গল্প: বন্ধুত্ব কিংবা মৃত্যু

রাবেয়া আক্তার

ফাহিম ও হাবিব দুই বন্ধু, দশম শ্রেণীতে পড়ে।দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। পরদিন শুক্রবার , সরকারি ছুটি। ফাহিম ও হাবিব সাফারি পার্ক যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। সংক্ষেপে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। পার্কটি বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন মাওনা ইউনিয়নের বড় রাথুরা মৌজা ও সদর উপজেলার পীরুজালী ইউনিয়নের পীরুজালী মৌজার খন্ড খন্ড শাল বনের ৪৯০৯.০ একর বন ভূমি ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত। সাফারি পার্কটি দক্ষিণ এশীয় মডেল বিশেষ করে থাইল্যান্ডের সাফারী ওয়ার্ল্ড এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপন করা হয়েছে। ফাহিম,হাবিব প্রথমবারের মতো সেখানে যাবে। খুব আনন্দিত তারা। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ নিয়েই কথাবার্তা তাদের। মাগরিবের নামাজ পড়ার পরপরই যে যার যার বাসায় ফিরলো। শুক্রবার সকাল নয়টা, তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাহিম তার ছোট মামার বাইকটি নিলো। ফোন বেজে ওঠে ,দেখে হাবিবের মুখ ভেংচানো ছবিটা ভেসে উঠেছে। হাবিব বললো , আমাকে বাসা থেকে নিয়ে যাস,ওদিক আর কষ্ট করে যেতে পারবো না। সাফারি পার্ক যাওয়ার পথে একটা নির্জন স্থান , যেখানে অনেক পুরনো কবর;তার সাথে তেঁতুল গাছ। হাবিবের বাসা কবরস্থান পেরোনোর পর আর ফাহিমের বাসা কবরস্থান পেরোনোর আগে। ফাহিম বাইক নিয়ে হাবিবের বাসার দিকে যাচ্ছে, হাবিবকে নিয়ে একদম সাফারির সামনে। একশো টাকার বিনিময়ে দুটো টিকিট পেল। সারাদিন ঘুরলো পার্কে। সন্ধ্যার একটু আগে ওরা বাসার দিকে রওনা । তেঁতুল গাছের নিচে আসতেই ঝড় শুরু।ধুলো বালি দিয়ে ঢেকে যাচ্ছে পুরো পৃথিবী। এখানে আসার পূর্বে ঝড়ের কোনো আভাস পায়নি তারা কেউই ।হয়তো তাদের সাথেই এমনটা ঘটছে আর সবকিছুই স্বাভাবিক! বাইকটা যেন দুলছে,সামলে নিতে পারছে না ফাহিম। সামলাতে না পেরে তেঁতুলগাছের সাথে প্রচন্ড গতিতে ধাক্কা খেল। তাদের দুজনের জগত যেনো শেষ সায়াহ্নে।চোখে কিছু দেখছে না,মুখে কিছু বলতে পারছে না।হাবিব বাইকের পেছন থেকে ছিটকে পড়ে যায় কবরস্থানের দেয়ালে। মাথায় আঘাত পায় , সাথে সাথে মৃত্যু হয় তার। ফাহিম জ্ঞান হারালো। সোমবার যখন সে চোখ খুললো তখন সে তার ছোট ঘরটায়।তার মনে পড়লো শুক্রবারের সন্ধ্যার পরের ঘটনা।মা , আব্বাকে জিজ্ঞেস করলো -হাবিব কোথায়, কেমন আছে ,কী করছে , কোথায় আছে !তারা কোনোটার উত্তর দিতে পারেনি ঠিকভাবে। ফাহিমের বুঝতে বাকি রইলো না,হাবিব আর নেই।হাবিবের সাথে তার কতশত স্মৃতি। ফাহিমের এখন দিন কাটে তো রাত কাটে না, রাত কাটে তো ভোর দেখে না !

ছয় বছর পর…

ফাহিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। এখনও ভাবে হাবিবকে।তার মনের পুরোটা জুড়ে হাবিবের বসবাস,তার বন্ধু হাবিব,তার ভাই হাবিব। শুক্রবারের এক সন্ধ্যায় ফাহিম বাসায় আসার জন্য ঢাকা থেকে রওনা দেয়। এলাকায় এসে প্রথম হাবিবদের বাসায় যায় সবসময়ই , হাবিবের আব্বু আম্মুর কাছে ফাহিম-ই এখন হাবিব; তাদের সন্তান। বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলো । ফাহিম তার বাসার পথে।ছয় বছর আগে যেখানে এক্সিডেন্ট হয়েছিল তার কাছাকাছি আসতেই গা ছমছম করছে , মনে হচ্ছে তাকে কেউ নজরদারি করছে অনেকক্ষণ ধরে। যেখানে এক্সিডেন্ট সেখানে আসা মাত্রই হাবিবের কন্ঠ- “বন্ধু আমার একা থাকতে খুব কষ্ট হয়।আসবি? ” ছয় বছর আগের সন্ধ্যায় যে বাতাস বয়েছিল সেই বাতাস বইছে । বাতাস নয় যেনো মৃত্যুর আভাস। ঠিক হাবিবের মতোই ফাহিমের মৃত্যু। অতঃপর হাবিবের পাশে ফাহিমের কবর। এপিটাফে লেখা – বন্ধুত্ব কিংবা মৃত্যু।মৃত ফাহিম ও হাবিব ….

 

আপনার মতামত দিন