একুশে ফেব্রুয়ারি ও বর্তমান প্রজন্ম

বিজয় রায়

বাংলাদেশ এমন নামে একটি স্বতন্ত্র দেশ হবে এটা কেউ কখনো চিন্তাও করতে পারেনি ১৯৫২ সালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। বাঙলিরা একটি ভাষা পাওয়ার জন্য কিংবা বলা যায় যে স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্য তারা তাদের জীবন পর্যন্তও দিয়ে দিয়েছে। এমন ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। যার জন্যই হয়তো বা আমার এক ভার্চুয়াল বিদেশি বন্ধু ব্যাপারটা শুনে অবাক হয়েছিলেন। ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার নাম না জানা অনেকেই। এসব কিছু আমরা ছোট থেকেই শুনে পড়ে আসতেছি এবং তাদের বেশির ভাগই ছিল ছাত্র-যুবসমাজ। যুবসমাজের রক্তের তেজেই যে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় তা ইতিহাস সাক্ষী। যাই হোক অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, রক্তের বিনিময়ে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ আমরা বাংলাদেশ নামক দেশ পেয়েছি, পেয়েছি স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার।
এই স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার এমনিতেই আসেনি। এটা সবারই জানা তবুও বলতেই হয় যে, আজ প্রায় ৬৮ বছর পরেও আমরা ভাষা শহীদদের পূর্ণ মর্যাদা দিতে পারিনি। এই যে দেখুন না ভাষার মাসের শুরুর(পহেলা ফাল্গুন) দিনটাকেই আমরা কিভাবে অন্যদেশের সংস্কৃতির দ্বারা বরণ করে নিলাম পাবলিক প্লেসে ডিজে গান-বাজনা, পার্টির মাধ্যমে। কথাটা শুনে অবাক হলেন বুঝি? এর উত্তরে হয়তো অনেকে বলবেন আপনি ব্যাকডেটেড, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন না। কিন্তু জানেন কি আধুনিকতার ছোঁয়ায় নিজের অস্তিত্বকে আমরা হারাতে চলেছি। ভুলে গেছি আমাদের শিকড়কে, আমাদের ইতিহাসকে। আধুনিকতাকে আমরা এত দূরেই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি যে আমরা বাঙালি জাতি এটাও মাঝে মাঝে ভুলে যাই। এজন্যই হয়তো কবি ‘‌ভবানী প্রসাদ মজুমদার’ বলেছেন,
জানেন দাদা আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।
বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দূর্বল প্যানপ্যানে
শুনলে বেশি গা জ্বলে যায়,
একঘেঁয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কিসের গরব? কিসের আশা?
আর চলেনা বাংলা ভাষা
কবে যেন বাঙালি ডে- ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।
মজার কথা হলো আমাদের আধুনিক সমাজে অত্যাধুনিক শিক্ষিত যুবসমাজের ছেলেমেয়েদের মাঝেই এই ব্যাপারটা দেখি। তাদের চোখে ইংরেজিটা এমন হয়েছে যেন বাংলা ভাষাটাই ব্যাকডেটেড ভাষা যার জন্য ইংরেজি ছাড়া মুখে আসেই না। প্রকৃতপক্ষে যারা যত বেশি জানে, তারা তত বেশি কম মানে। যে ভাষার জন্য যুবসমাজ প্রাণ বলিদান দিলো সে ভাষার আজ কি অবস্থা! এ নিয়ে কারো কখনো মাথা ব্যাথা হয়না। যদিও কাগজে-কলমে এ নিয়ে হিরিক পড়ে ঠিক ফেব্রুয়ারি মাস এলে। আজ বাংলা ভাষা অবহেলিত নিজ জাতি সত্ত্বার কাছে। যদিও সমাজে বাংলা ভাষা প্রচলিত কিন্তু সর্বস্তরে এখনও প্রচলন ঘটেনি। ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীন হওয়ার পরেও তাদের রীতি-নীতিতে আজো আমরা প্রভাবিত। ব্রিটিশদের ন্যায় আইন প্রণয়ন হয় ইংরেজীতে। ব্যবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার অস্তিত্ব আজ নিরুপায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ করে সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষার তেমন একটা দেখা মিলেনা। তাছাড়া শিক্ষিত তরুণ-তরুরীদের মাঝে এর প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত। প্রবীন ভাষাতত্ত্ববিদ ও শিক্ষাবিদ রফিকুল ইসলাম তো বলতে বাধ্যই হয়েছিলেন যে এখন আর ‘আ মরি বাংলা ভাষা নয়, আ মারি বাংলা ভাষা’। ব্রিটিশরা আজ এদেশে শাসন না করেও যেন শাসন করে যাচ্ছে। হায় বাঙালি জাতি!
আজ বাঙালিদের মাতৃভাষা আত্মত্যাগের মহিমা নিজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ই মার্চ ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং ২০০০ সাল থেকেই ১৮৮টি দেশে এই দিনটি শ্রদ্ধার সহিত পালন করা হয়। এতে সাধুবাদ জানানোই স্বাভাবিক কিন্তু তবুও কেনো জানি এই ভাষাটি নিজ দেশেই বিকৃতিগ্রস্থ। আজকাল প্রায়শই দোকান-পাট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইনবোর্ড কিংবা ব্যানারগুলোতে দেখা যায় বিকৃতিগ্রস্থ অক্ষর। বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই ব্যাপারে কমতি নেই! বাংলা ভাষার কতটা অবনতি ঘটলে অক্ষর বিকৃতিগ্রস্থ হয় তা আমরা কখনো ভেবেই দেখিনি। এভাবে বাংলা অক্ষরকে বিকৃতিগ্রস্থ, লাঞ্চিত করণে সেটি ভাষা শহীদদের অপমান করা বোঝায় না বুঝি? এ দোষ কাদের, এটা কখনোই আমরা ভেবে দেখিছি? আজ আমাদের দেশে আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষনের কোন উদ্যোগ নেই। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ ভাষার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ‘ডুমুরের ফুল’ বাগধারাটির রুপ ধারন করবে। শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা লোকমুখে শুনি এবং ভার্চুয়াল জগতে এক দিনের দরদমাখা পোষ্ট করে জানিয়ে দেই এই ভাষার গুরুত্ব কতটা! বাকী এগারোটা মাসই যায় বাংলা ভাষা কাকে বলে? যার জন্য এখনই সময় শিশুশিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাখা এবং সুশৃঙ্খলভাবে শিখনে সোচ্চার হওয়া।

বিজয় রায়
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়