এ-জীবন দিলাম নিলামে তুলে, যদি তোরা হাসিস প্রাণ খুলে

পারভেজ হাসান একজন সত্য মানুষ
ইস্রাফিল আকন্দ রুদ্র

“যে জীবন অপরের জন্য না, সেটি কোন জীবন না” -বলেছেন মাদার তেরেসা। পারভেজ হাসান সত্য মানুষ। তাঁর পুরো জীবন অপরের জন্য বিলাতে চান এ ইচ্ছে নিয়েই ছোট থেকে বড় হয়েছেন । অসহায় বঞ্চিত শিশুদের তিনি দরদমাখা ভালোবাসা দিয়ে বলেছেন “এ-জীবন দিলাম নিলামে তুলে, যদি তোরা হাসিস প্রাণ খুলে। ” হ্যাঁ, সহমর্মিতা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পারভেজ হাসানের কথা বলছি। পারভেজ হাসানের জীবন মসৃণ ছিল না, ছিল কন্টকময়, কাঁটা পোতা ছিল পথে পথে। কাঁটার খোঁচা খেতে খেতে কাঁটা সরিয়েছে।

গ্রামে নানুর কাছে বড় হয়েছেন; অবহেলিত জীবন। আর্থিক সমস্যাতে পড়ায় মামা ঢাকা নিয়ে গিয়েছিলেন স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলে। স্কুলে ভর্তি না করে চায়ের দোকানে কাজ করতে দিলেন। সকাল ছয়টা থেকে রাত বারোটা একটানা খাটুনি। অথচ তিনি পড়ালেখা থেকে শুরু করে খেলাধুলা সবকিছুতেই চ্যাম্পিয়ন। এরকম মেধাবী একজনকে চায়ের দোকানে দিলে তাঁর মন ভাঙবেই। মনে হবে পৃথিবীতে কেউ নেই, কোথাও কেউ নেই।‌ নতুন শহর, নতুন মানুষ, অচেনা সবকিছু। এই ইটপাথরের শহর পারভেজকে কিনে নিয়েছিল পাঁচশো টাকার একটি নোটের বিনিময়ে।

বছর দুয়েক আগে আবেগের বশে সেই চায়ের দোকানে ফয়সালবছর দুয়েক  আগে আবেগের বশে সেই চায়ের দোকানে পারভেজ হাসান

প্রতি রাত তার চোখ বেয়ে ঝরতে থাকতো শ্রাবণের বৃষ্টি। বয়স যখন তার দশ-এগারো মাথায় এক কু চিন্তা এলো- সুইসাইড করবে! চায়ের দোকানের ওপরেই ব্রিজ। ব্রিজে উঠেছিল আত্মহননের মানসে। পাশে কিছু পথশিশু খাবার খাচ্ছিল। সেখান থেকে এক পথশিশু পারভেজকে বললো ,”এই এখানে দাঁড়াইয়া কী করিস?” উত্তরে বললো- তোমাকে কেন বলবো? তা বলার পরপরই পথশিশুটি তাকে জোর করে হাত টেনে নিয়ে কাছে বসায়। পরিচিত হয় ও মন খারাপের কথাগুলো অনাদরে বলতে থাকে একে অপরের কাছে। পারভেজ ভাবলো সে চায়ের দোকানে রাতটা ঘুমিয়ে পার করতে পারে, ভালো খাবার না পাক খেতে তো পারে। অথচ পথশিশুরা না পায় ঘুমানোর জায়গা, না পায় খাবার! পারভেজ ভেবে বুঝতে পারলো সে তাদের থেকে অনেক ভালো অবস্থায় আছে। তাঁকে চিন্তা করতে হবে ভিন্নভাবে। জীবনের সৌন্দর্য খুঁজতে চেষ্টা করছে, পেয়েছেনও। পথশিশুদের সাথে তাঁর লাগামহীন ভালোবাসার সম্পর্কের সৃষ্টি হলো।

শিশুদের সাথে পারভেজ হাসানশিশুদের সাথে পারভেজ হাসান

৬ জানুয়ারি পারভেজের জন্মদিন। পথশিশুরা বেলুন ও ফুল বিক্রির টাকায় তাঁর জন্মদিনের কেক কিনে নিয়ে আসলো । তিনি কেঁদে দিলেন। তার পরিবারের সদস্যদের এ উপহার দেওয়ার কথা কিন্তু কেউ মনে রাখেনি তার জন্মদিনের কথা, অথচ পথশিশুরা দিলো ভালোবাসা সমৃদ্ধ উপহার। না জানার কারণে কেক এর সাথে ছুরি নিয়ে আসেনি তারা। অবশেষে বটির সাহচর্যে কেক কাটা হলো। কেক কাটা শেষে আনন্দ করলো। তাদের এ আনন্দ পর্যবেক্ষণ করে হাসছিল সুশীল সমাজের কয়েকজন। একজন বলেই ফেললো, ফকিন্নির পোলার আবার বার্থডে! এ কথা শোনার পর জিদ চেপে ধরল তাঁর মনে, আর কখনো কারো চায়ের দোকানে কাজ করবেন না পণ করলো। জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিলেন। সৃষ্টিকর্তা এতো অল্প কিছু করার জন্য কাউকে পৃথিবীতে পাঠায়নি, অনেক কিছু করার আছে তাঁর এবং তাঁদের। বড়রা খেলতো আর পারভেজ তাদের বল কুড়িয়ে দিতো। বিনিময়ে পেতো পঞ্চাশ টাকা। সেও খেলা শিখে ফেললো। আগেই বলেছি সে সবকিছুতেই চ্যাম্পিয়ন।

একটা টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরস্কার পেলো এক হাজার ডলার। এ টাকা তাঁর কাছে অনেক কিছু,তা দিয়ে নিজেই চায়ের দোকান দিলো‌; সফলতা অর্জন করার চেষ্টা চালিয়ে যায়, পথশিশুদেরও সাহায্য করে। এরপর দেয় চটপটির দোকান, এরপর ফাস্টফুড এবং বিভিন্ন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। একসময় যে আর্থিক সমস্যা ছিল তা কেটে গেলো। সোস্যাল ফ্লিম তৈরি করা শিখছিল, সেই কাজেই নিজেকে পাকাপোক্ত করতে থ্রিডি মাক্স শিখতে ধানমন্ডি যেতো। রাস্তায় দেখা হতো পথশিশুদের সাথে।

হঠাৎ একদিন দেখলো দুটো ছেলে মায়ের মাথায় বোতল দিয়ে পানি ঢালছে, মাথার নিচে প্লেট; প্লেট থেকে আবার পানি বোতলে পূর্ণ করে এভাবে ঢালতেই থাকে; তাদের ভাবনা মায়ের মাথায় অনেক জ্বর; মাকে সুস্থ করতেই হবে। পকেটে যা টাকা ছিল তা দিয়ে পারভেজ পথশিশুদের মায়ের জন্য খাবার ও ওষুধ কিনে দিলো। তাদের হাতে দিয়ে বললো- সুস্থ হলে তো ভালোই, না হলে কালকে আমাকে বলিও। পারভেজ ফেসবুকে পজিটিভ কিছু শেয়ার করতে পছন্দ করতো, সেই ধারা মোতাবেক এ ঘটনা নিয়ে রাতে একটি পোস্ট দেয়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে তা ফেসবুকের ভাইরাল টপিক! ভাই খালেদ হোসনের সাথে পরামর্শ করে মানবতার আর্তে নিজেকে বিলিয়ে দিতে প্রতিষ্ঠিত করলো আজকের এই “সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন”। তাতে লোক দেখানোর কিছু নেই, যাতে মানুষের জীবনে সুন্দর পরিবর্তন আনে-এই তাঁদের ভাবনা। কারো অসহায়ত্বের চেহারা নয়, আনন্দের চেহারা দেখাতে চায় মানুষের কাছে। পরিবর্তনের গল্পটা দেখাতে চায় মানুষের কাছে।

মানুষের কল্যাণে তিনি সবার আগে। করোনাকালে তাঁর লক্ষ্য দশ হাজার পরিবারকে সাহায্য করার, সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে যখন পুরো পৃথিবীর সাথে বাংলাদেশও স্থবির। নিম্ন আয়ের মানুষেরা কাজ করতে পারে না, আয় নেই, খাবার খেতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্তরা যেমন রয়েছে কঠিন সংকটে তেমনি মধ্যবিত্তরাও রয়েছেন দোটানায়। চক্ষুলজ্জায় হাত পাততে অপারগ মানুষগুলোর জন্য অভিনব কায়দায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ‘সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন’।

করোনাকালে মধ্যবিত্তদের পাশে অভিনব কায়দায় পারভেজ হাসান

বলিউড এর জনপ্রিয় মুভি প্যাড ম্যান। যেখানে মা ও বোনের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এমনি এক প্যাড ম্যানের দেখা পেয়েছিলাম আমাদের বাংলাদেশে। পানিতে সাঁতরিয়ে বিনামূল্যে ঘূণিঝড় আম্পানের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলের কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পৌঁছে দিয়েছিলেন প্যাড।

প্যাড বিতরণ করছেন

উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য কাঁচামাল থেকে শুরু করে যা কিছু প্রয়োজন সব নিয়ে তিনি ঘরে ঘরে হাজির হয়েছেন।
পারভেজ হাসানের একটা ইচ্ছা ছিল একটানা একশো দিন নিজের যে কোনো ব্যক্তিগত কাজবিহীন টানা ২৪ ঘন্টাই অসহায় মানুষের জন্য উৎসর্গ করবেন, নিয়োজিত থাকবেন। এ আশায় উপকূলীয় অঞ্চলে ষাটদিন পেরোলো তাঁর থাকা, আর মাত্র কিছুদিন; তবেই তার সম্পূর্ণ ইচ্ছা পূরণ হবে।

আমাদের পৃথিবীতে পারভেজ হাসানের মতো মানুষের বড্ড বেশি প্রয়োজন। জয়তু সত্য মানুষ,জয়তু পারভেজ হাসান।

এ-জীবন দিলাম নিলামে তুলে, যদি তোরা হাসিস প্রাণ খুলে

আপনার মতামত দিন