জিপিএ-৫ই সফলতার মানদণ্ড নয়

রাহাত রাব্বানী

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ পেয়েছে। এ বছর পাশের হার ৮২.২০%; যা গতবছরের চেয়ে ৪.৪৩% বেড়েছে। জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯৪ হাজার ৫৫৬ জন। যেখানে মোট পরিক্ষার্থী সংখ্যা ২১,২৭,৮১৫ জন। এ থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, এ+ সবাই পায় না, পাবে না। একইভাবে সবাই কিন্তু উত্তীর্ণও হয়ে যায়নি। কিন্তু এই সহজ সত্য আমরা মেনে নিতে পারিনা। আমাদের সমাজ মেনে নিতে পারেনা। অভিভাবকগণ মানেন না। সবার চাওয়া জিপিএ-৫। এটিই যেন সমাজের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি!

যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের অভিনন্দন। যারা জিপিএ-৫ পায়নি কিংবা ফলাফল মন মতো হয়নি, তাদের প্রতিও শুভেচ্ছা, ভালোবাসা। এই ফলাফল কখনোই তোমাদের ভাগ্য বদল করতে পারবে না। তোমার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহস তোমাকে ঠিকই পৌঁছে দেবে তোমার লক্ষ্যে। তার জন্য প্রয়োজন ‘স্বপ্ন’। তোমাকে স্বপ্ন দেখতে হবে। যে স্বপ্নটা তোমাকে ঘুমাতে দেবে না। উদাহরণ হিসেবে এ পি জে আবদুল কালামকে দেখো। পাইলট হবার ইচ্ছে ছিলো তার। অথচ তিনি পরীক্ষায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন। তিনি কিন্তু হেরে যাননি। তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, তাকে অন্যকিছুর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই অন্যকিছু তিনি হতে পেরেছিলেন।

তোমাকেও মনে রাখতে হবে, সবাই জিপিএ-৫ পাবে না, জিপিএ-৫ পেলেই সবাই সবকিছু হবে না। তুমি জিপিএ-৫ পাওনি, মন খারাপ করার কিছু নেই। তোমার মধ্যে নিশ্চয়ই অন্যকিছু ঘুমিয়ে আছে। সেই অন্যকিছুটাকে খুঁজে বের করো, জাগিয়ে তোলো। দেখবে তুমিও সফল।

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের কথাই বলা যাক, বুয়েট থেকে পাশ করেছেন। অথচ তিনি ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে লিখছেন। কারণ তার ভেতর এই ক্ষমতা স্রষ্টা দিয়ে দিয়েছেন। হয়তো ইঞ্জিনিয়ার হলে আজ তার নাম আমরা জানতেই পারতাম না! অথচ আমরা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে থাকি। একইভাবে বিংশশতাব্দীর অন্যতম আধুনিক কবি হেলাল হাফিজ; কবিতার পিছনে সময় দিতে পারবেন না ভেবে মেডিকেল পড়েননি। অথচ দেখো, আজ হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তিনি দিব্যি বেঁচে আছেন।

তোমাকে তোমার ভালোলাগা খুঁজে নিতে হবে। তোমাকে দেখতে হবে তোমার দক্ষতা কোন দিকে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তিনি জিপিএ-৫ দূরে থাক, স্কুলেই যাননি। কথা থাকতে পারে, সবাই তো নজরুল না। হ্যাঁ, আমিও বলছি সবাই নজরুল না। কিন্তু সবার ভেতরেই আলাদা আলাদা ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। সেই ক্ষমতা খুঁজে বের করাটাই সফলতা। তখন আর কেউ জানতে চাইবে না, তোমার এসএসসিতে জিপিএ-৫ আছে কিনা? সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ও বরেণ্য অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের একটি বক্তব্য নিশ্চয়ই শুনেছো? সেই বক্তব্য থেকে বলি, আমাদের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান উচ্চ শিক্ষিত। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না, তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন কিনা। কেউ জানতে চায় না, আমাদের দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মমতাজের এসএসসি রেজাল্ট। কারণ তারা কেবল ফলাফলের জন্য বসে থাকেননি। তারা তাদের ভালোলাগা পুঁজি করে এতটা দূর এসেছেন।

সুতরাং, জিপিএ-৫ কখনোই সফলতার মানদণ্ড হতে পারে না। যারা জিপিএ-৫ পায়নি, তাদের অভিভাবকদের উচিৎ, সন্তানকে আরও বেশি প্রেরণা দেওয়া। তাদেরও উচিৎ যারা জিপিএ-৫ পেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, একইভাবে স্ট্যাটাস দেওয়া। যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদেরও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তাদের জন্য আরও সুন্দর কিছুই অপেক্ষা করছে হয়তো। অভিভাবকদের উচিৎ তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার। যেন এই সামান্য একটি ফলাফলের কাছে জীবনটা হারিয়ে না যায়। জিপিএ-৫ এর বাজারে সন্তানকে বেঁচে না দিয়ে, তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। তবেই আপনি, আপনার সন্তান, দেশ— সবারই মঙ্গল।

আপনার মতামত দিন