে আমাদের হুঁশ হয়। আমরা বুঝতে পারি আমাদের মা-বোনকে মেরে ফেলা হয়েছে। তখন আমরা কান্না করতে করতে বাড়ি গিয়ে দেখি মাদ্রাসার মাঠে আমার পরিবারের ১০ জনকে গুলি হত্যা করে মিলিটারিরা। তাদের সবাইকে আমি আমার বাবা-চাচা মিলে রাতে একটি গর্ত করে সবাইকে একসাথে মাটি দেই।’’

(সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ ও স্থান- ১ জুলাই, ২০১৭, নিজবাড়ি)

প্রথমিক উৎস- মাসুদ রানা, কোদালিয়া শহিদনগর গণহত্যা, ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, খুলনা, ২০১৮।

লেখক : ছাত্র, ভূগোল বিভাগ, কে. এম. কলেজ, ভাঙ্গা, ফরিদপুর।

আপনার মতামত দিন