ছোটগল্প : নিবাসহীন

আজমাঈন জান্নাত

ছোটবেলা থেকে কখনোই সে বাবার স্নেহ পায়নি। তারপরও ভিতরের কষ্টগুলো কখনো ওপরে দেখায়নি। চিত্তে চঞ্চল বলে একটা কথা আছে, সেটা সব সময় ছিলো। খুবই দুষ্ট স্বভাবের আর মিশুক। তাই মেয়েরাও কম পাগল ছিলো না তার জন্য। কখনো মুখ গোমড়া ভাবটা নেই, এতো কষ্ট, এতো দুরত্ব সে কি করে হজম করত কে জানে! তবুও মাঝে মাঝে ভাবলে গলায় কিছু একটা আটকে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তার ঠিকানাটাও অস্থায়ী। এই পর্যন্ত কত বার যে তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে তার হিসাব নেই। হিসাব রাখেনি সে। কারো সুপারিশে ফিরলেও যেন তাকে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হয়, কখন রাত-বিরেতে ঘর থেকে আবার বেরিয়ে যেতে হয়। কারণ ছোটবেলা থেকেই তার এ যুদ্ধ।
জানিনা, একে কি বলে। এর নাম আছে কিনা তাও আমি জানিনা। যুদ্ধেরও তো একটা সুন্দর শেষ আছে, তার গল্পের সুন্দর শেষ অবশ্য এখন আর সে আশা করেনা। তার জীবনটা যেন এক রেলগাড়ি, ঝকঝকিয়ে শুরু হয়,এই বগি থেকে ওই বগি, কখনো মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া। এটাই ওর যাযাবর জীবন।
এতক্ষণ বলছিলাম রেহানের কথা। বাবার আদর তো পায়নি, মায়ের আদরও পেয়েছে যদ্দিন মায়ের কাছে থাকতে পারে তদ্দিন। তাও মায়ের আদর পেতেও কত সংগ্রাম তার! তারপরও মা তো পারেনা ছেলেকে এভাবে রাখতে। চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয়ে যায়, এটা অন্তত মায়ের ক্ষেত্রে খাটে না। হাজার হলেও তো সে নিজের শরীরের একটা মাংসপিণ্ড, তাকে কি করে দুরে রাখা যায়? দুবেলা খেতে পারেনা ছেলের কথা ভেবে, কি করে খাবে?তার ছেলে হোটেলে ডাল দিয়ে খায়, কখনো কখনো খায়-ই না। আর মা কি করে মাংস দিয়ে খাবে? মন বলেতো একটা জিনিস আছে, নাকি?
কিন্তু রেহানের এখন আর কষ্ট হয়না। সে দিব্যি ঘুরে ফিরে দিন কাটিয়ে দেয়। দুবেলা ঠিকমতো খেতে পারলেও খায়না। কোনোদিন হোটেলে বসে, হয়তো মুখে দিতে গিয়ে মায়ের কথা মনে পড়ে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু সে সামলে নেয়। কোনো একদিন ইচ্ছে হলে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়, কিছু করেও না, কার জন্য করবে ও? নিজের জন্য মন চায়না। মা ফোন করে মাঝে মাঝে, মোবাইলের দিন বলে মা কোনোরকমে একটা নিশ্বাস নিতে পারছে। কখনো কখনো আত্মীয়ের বাসায় দুটো কথা বলতে যায়, আর তারাও না খাইয়ে তো ফেরাতে পারে না। একটা ভদ্রতা আছে তো। কিন্তু তারপরও দুচারটে কথা না শুনিয়ে রাখবে? শুধু শুধু একটা মানুষকে এক বেলা খাইয়ে লোকসান করতে কে চাইবে।সেও কথা গিলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় বেরিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেয়। অনেক সময় উড়ে যায়, আবার কখনো বাতাসের সাথে ফিরে আসে দুঃখের চিরচেনা ঠিকানায়।
তার অবশ্য এখন এগুলো নিয়ে আর ভাবতে মন চায়না। এইতো সেদিনই বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। জানেনা, কই যাবে, তাও বেরোতে হয়। কখনো মেস ভাড়া নেয় যা আছে তাই দিয়ে, আর কখনো বন্ধুর বাসায়, কোনো সময় হয়তো শীতের কনকনে ঠান্ডায় হয়তো হাড্ডির ভেতর হাড্ডি ঢুকে যায় তখন হয়তো মনের অজান্তেই বলে ফেলে, ‘আম্মু, কাঁথা দাও’।

আজমাঈন জান্নাত, শিক্ষার্থী- চট্টগ্রাম কলেজ।

আপনার মতামত দিন