ছোট গল্প: এক পথশিশুর ঈদ

আজাদ হোসেন রানা

রেললাইনে হাঁটতেছি এক জন সাত কি আট বছরের পথ শিশুর সাথে দেখা। সে বললো ভাইয়া আজতো ঈদ আমাকে কিছু খেতে দিবেন? চেহেরাটা দেখে খুব মায়া হলো বাচ্চাটার জায়গায় নিজের এক নিকটাত্মীয়র কথা মনে পড়লো, ভাবলাম কিছু কিনে দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করি পকেটে হাত দিয়ে দেখি মানি ব্যাগ বাসায় রেখে আসছি। বললাম আমার বাসায় যাবি? ভালো খেতে দিবো এইতো ১০ মিনিট হাঁটলেই বাসা। সে জবাবে মাথা নাড়ালো। তাকে নিয়ে সোজা বাসায় আসলাম আম্মু তাকে কিছু রুটি আর মাংস দিলো।সে খাচ্ছে, খেতে খেতে বললো ভাইয়া অনেক দিন পর মাংস খাইতাছি। জানেন ভাইয়া ২ বছর আগে আম্মা ছোটবোনেরে জন্ম দিবার সময় মারা গেছে, আব্বা নতুন বিয়া কইরা আমার ছোট্ট বোনটারেও দত্তক দিয়া দেয়। নতুন আম্মা আমারে সারাদিন মারে সাথেতো আব্বার মাইর আছে। একদিন আব্বা আমারে শেষ পযন্ত মাইরা ঘর থাইকা বাইর কইরে দে।সেদিন থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে ঐ রেললাইনে থাকি এখন আমারে আর কেউ মারে না,আর কেউ আমারে দিয়া কাপড় ধোয়ায় না,এখন আমি স্বাধীন যখন যেখানে ইচ্ছা ঘুমাতে পারি, খাইতে না পারলে জল খেয়ে থাকি,যদি জল খেয়ে পেট না ভরে তখন ডাস্টবিনে কুকুরের সাথে কুকুরের মুখ থেকে নিয়ে খেয়ে নিই। জানেন ভাইয়া আজ অনেক দিন পর মাংস খাচ্ছি, সেদিন এক বিয়ে বাড়িতে গেছিলাম খাইতে,প্রথমে প্রবেশ করেছি তারপর এক বাবু আমার কান ধইরা বের করে দিলো। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পাইরা সবার শেষে আবার গেছি। তারপর ওদের প্লেটের বাকি খাবার গুলো খাইতে দিছিলো সেদিনও পেট ভরে খাইছিলাম। জানেন ভাইয়া আজ যদি আম্মা বাইচ্চা থাকতো তাইলে আমারে এতো কষ্ট করতে হইতো না। তবুও আম্মা নাই তাতে কি, যেদিন আব্বা ঘর থাইকা বের করে দিছিলো সেদিন রেললাইনে এসে ইমরানের সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়।সে আমারে জানের দোস্ত ডাকে।ইমরানের আম্মাও আমারে ভালোবাসে ওদের বাসায় মাঝেমধ্যে খাইতে যেতাম। একদিন ওরাও দেখি বাসা ছেড়ে কোথায় চলে গেছে জানিনা আর কোন দিন দেখা হয় নাই ইমরানের সাথে। জানেন ভাইয়া আমার আর কখন বেশি খুশি লাগে রোজার ঈদে আর কোরবানির ইদে । রোজার ঈদে কারো বাসার সামনে দাঁড়ালে সেমাই খাইতে দেয়, কোরবানির ঈদেও বস্তির সবাই যখন যায়, ওদের সাথে আমিও যাই ভালো মাংস খাইতে পারি।এখন আমার ভালো লাগে স্বাধীন থাকি। বাচ্চাটা কথা গুলো বলতে বলতে এক বাটি মাংস খাওয়া শেষ।জিজ্ঞেস করলাম আর এক বাটি আনবো? না ভাইয়া আজকে যদি সব খাইয়া ফেলি আর এক দিন তো দিবেন না।আর একদিন কি আসবো আরেক বাটি খেতে? আমি চুপচাপ বসে আছি আম্মা তার চোখের জল মুছতে মুছতে ঐ পথশিশু বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কাঁদতে কাঁদতে বলতেছে আজ থেকে তুই আমার ছেলে তোকে আর রেলস্টেশনে থাকতে হবে না।তোকে আমি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো, তুই পড়ালেখা করবি।আমিও চোখের কোনায় আটকে থাকা জল মুছে আনন্দের অশ্রু হাসিতে হেসে বললাম আজ থেকে তুইও আমার ভাই।

আপনার মতামত দিন