এখানে থেমো না; ইতিহাস ও কথাশিল্পের যুগলবন্দী

জননন্দিত কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের জন্ম ১৯৬৫ সালে নীলফামারী জেলায়। কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, চিত্রনাট্যকার, প্রাবন্ধিক,পত্রিকার সম্পাদকসহ বহুমাত্রিক তার পরিচয়। তিনি সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ইতোমধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ আরও নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর ‘মা’ এবং ‘ফাঁদ’ উপন্যাস দুটি একাধিক ভাষায় অনূদিত ও দেশে বিদেশে খুবই প্রশংসিত হয়েছে।
তার আর একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘এখানে থেমো না’। উপন্যাসটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০২০ সালে। প্রথম মুদ্রণের কথা উল্লেখ নেই। গত বইমেলা (২৯ শে ফেব্রুয়ারি) থেকে ১ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বইটি সংগ্রহ করেছি। উপচে পড়া ভিড়।আর এতেই বোঝা যায় উপন্যাসটি পাঠকমহলে কতটা সাড়া জাগিয়েছে। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাবলী নিয়ে তথ্যবহুল ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস রচনা করেছেন লেখক। ভীষণ মুগ্ধতা নিয়ে এক বসাতেই বইটি পড়ে শেষ করেছি। সেই সময়কার ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ লেখক নির্মোহ দৃষ্টিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। যা একজন পাঠক হিসেবে আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছে। এ যেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের এক অনন্য দলিল।
যদিও লেখক তার ‘জরুরি কথা’-শিরোনামে লিখেছেন-“ঐতিহাসিক ঘটনার বেলায় চেষ্টা করা হয়েছে যথাসম্ভব নির্ভুল তথ্য দেওয়ার। একজন সৃজনশীল লেখকের দৃষ্টিতে দেখা ইতিহাস হলো এই বই। ব্যক্তির সৃজনশীল কলমে ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা, কল্পনা, ও বয়ান এতে জীবন্ত হয়ে ওঠেছে। কিন্তু এটাকে পড়তে হবে উপন্যাস হিসেবে, ইতিহাস হিসেবে নয়।” লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি শুধু উপন্যাস হিসেবেই নয়-ইতিহাসের বই হিসেবে পড়লেও পাঠকের রস আস্বাদনে কোন কমতি হবে না। কারণ ,লেখক সঠিক ইতিহাসের আলোকেই লিখতেচেয়েছেন,ইতিহাস থেকে তাকে একটুও সরে যেতে হয়নি কিংবা সরে যাননি। ব্যাখ্যা কিংবা কল্পনার আশ্রয় যতোটুকু আছে তা সৃজনশীল বহুমুখী একজন পাঠককে ঘটনার পরম্পরায় চালিত করার জন্য। সে ক্ষেত্রেও লেখক সফল এবং সার্থক বলেই আমি মনে করছি।
সর্বমোট ৭৩ পর্বে লেখা এ উপন্যাসটি যেন বাঙালি জাতিসত্তার গৌরবময় পূর্ণতারই এক অপূর্ব আখ্যান গাঁথা।
উপন্যাসের শুরু জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে এবং শেষ ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চের কালরাত্রি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর। ওই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রতি পৃষ্ঠার পরতে পরতে দিন-তারিখসহ উপন্যাসে বয়ান করেছেন। শুধু তাই নয় বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নির্মোহ নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে এ উপন্যাসে। যা পাঠককে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যাবে। উপন্যাসের বিশেষ চরিত্র বা কথক হলো ব্যাঙমি ও ব্যাঙমা। তাদের ভবিতব্যের বয়ান বা আলাপচারিতা পাঠকদের উপন্যাসটি পড়তে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুর দিকে ধাবিত করবে।
ঔপন্যাসিক ‘এখানে থেমো না’ উপন্যাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্রতিটি আন্দোলনের স্বরূপ উন্মোচন করার প্রয়াস পেয়েছেন। স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করতে সেই সময় কে ,কি ভূমিকা পালন করেছেন সবই উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, এম এ জি ওসমানীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ , আইনজীবী ডঃ কামাল হোসেন, আমীরুল উল ইসলাম, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন, আব্দুল হাই, নির্মলেন্দু গুণ, ডাক্তার নুরুল ইসলাম , ডাক্তার ফজলে রাব্বী, মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম নুরুল হক, আতাউস সামাদ প্রমুখ ব্যক্তিদের কেউই বাদ যাননি। ঘটনাপ্রবাহের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বেগম মুজিব ওরফে বঙ্গমাতা রেনু কিভাবে বঙ্গবন্ধুকে প্রভাবিত করেছেন, সেসব ঘটনা বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন।ওঠে এসেছে ড.ওয়াজেদ মিয়া,শেখ হাসিনা শেখ রেহানা, কামাল, জামাল ও শেখ রাসেল কথাও। লিলি,রিমি,রিপি ও সোহেল তাজের জন্মের ইতিবৃত্ত। রাশেদ খান মেনন,হায়দার আকবর রনোর কথাও বাদ যায় নি।
রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানীর রহস্যময়তাসহ যাদু মিয়ার কূট-কৌশলের কথাও লেখক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। যথাযথভাবে দেশপ্রেমিক বাঙালি সেনাবাহিনী, ইপিআর ,পুলিশ ও আনসার কথা উল্লেখ করেছেন গুরুত্বসহকারে। মিত্র দেশের কথা বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী কথা। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন। ওঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কথা। নেতাজি সুভাষ বোস সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবিএম মূসাসহ অন্যান্য সংবাদিকদের সাহসী ও যথাযোগ্য ভুমিকা।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন দেশপ্রেমিক। দেশকে ভালবাসতেন নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। ছয় দফা থেকে ১১ দফা বাস্তবায়নে তার দৃঢ়তা কেমন ছিল তাও লেখক সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। বলা বাহুল্য সেই উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাস ভবনটিই ছিল রাজধানীর সূতিকাগার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কখন, কিভাবে বাংলাদেশের নামকরণ করেছিলেন দিন তারিখসহ তাও আছে উপন্যাসের গাঁথুনীতে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে কতটা ভালোবাসতেন তাও প্রকাশ পেয়েছে নিপুণভাবে।
দেশীয় দালাল মোনায়েম খান, নুরুল আমিনসহ পাকিস্তানের প্রেতাত্মা আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান সহ জল্লাদের ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে এ উপন্যাসে।সত্তরের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপট। ২৫ মার্চের কালো রাতের আগে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাগুলো খুবই সাবলীলভাবে লেখক এ উপন্যাসে রূপায়ন করেছেন।
অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা উপন্যাস এখানে থেমো না। সকল শ্রেণীর পাঠকের উপযোগী লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এখানে হুবহু উপন্যাস থেকে কিছু অংশ দেয়া হলো:রাত্রি ১২টা। ক্রিং ক্রিং। হাজী মোরশেদ ফোন ধরলেন, ”হ্যালো।”হ্যালো, বলধা গার্ডেন থেকে বলছি।”আমি শেখ মুজিবের বাড়ি থেকে বলছি।”মেসেজ পাঠানো হয়ে গেছে। মেশিন কি করব?” আপনি একটু ধরেন। মুজিব ভাইকে জিজ্ঞেস করে আসছি। ‘হাজী মোরশেদ দৌড়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। মেসেজ পাঠানো হয়ে গেছে, মেশিন কী করবে জানতে চায়। ‘মুজিব বললেন ,মেশিন ভেঙ্গে ফেলে পালিয়ে যেতে বলো।’ হাজী সাহেব বুঝলেন ,বলদা গার্ডেন একটা কোড। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ পাঠানো হয়ে গেল।-এ থেকেই ভাষা কতটা সাবলীল।
‘এখানে থেমো না’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আশ্রয়ী একটি উপন্যাস। ওই সময়কার সাধারণ মানুষ ঘটনাপ্রবাহের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যারা জড়িত তারা উপন্যাস পাঠে হারিয়ে যাবেন ইতিহাসের সেই অন্যভুবনে। স্বাধীনতার পরের প্রজন্মের জন্য উপন্যাসটি পড়া অত্যাবশ্যক বলে আমি মনে করি। একটি উপন্যাস পড়ে তারা জানতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। আর জাতি মুক্ত হতে পারবে ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে। ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকগণ গবেষণার জন্য হয়তো এ উপন্যাসটিকে একটি আকর গ্রন্থ হিসেবেই বিবেচিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।উপন্যাসটি ইংরেজি এবং উর্দু ভাষায় অনুবাদ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাহলেই পাকিস্তানের বর্তমান প্রজন্ম বুঝতে পারবে, তাদের পূর্ব পুরুষরা কি করেছিল?

রিভিউ লিখেছেন:

শফিকুল কাদির
অধ্যক্ষ(ভারপ্রাপ্ত)
আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজ
গফরগাঁও , ময়মনসিংহ।

আপনার মতামত দিন