কোনো বই প্রকাশই সাহিত্যের ক্ষতি করতে পারে না : আনিসুল হক

আনিসুল হক

আত্ম-উন্নয়নমূলক বই বিক্রি বেশি হচ্ছে, এতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে কিনা! একজন সাংবাদিক বইমেলায় এই প্রশ্নও করলেন, এ ধরনের বই প্রকাশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত কিনা!
আমার উত্তর ছিল, কোনো বই প্রকাশই সাহিত্যের ক্ষতি করতে পারে না। যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা শিল্পের জন্য, সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর।
কিন্তু আমাদের বেশি করে সাহিত্য পড়া উচিত। আত্মউন্নয়নমূলক বই, যেমন সাফল্যের সহজ উপায়, কী করে আপনি ১৮০ দিনে কোটিপতি হতে পারেন, প্রতিপত্তি ও বন্ধুলাভ–এই ধরনের বই পশ্চিমাদেশগুলোয় প্রচুর বের হয়। এবং সেসব প্রচুর বিক্রিও হয়। যিনি সফল হওয়ার পরামর্শ দেন, অনেক সময় তিনি নিজে সফল নন (যেমন আমি), যিনি কোটিপতি হওয়ার পরামর্শ দেন, তাঁর হয়তো চুলায় হাঁড়ি ওঠে না। এই ধরনের বই পড়লে কোনো ক্ষতি আছে? উত্তর হলো, না ক্ষতি নেই।
কিন্তু যে কথা বলাটা খুব জরুরি, তাহলো কেউ যদি সাহিত্য পাঠ না করে, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, জীবনী, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান না পড়ে– তাহলে তা ক্ষতির কারণ হবে। সাহিত্য মানুষের মনকে সংবেদনশীল করে, অনুভূতিকে গাঢ় করে, আমরা একটা ঝরা পালকের জন্য কাঁদি, আমাদের কাছে ‘সুখহাসি আরো হবে উজ্জ্বল, সুন্দর হবে নয়নের জল, স্নেহসুধামাখা বাসগৃহতল আরো আপনার হবে।’ একজন বাম পন্ডিত কাম রাজনীতিবিদ একবার বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান আবার পড়াশোনা করেছেন নাকি! রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা ছাড়া তিনি কিছুই পড়েননি।’ প্রথম কথা, বঙ্গবন্ধু অনেক পড়তেন, তার প্রমাণ আমরা অসমাপ্ত আত্মজীবনী কিংবা কারাগারের রোজনামচাতে পাই; আবার তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে গাড়িতে বসে পাকিস্তানি নেতাদের কাজী নজরুলের কবিতা মুখস্থ বলে অনুবাদ করে দিয়েছিলেন। এমিল জোলার তেরেসা রেকুইনে পড়ে কেমন লাগল, সে বিবরণ বঙ্গবন্ধু তাঁর বইয়ে দিয়েছেন, তেমনি গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ‘কলকাতার কাছেই’ পড়ে দুই মেয়ে আর তার মায়ের দুঃখ-দারিদ্র্যে তিনি বিচলিত বোধ করেছেন। আমি তাই বলি, ওই পণ্ডিত তাত্ত্বিক বই পড়েছেন বলে তার পেছনে পাঁচজন মানুষও সমবেত করতে আজো পারেননি, আর শেখ মুজিবুর রহমান সাহিত্য কবিতা জীবনী এইসব পড়েছিলেন, আর পড়েছিলেন মানুষের মন, সে জন্যই তিনি দেশটাকে স্বাধীন করতে পেরেছিলেন।
বিল গেটস প্রায়ই তাঁর পড়া ১০টা বই আর তাঁর পড়া ১০টা চলচ্চিত্রের তালিকা দেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর ছিল অনেক স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্ন তিনি পেয়েছিলেন বই থেকে। তিনি এক লেখায় তাঁর স্কুলের লাইব্রেরিয়ানের কথা বলেছিলেন, যিনি তাকে বই পড়ার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। মিসেস ‌ক্যাফিএয়ার নামের ওই শিক্ষিকার অবদানের তিনি তাঁর মা আর নানির সঙ্গেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সফল হওয়ার জন্য পরিশ্রম আর অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি আমাদের অনূর্ধ্ব ১৯-এর বিশ্বকাপ জয়ের উদাহরণটি একটু বিশ্লেষণ করি, দেখব, সেই পুরোনো সূত্রই কাজে লেগেছে। দুই বছর আগে কুড়িজনের দল ঠিক করা হয়েছে। দেড় বছর আঠারো জনের দলটি এক সঙ্গে থেকেছে, খেয়েছে, খেলেছে। তারা কঠোর পরিশ্রম করেছে। তাদের কোচ তাদের খেলার অনুশীলন করিয়েছেন, কঠোর ফিটনেস করিয়েছেন ফিজিও।তারা জিততে চেয়েছে, তাদের মধ্যে কাজ করেছে জিগীষা। আমাদের স্মরণে আসবে, জার্মানি যেবার ব্রাজিলে গিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল জিতল, সেবার তারা ব্রাজিলে দ্বীপ ভাড়া করে সেখানে অনেক দিন ধরে একসঙ্গে থেকে অনুশীলন করেছে। শ্রীলংকা যেবার বিশ্ব ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তারা একই টিম এক সঙ্গে অনেকগুলো ম্যাচ খেলেছিল। আমাদের অনূর্ধ্ব ১৬, অনূর্ধ্ব ১৪ নারী ফুটবল দল যে ভালো করে, তার কারণও তারা প্রাথমিক স্কুল থেকে ফুটবল খেলা শুরু করেছে, তারপর তাদেরকে ঢাকায় ক্যাম্পে রেখে দেয়া হয়, তারা একসঙ্গে থাকে, আর ক্রমাগত অনুশীলন করে।

দ্য স্টোরি অব সাকসেস (সাফল্যের গল্প) নামের একটা ভুবনবিখ্যাত বই আছে, ম্যালকম গ্লাডওয়েলের লেখা। সেখানে তিনি বলেছেন, যে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত দক্ষতা অর্জন করতে হলে সেই বিষয়ে ১০ হাজার ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হবে। মানে মোটামুটি চার বছর দিনে আটঘণ্টা করে ওই একটা বিষয় নিয়ে অনুশীলন করতে হবে।
এই কথা মোটামুটিভাবে সত্য। ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া সারা বাংলাদেশের কুড়িলক্ষ ছেলেমেয়ের মধ্যে যারা ক্রিকেট ভালো খেলেছ, এ-রকম ৫০০ জনকে বাছাই করে যদি ৪ বছর সপ্তাহে ৬ দিন রোজ ৮ ঘন্টা করে ভালো কোচের অধীনে ক্রিকেট খেলানো যায়, এরা যখন ক্লাস টেন পাস করে বেরুবে, তখন তাদের ভেতর থেকে দেশ সেরা ২২ জন খেলোয়াড় আমরা পাব। ব্যতিক্রম হবে, ৫০০ জনই ভালো ক্রিকেটার হবে না। আবার দেশের সেরা ২২ জনের মধ্যে এর বাইরে থেকেও খেলোয়াড় আসবে।
ম্যালকমের এই ১০ হাজার ঘন্টা তত্ত্বের ওপরে অনেক গবেষণা হয়েছে, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণা করেছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এই তত্ত্ব মোটের ওপরে সত্য নয়। ব্যবসার ক্ষেত্রে এটার সত্যতা মাত্র ১ ভাগ।
১০ হাজার ঘন্টার তত্ত্ব যে অভ্রান্ত নয়, তা বুঝতে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় লাগে না। একটা আমগাছ ১০ হাজার দিন চেষ্টা করলেও কাঁঠাল ফলাতে পারবে না। কিন্তু দুটো কথা থেকে আমি সরছি না। ১. জীবনে বড় হয়েছেন, সফল হয়েছেন, কিন্তু পরিশ্রম করেননি, লেগে থাকেননি, এ রকম উদাহরণ একটাও পাওয়া যাবে না। ২. বড় ব্যবসায়ী হওয়া, বড় ব্যাংকার হওয়া, সিইও হওয়া, বড় গায়ক বা লেখক হওয়াই আসল কথা নয়। আসল কথা হলো, ভালো মানুষ হওয়া। যদি কেউ বই না পড়ে, গান না শোনে, ভালো চলচ্চিত্র না দেখে, এবং তার যদি নৈতিকতার শিক্ষা না থাকে, মূল্যবোধ না থাকে, তাহলে তিনি খুব ক্ষতিকর একজন মানুষ হবেন। তিনি বন ধ্বংস করতে পারেন, নদীকে হত্যা করতে পারেন, ট্রাম্পের মতো বলতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তন আসলে গুল-গাপ্পি, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এ ধরনের সফল মানুষেরা পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে।
জীবনে কেউ ব্যর্থ হয় না। প্রতিটা মানুষই সফল। রবীন্দ্রনাথ তার গানে জোনাকিকে বলেছন, ‘তুমি নও তো সূর্য, নও তো চন্দ্র, তোমার তাই ব’লে কি কম আনন্দ। তুমি আপন জীবন পূর্ণ ক’রে আপন আলো জ্বেলেছ।’ জোনাকি চাঁদ-সূর্যের মতো বড় হতে না পারে, কিন্তু সে তো আলো জ্বালে। আমরা যে যাই করি না কেন, আমরা যেন ভালো কাজ করি, আমরা যেন আলো জ্বালি।
এই লেখাটা শেষ করতে চাই একজন নারীর কথা বলে। একজন বালিকা, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, তাদের জমিদারি আছে, বাড়িতে শুধু উর্দুতে কথা বলা হয়। বাংলা বলা সেই বাড়িতে পাপ, ইংরেজি শেখা তো মহাপাপ। সেই বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি একা একা রাতের বেলা প্রদীপ জ্বালিয়ে বাংলা বই পড়ে, ইংরেজি শেখে। অন্যদের চোখে যাতে আলো না পড়ে, সে জন্য সে প্রদীপের চিমনির পাশে কার্ড রেখে দেয়, ঘুমন্ত ভাইদের চোখে ছায়া ফেলে। ভাইয়েরাও তাকে গোপনে সাহায্য করে। সেই মেয়ে নিজের অন্তরের সলতেটাকে বই পড়ে পড়ে প্রজ্জ্বলিত করল। সে এত ভালো বাংলা শিখল যে বড় হয়ে বই লিখল, অবরোধবাসিনী, মতিচূর। এত ভালো ইংরেজি শিখল যে বই লিখল, সুলতানা’স ড্রিম। তারপর একা একা আলোকিত হলে তা চলবে না। সে ডাক দিল, জাগো ভগিনী। স্কুল বানাল। মেয়েদের স্কুল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী ধরে আনতে লাগল।
তার সেই পরিশ্রম বৃথা যায়নি। আজকে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী নেত্রী নারী, স্পিকার নারী। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার ছেলেদের চেয়ে বেশি।
বেগম রোকেয়রা স্কুলের ছাত্রীদের এক ভাষণে বলেছিলেন, তোমরা যে স্কুল ভবন দেখছ, তা গড়তে অনেক মাটিকে নিজেকে পুড়িয়ে ইট হতে হয়েছে, অনেক শামুককে নিজেকে পুড়িয়ে চুন হতে হয়েছে, অনেক গাছকে করাতকে বুকে টেনে নিয়ে নিজেকে চিরে কাঠ হতে হয়েছে।
সাফল্যের সহজ কোনো সূত্র নেই। কঠোর পরিশ্রম লাগবেই। কিন্তু শুধু মোটিভেশনাল বই পড়লে চলবে না, সাহিত্য পড়তে হবে। সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। সামাজিক কাজে অংশ নিতে হবে।
সাফল্যের গল্প
আনিসুল হক।

আপনার মতামত দিন