গল্প : মেয়ের বুদ্ধিতে নামাজে ফিরল বাবা

মুজিবুল হক:
সালমা, তানহা ভালো বন্ধু। খুউব ভালো বন্ধু, দুজন দুজনকে খুব ভালাে বুঝে। যেকোন কাজে মিলেমিশে সিন্ধান্ত নেয়। নিয়মিত নামাজ পড়ে। দুজনেই চেষ্টায় আছে তাদের পরিবারের সবাইকে যাতে নামাজী বানানো যায়। সবে স্কুলের গন্ডি পেড়িয়েছে তারা, তাদের এই এক্টিভিটিসে পরিবার খুবই খুশি। সমস্যা বাঁধলো সালমার বাবাকে নিয়ে।

আজ আসরের নামাজের সময় প্রায় দুদিন পর তানহার সাথে দেখা হবে সালমার। গত দুদিন বাবার চিন্তায় ঘর থেকে বের হয়নি সালমা। সালমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে বয়ে গেছে ছোট একটা নদী, নদীর দুপাশে সারি সারি গাছ, আর ঘাস। তানহা বললো মাশাল্লাহ মহান আল্লাহ তায়ালার কি অপরুপ সৃষ্টি! কি অপূর্ব প্রকৃতি। সালমাও বললো মাশাল্লাহ তাইতো। সৃষ্টিকর্তা আমাদের চারপাশে কত রহমত যে দিয়েছেন। সারাজীবন শুকরিয়া করলেও এর বর্ণনা শেষ করা যাবে না।

এক পর্যায়ে তানহা লক্ষ্য করল সালমার চেহারা বিবর্ণ দেখাচ্ছে। কেন জানি মনে হচ্ছে সালমার মন খারাপ। তানহা জিজ্ঞেস করল- কিরে সই কি হইলো? মন খারাপ কেন?
সালমা বললো- আর বলিস না, মনটা খুব খারাপ। বাবা ইদানিং পরিবারে সমস্যা সৃষ্টি করছে। ঠিকমত নামাজে যায় না, ইদানিং মদ খাচ্ছে। বাড়িতে সবার সামনে বসেই সিগারেট খাচ্ছে। বাড়ির পরিবেশটাকে নষ্ট করে ফেলছে। বাবা নাকি সৃষ্ঠিকর্তায় বিশ্বাস করে নাহ!আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের মৃত্যু হবে এটা বিশ্বাস করে না। বাবা নিরীশ্বরবাদীতে বিশ্বাসী। তখন তানহা বললো- চিন্তা করিস নাহ, ঠিক হয়ে যাবে।
আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসছে, তুই আমাকে সাহায্য করবি? বলল সালমা।
তানহা দ্ব্যার্থভাষায় বললো মারে, তুই আমার প্রিয় সই তোকে সাহায্য করবো না কাকে করবো! অবশ্যই করবো! কিন্তু তুই করবি টা কি?
সালমা বললো শোন বাবা যেহেতু সৃষ্ঠিকর্তার ইচ্ছায় মৃত্যুতে বিশ্বাস করে নাহ, আমার ইচ্ছা এমন একটা কাজ করবো যাতে বাবার মৃত্যুর অনূভূতি আসে!‍ যাতে বিশ্বাস করতে শুরু করে আল্লাহ নামে কেউ একজন আছেন, আমাদের মৃত্যু তাঁর ইচ্ছাতেই হবে!

মাগরিবের আযান হচ্ছে। সালমা বললো চল বাড়ি যাই। নামাজ পড়া লাগবে! তানহা বললো ওকে। কাল বিকেলে আসরের নামাজ পড়ে আবার দেখা হবে। তুই তোর বাবার জুমার নামাজের সাদা জুব্বাটা নিয়ে আসবি।

পরদিন বিকাল।
সালমা বললো শোন আজকে তুই আমাদের বাসায় থাকবি। বাবা প্রায় মদ খেয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে, আমরা আজরাইলের মত সেজে বাবাকে ভয় দেখাবো।
তুই তোর ভাইয়ের ভয়েস রেকডিং করে নিয়ে আসবি।।

রাতে সালমার বাবা বাড়ি ফিরছেন, সালমা, তানহা দুজনেই তানহার বাবার দুটা পাঞ্জাবি পড়েছে, পাঞ্জাবির তুলনায় তারা ছোট হওয়াতে পুরো শরীর ঢেকে গেছে। দেখতে বিদঘুটে দেখাচ্ছে, মুখে কালি মেখেছে, তানহার ভাইয়ের ভয়েস রেকডিং নিয়ে এসেছে।

সালমার বাবা এসেই বিছানায় শুয়ে পড়লেন, সালমা আর তানহা বাবার রুমের দক্ষিণ এর জানালাটার দিকে গেলো। রেকডিং বাজা শুরু করলো- নামাজ ছাড়া উপায় নেই, এই দুনিয়া ক্ষণিকের, দুনিয়ার লোভে মত্ত হয়ে থেকো না! নিশ্চয় তোমাদের আমার কাছে ফিরতে হবে এবং সেটা আমার ইচ্ছা অনুযায়ী।
অনেক বড় করে রেকডিং চলতে লাগলো। সালমার বাবা নেশার ঘুরে চোখ খুলতে পারছেন না। আবছা আলােতে তিনি দেখতে পেলেন দুটো সাদা পোশাক পরিহীত লোক হাত নাড়াচ্ছে আর এই কথা গুলো বলে যাচ্ছে! (রেকডিং চলছে আর তারা হাত নাড়ছে, মনে হচ্ছে কথা গুলো তারাই বলছে)।

সালমার বাবা ভয়ে ভীত হয়ে গেলেন। তিনি প্রচুর ঘামতে শুরু করলেন। আর উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন প্লিজ তোমরা আর কাছে এসো নাহ। আমাকে মেরো নাহ।
আমি কাল থেকেই নামাজে যাবো, খারাপ কাজ বন্ধ করবো। এসব বলতে বলতে তিনি বেহুশ হয়ে খাট থেকে নিচে পড়ে গেলেন।

সালমা আর তানহা পুরো রাত ঘুমায় নি। অপেক্ষা করছিলো শেষ দেখার জন্য।
দুজনে বাড়িতে ঢুকে ফজরের নামাজ পড়লো!
নামাজ সেরে সালমা তাঁর বাবার রুমের দিকে উঁকি দিলো।
সে দেখলো তাঁর বাবা নামাজ পড়ছে। আর অঝোরে কান্না করছে, আল্লাহ তুমি আছো! আমি তোমার অস্তিত্বে বিশ্বাস করছি। আমার সকল অপকর্ম এর জন্য আমি মাফ চাই প্রভু। মাফ করো আমাকে!

সালমা পরক্ষণেই তানহাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো আর বললো (আলহামদুলিল্লাহ)!
তানহা বললো সই তুই দুঃসাহসী একটা মেয়ে একটা অন্ধকারের যাত্রীকে আলোতে ফিরালি তুই।

মুজিবুল হক: লেখক ও কিশোর সাংবাদিক।

আপনার মতামত দিন