একাত্তরের নির্যাতিত নারী ফুলমতি

মাসুদ রানা:

২১ শে এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুর জেলায় প্রবেশ করলে ২২ শে এপ্রিল নগরকান্দার তরুণরা নগরকান্দা থানা আক্রমণ করে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে আসে। ২৪ শে এপ্রিল সেই অস্ত্র নিয়ে নগরকান্দার কিছু তরুণ যুবক একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করে। পাকিস্তানি সেনারা সেই মুক্তিবাহিনীর খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আব্দুল আজিজ মোল্লার বাড়ি আক্রমণ করে।

পাকিস্তানি সেনারা আব্দুল আজিজ মোল্লার বাড়িতে আক্রমণ করে কাউকে না পেয়ে বাড়ি ঘর লুট করে অগ্নিসংযোগ করে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানার চর-যশোরদি ইউনিয়নের আলগাদিয়া গ্রামের দিকে আসতে থাকে। পাকিস্তানি সেনাদের আসতে দেখে আলগাদিয়ার গ্রামবাসি যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে যায়।

আলগাদিয়া গ্রামের ২০ বছরের গৃহবধু ফুলমতি বেগম কোলের শিশু মেয়েকে নিয়ে তার দেওরের সাথে বাড়িতে থেকে যায়। তাদের ধারণা ছিলো পাকিস্তানি সেনারা মুসলিমদের হত্যা করবে না। পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাড়ি প্রবেশ করে তাকে দেখতে পায়। তাকে ধরে কোলের শিশুকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে বাঁচানোর জন্য তার দেওর আসলে তাকে গুলি করে হত্যা করে।

৩ জন পাকিস্তানি সেনা তাকে নির্যাতন করে ফেলে রেখে যায়। তার কোলের শিশুকে পাকিস্তানি সেনারা ছুড়ে ফেলে দিলে শিশুটি মারা যায়। পাকিস্তানি সেনাদের এই কান্ড দেখে তার স্বামী এগিয়ে আসলে তাকে পাকিস্তনি সেনারা ধরে নিয়ে যায়। তার বড় ছেলে মাকে নির্যাতিত হতে দেখে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে সে বাড়ি ফিরে আসে।

পাকিস্তানি সেনারা চলে গেলে ফুলমতি বেগম গ্রাম ছেড়ে চলে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি বাড়ি ফিরলে তাকে কেউ বাড়িতে ঢুকতে দেয় না। বাড়ির সকল মহিলারা বলে, ‘আমরা পালালাম তুমি কেন পালালানা, তুমার জন্য আমাদের পরিবারের মান সম্মান নষ্ট করবো না। তুমি আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাও।’

৬ মাস পরে ফুলমতির স্বামী বাড়ি ফিরলে ফুলমতি তার স্বামীর বাড়ি ফিরে আসে। তবে আজও তাকে সেই দিনের জন্য বাড়ির সবার কাছে কথা শুনতে হয়।
(সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ- ১৬ নভেম্বর ২০১৮, স্থান- নিজ বাড়ি)

লেখক : মাসুদ রানা

লেখক : কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা।

আপনার মতামত দিন