ঝাউডাঙ্গা শরণার্থী গণহত্যা : ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা

তাওসিফ সাদমান তূর্য

২০ মে খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়ায়, বটিয়াঘাটা উপজেলার বাদামতলা বাজারে, ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ব্যাপক গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া খুলনার বটিয়াঘাট, ডুমুরিয়া, যশোরের মনিরামপুর, বাগেরহাটের ফকিরহাট, রামপাল ও পিরোজপুর অঞ্চলের হাজার হাজার শরণার্থী ভারতে যাওয়ার জন্য সাতক্ষীরা ঝাউডাঙ্গা উপকণ্ঠে ভারতের কাছাকাছি এসে পৌঁছায়। ২১ মে শরণার্থীরা ঝাউডাঙ্গা বাজারের পূর্বপাশে পাথরঘাটা গ্রামের ওপর দিয়ে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়ক অতিক্রম করে ভারতের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

যশোর থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দুটো ট্রাক সাতক্ষীরা যাওয়ার পথে ঝাউডাঙ্গা বাজার অতিক্রম করে বাজারের দক্ষিণ দিকে ছোট ব্রিজের উপরে থামে। স্থানীয় রাজাকার মতিয়ার রহমান পাকিস্তানি সেনাদের ট্রাক থামান। মতিয়ার রহমান পাকিস্তানি সেনাদের বুঝায় এরা ভারতের দালাল এবং মুক্তিবাহিনীর লোক। মতিয়ার রহমানের কথা শুনে পাকিস্তানী সেনারা গোবিন্দকাঠি গ্রামের দিকে, ঝাউডাঙ্গা বাজারের আধা কি: মি: দূরে কালভার্টের উপরে গিয়ে অবস্থান নেয়।

পাকিস্তানী বাহিনীর গাড়ি দেখে শরণার্থীরা ভয়ে আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় এবং ঝাউডাঙ্গা গ্রামে পালানোর চেষ্টা করেন। বিলের মধ্যে ছোটাছুটি করা লোকজনদের পাকিস্তানী সেনারা ধরে এনে কালভার্টের ওপর একত্রিত করে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

দীপা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘খুলনা একাত্তর : আমার মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সামনে এগিয়ে যাওয়া মানুষের সারি হানাদারদের ছুটে আসতে দেখে ছত্রভঙ্গ হয়ে রাস্তা থেকে নেমে দু’পাশে বিলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ায়। ততক্ষণে রাস্তার ওপর ট্রাইপডে মেশিনগান বসানো হয়েছে।
পাকিস্তানী সেনারা বিলে নেমে যাওয়া মানুষদের ধরে ধরে রাস্তার ওপর জড়ো করছে। পাগলের মতো আমি চারদিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকি মা-বাবা আর ভাইদের। দোকানের পেছনে আড়াল খুঁজে যখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম তখন ওরা সামনে এগিয়ে গেছে। মেশিনগানের গুলির শব্দ কানে আসছে। হঠাৎ দেখি মা আর বাবা সামনে এগোতে না পেরে উন্মুক্ত বিলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে লুকোবার কোন জায়গা নেই। অনেক দূরে পাটগাছের ঝোপ দেখা যাচ্ছে। হানাদারদের থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে আমরা, ওরা আমাদের দিকে পিছন ফিরে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে একনাগাড়ে, গুলিবিদ্ধ প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ছে রাস্তার ওপর, রাস্তা থেকে বিলের মধ্যে, পিছনে মাত্র কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছি।’

পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ি ব্রিজ থেকে একটু দুরে গিয়ে রাখেন। গাড়ি চলে গেছে ভেবে গোবিন্দকাঠির রাস্তা ধরে শরণার্থীরা এগোতে থাকে। কিছুদূর গিয়ে দেখতে পান পাকিস্তানী বাহিনী মানুষদের ব্রাশফায়ার করছে। ভয় পেয়ে সবাই রাস্তার পাশে ছোট ছোট গর্তের আড়ালে শুয়ে পড়ে।

দিনের বেলা ফাঁকা বিলের মধ্যে, রাস্তার পাশে, রাস্তার উপরে, ছোট কোন গাছের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকা শরণার্থীদের হত্যা করতে পাকিস্তানী সেনাদের তেমন কোন অসুবিধা হয়নি। পাকিস্তানী সেনারা ঐদিন প্রায় তিন শতাধিক মানুষকে হত্যা করে।

তথ্য উৎস:
ঝাউডাঙ্গা গণহত্যা, গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ : সাতক্ষীরা জেলা, খুলনা একাত্তর : আমার মুক্তিযুদ্ধ।

তাওসিফ সাদমান তূর্য

লেখক : শিশু অভিনয় শিল্পী।

আপনার মতামত দিন