করোনাকালে জন্মদিন : একজন সৈয়দ আজিজুল হক

মাহবুব বোরহান

[আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। জাতির ভরসাস্থল। বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষের সকল সংগ্রামের অগ্রগামী কান্ডারি। জাতীয় অধ্যাপক ডক্টর আনিসুজ্জামান স্যারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ও তাঁর রোগমুক্তিসহ দীর্ঘ সুস্থজীবন কামনা করে শুরু করছি।]
বিশ্বজুড়ে মহামারী। করোনার তাণ্ডব। চারদিকে ‘মৃত্যুর জয়ভেরি’। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিদিন বাড়ছে করোনার বিস্তার। বর্ষার জলের মতো তর তর করে বাড়েেছ মৃত্যুর সংখ্যা।গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে একশত তেষট্টি। বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে চিন্তিত হবার আরো একটি বড়ো কারণ এখানে মৃত্যুর চেয়ে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা কম। গতকাল পর্যন্ত একশত পঞ্চাশ। আর মোট আক্রান্ত সাতহাজার তিনশত এক। যেখানে বিশ্বপরিস্থিতি গতকাল রাত বারোটা পর্যন্ত ; আক্রান্ত ৩১৭৩৪৪২, মৃত্যু ২২০৪১৪ এবং সুস্থ ৯৮৫১৮০ জন (জিটিভি)। তবুও জীবন অবাধ্য স্রোতের মতোই নিরন্তর বহমান। আমরা হতে চাই সেই মানবিক জীবন স্রোতের অক্লান্ত সহায়ক সহযাত্রী। সকল প্রতি স্রোতের মধ্যেও জীবনের স্বাভাবিক স্পন্দন ধরে রাখতে চাই সাধ্যমতো যুদ্ধে। এখন যুদ্ধবেলা! করোনাকাল! এর মধ্যেই আজ আমার একজন প্রিয় মানুষের জন্মদিন! তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা নিবেদনের জন্যেই আমার এই আয়োজন করোনাকালে জন্মদিন । সেই মানুষটি সৈয়দ আজিজুল হক। একজন সৈয়দ আজিজুল হক। স্যার শুভ জন্মদিন!

এক অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে সৈয়দ আজিজুল হক

সৈয়দ আজিজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। তিনি শিল্প সমালোচক, প্রাবন্ধিক এবং মননশীল দায়িত্ববান গবেষক। এক সময় গভীরভাবে নিমগ্ন ছিলেন রাজনীতিতে।
ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী এবং নেতা।তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা সেই রাজনীতির সূত্র ধরেই। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই ঘনিষ্ঠতায় জমেছিলো প্রচুর পলিমাটিও। দ্বিতীয় বারের ঘনিষ্ঠতা আমি যখন আবদুল হককে নিয়ে গবেষণা করছি তখন থেকে। আমাকে আমার কাজে যথার্থ সহযোগিতা পাবার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর কাছেই পাঠিয়েছিলেন আমার আরেক শিক্ষক পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। গিয়ে দেখলাম তিনি আর কেউ নন এক সময়ের ছাত্র ইউনিয়নের নিবেদিত ছাত্রনেতা সকলের পরম প্রিয় ‘মাসুম ভাই’। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থাক। শুধু এটুকু বলি কাসেম স্যার আমাকে যোগ্য মানুষটির কাছেই পাঠিয়েছিলেন। সৈয়দ আজিজুল হকের সহযোগিতা ছাড়া আবদুল হককে নিয়ে পিএইচডি করা আমার পক্ষে দুরূহ হতো। এখনও তাঁকে আমি অভিভাবক মানি। আমি তাঁর শ্রেণিকক্ষের ছাত্র না হলেও তিনি আমার সার্বক্ষণিক শিক্ষক।
লেখক হিসেবে সৈয়দ আজিজুল হক অনেক বেশি লিখেছেন তা হয়তো বলা যাবে না। তবে তাঁর লেখা পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানে এবং গুণে। তিনি যেখানে যতোটুকু লিখেছেন; লিখেছেন অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে। সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন তথ্য ও তত্ত্বগত সত্যনিষ্ঠতা এবং
বিষয়বস্তুগত দার্শনিক অভিব্যক্তিতেও। তাঁর মতো দায়িত্ববান লেখক আমাদের এই সর্বৈব রোগাক্রান্ত সমাজে বড়ো বেশি প্রয়োজন।

সৈয়দ আজিজুল হক স্যারের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে লেখক।

সৈয়দ আজিজুল হকের জন্ম ১৯৫৯ সালের ৩০ এপ্রিল। বর্তমান পিরোজপুর জেলার সেহাঙ্গল গ্রামে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করেছেন সেহাঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রজমোহন মহাবিদ্যালয় (বি.এম কলেজ) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নিয়েছেন উচ্চতর শিক্ষা। সমাপ্ত করেছেন এম ফিল ও পিএইচ ডি; যথাক্রমে ময়মনসিংহ গীতিকা এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পের উপর। সৈয়দ আজিজুল হকের প্রথম গ্রন্থ ধনিকগোষ্ঠির লুটপাটের কাহিনী (১৯৮৭) মতিউর রহমানের সাথে যৌথভাবে রচিত। গ্রন্থটি সাপ্তাহিক একতায় প্রকাশিত সাড়া জাগানো কিছু প্রতিবেদনের সংকলিত রূপ। এ ছাড়াও তাঁর রচিত এবং সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ হলো :

রচিতগ্রন্থ :
ক. গবেষণামূলক গ্রন্থ : ১.দীনেশচন্দ্র সেন (২৯৯০), ২. ময়মনসিংহের গীতিকা : জীবনধর্ম ও কাব্যমূল্য (১৯৯০; দ্বি. সং ২০০৩), ৩. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : সমাজচেতনা ও জীবনের রূপায়ণ (১৯৯৮; দ্বি. গং ২০১৮), ৪. জীবনানন্দের শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৬), ৫. মন ও মনন (২০১১), ৬. বাংলা কথাসাহিত্যে মানবভাবনা (২০১৭) ও ৭. কথাশিল্পী মানিক (২০২০)।
খ. শিল্পকলা বিষয়ক গ্রন্থ :
১. কামরুল হাসান : জীবন ও কর্ম (১৯৯৮), ২. কামরুল হাসান (২০০৩), ৩. সফিউদ্দীন আহমেদ (২০১৩), ৪. জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র (২০১৫), ও ৫. কাইয়ুম চৌধুরী : শিল্পীর একান্ত জীবনকথা (২০১৫)
সম্পাদিত গ্রন্থ : ১. দীনেশচন্দ্র সেন-সংকলি মৈমনসিংহ-গীতিকা (১৯৯৯), ২. আবদুল হকের স্মৃতি-সঞ্চয় ১ (২০০৩), ৩. আবদুল হকের স্মৃতি-সঞ্চয় ২ (২০০৫), ৪. রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ চিঠিপত্র (২০০৮) ৫. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : শতবার্ষিক স্মরণ (ভীষ্মদেব চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাব : ২০০৮) ৬. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : কিশোর কিশোর সাহিত্যসমগ্র (২০০৯) ৭. কামরুল হাসান : বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা (২০১০), ৮. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : উপন্যাসমগ্র ( ৬ খণ্ড : ২০১০-২০১১), ৯. শ্রেষ্ঠ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (২০১৫), ১০. জয়নুল আবেদিন : জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি (২০১৬), ১১. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ছোটগল্পসমগ্র (৪ খণ্ড : ২০১৭), ১২. আলাউদ্দিন আল আজাদ : নির্বাচিত গল্প (২০১৮) ১৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০১৯; দ্বি. সং ২০২০) [মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমগ্র ৬ খণ্ড এবং ছোটগল্প ৪ খণ্ড আলাদাভাবে ধরে সৈয়দ আজিজুল হকের সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা হবে ২১টি]
সৈয়দ আজিজুল হকের অনেক প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকা, সাময়িকী ও সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে যেগুলো এখনও অগ্রন্থিত রয়ে গেছে। এ ছাড়া তাঁর অল্প কিছু অনুবাদও আছে।

সৈয়দ আজিজুল হকের যে বইটি আমি প্রথম পড়ি সেটি হলো “ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী”। ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত গ্রন্থটি আমি কিনেছিলাম ১৯৮৮’র আগস্ট মাসের ৬ তারিখে। ফরিদপুরের এক সময়ের বিখ্যাত বইয়ের দোকান বই বিতান থেকে। দোকানটি এখন আর নেই। আমাকে সেদিন যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল তা হলো তাঁর কাজের পরিচ্ছন্নতা ও পারিপাট্যবোধ। এখনো যা শুধু বহালই আছে তাই নয় অনেক বেশি সমৃদ্ধও হয়েছে। আমি বিস্মিত হই এই ভেবে যে তিনি শুরু থেকেই কতোটা সত্যনিষ্ঠ এবং সিরিয়াস ছিলেন! তাঁর বেশিরভাগ গ্রন্থই আমি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। কিন্তু তার বিস্তারিত বিশ্লেষণের সুযোগ এখানে নাই। সে উদ্দেশ্যেও এই নিবন্ধ লেখা নয়। কেবলমাত্র গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রেরণা থেকেই এই লেখা। একজন সত্যিকারের সৎ লেখকের পরিচয় কিছুটা হলেও পাঠকের কাছে তুলে ধরাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
সৈয়দ আজিজুল হকের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রগাঢ় সমাজচেতনা, বিজ্ঞানমনস্ক ইতিহাসবোধ, প্রখর জীবনবাদিতা। তিনি শুধু বিশ্লেষণই করেন না, তার সাথে সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করেন দিকনির্দেশনাও। ধরি মাছ না ছুই পানি এমন কোনো প্রবনতা তাঁর লেখায় নেই। তিনি যা বলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বলেন। আর সেটা বলেন উচ্চমানের শিল্পশৈলীর সকল শর্ত অক্ষুণ্ন রেখেই। ব্যক্তি জীবনে সৈয়দ আজিজুল হক পোশাকে, পরিচ্ছদে, আচরণে যেমন নিখুঁত মার্জিত রুচির অনুশীলনকারী; তাঁর লেখাও তেমনি বিষয়বিন্যাস ও ভাষাসৌষ্ঠবে অতুলনীয়। নিশ্ছিদ্র তাঁর যুক্তির শৃঙ্খলা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর চিন্তার স্বচ্ছতা। সত্যিকারের একজন ভাবুক ও মননশীল চিন্তাবিদের পরিচয় বিধৃত আছে সৈয়দ আজিজুল হকের লেখার মধ্যে। তাঁর প্রজ্ঞা, মেধা, মননশীলতা ও শিল্পদক্ষতা সম্পর্কে বিদগদ্ধসমাজ অবগত আছেন। আমি শুধু আর একটি বিষয়ের উল্লেখ করেই শেষ কররো; সেটি হলো লেখক হিসেবে তাঁর সত্যনিষ্ঠা এবং পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা।
গত একুশের বই মেলায় প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থটির শিরোনাম তিনি দিয়েছেন কথাশিল্পী মানিক। গ্রন্থভুক্ত ১৭ টি প্রবন্ধের দুইটি ছাড়া বাকি সব প্রবন্ধই রচিত হয়েছে মানিকের উপন্যাস নিয়ে। শুধু দুইটি প্রবন্ধ ছোটগল্প ও কিশোরসাহিত্য সম্পর্কে। অনায়াসেই এই গ্রন্থের নাম হয়তো হতে পারতো ঔপন্যাসিক মানিক। হলে তা অনেক বেশি বাণিজ্যসফল হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তা করেন নি। ব্যক্তি স্বার্থে প্রশ্রয় দেন নি লেখকবৃত্তির ন্যূনতম অসততাকে। অথচ এই বই মেলাতেই, আমি নিজে বেশ পরিচিত এবং অত্যন্ত বিখ্যাত এমন অন্তত (অন্তত বলছি কারণ এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে) চার জনের চারটি বইয়ের নাম দেখে কেনার জন্য প্রবল উৎসাহ নিয়ে গিয়ে বইয়ের ভেতরটা দেখে গভীর মনোকষ্ট নিয়ে বই না কিনেই ফিরে এসেছি। শিরোনামের সাথে সমগ্র গ্রন্থের সম্পর্ক অতি সামান্য। অনেক ক্ষেত্রে নাই বললেই চলে। এ সমস্ত গ্রন্থের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেই আলোচনা করা যায়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রও এটি নয়। কাদা ঘাঁটাঘাঁটির ইচ্ছে ও রুচি আমার কোনো কালেই ছিল না। আর তা ছাড়া যিনি সত্যিকারেই ঘুমিয়ে থাকেন তাকে জাগানো যায়। কিন্তু যিনি জেগে ঘুমান! তাকে জাগানোর সাধ্য কার!
যাঁরা জ্ঞানের পথে হাঁটতে চান। এগিয়ে যেতে চান। স্বপ্ন দেখেন আলোকদীপ্ত পৃথিবীর। কিন্তু দ্বিধা দ্বন্দ্বে আর বুদ্ধিবৃত্তির এই মহা গোলকধাঁধার মধ্যে আটকে আছেন। হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছেন কেউ কেউ। সৈয়দ আজিজুল হকের লেখা তাঁদেরকে জাগতে নয় শুধু এগিয়ে যেতেও সাহায্য করবে।
স্যার আপনার দীর্ঘ ও সুস্থজীবন প্রত্যাশা করি। শুভ জন্মদিন!

লেখক : মাহবুব বোরহান

৩০.০৪.২০২০ মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
লেখক: অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত দিন