তারেক মাসুদের মুক্তির কথা ও কোদালিয়া গণহত্যা

মাসুদ রানা
১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের যৌথ পরিচলনায় নির্মিত ‘মুক্তির গান’। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চার বছর ধরে (১৯৯৬-১৯৯৯) ‘মুক্তির গান’ প্রদর্শনের সময় তারেক মাসুদ ও প্রদর্শনকারী দলটি দেশের বিভিন্ন স্থানের সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কাহিনী জানতে পারে। সাধারণ মানুষের সেই কাহিনী দিয়ে নির্মিত হয় ‘মুক্তির কথা’। মুক্তির কথায় তারেক মাসুদ ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের গণহত্যার কাহিনী তুলে ধরেন। ১৯৯৯ সালে ‘মুক্তির কথা’ মুক্তি পায়।
পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিবাহিনীকে দমন করার জন্য ২৯ মে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে চাঁদহাটের দিকে আনে। এই খবর কমান্ডার আব্দুর আজিজ মোল্লার কাছে আসলে তিনি গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধ প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে চলে। স্থানীয় জনগণের তথ্য অনুসারে যুদ্ধে ২৯ জন পাকিস্তানি সেনা ও একজন রাজাকার (জাফর রাজাকার) নিহত হয়।
তাকের মাসুদ তাঁর প্রামান্য চিত্র মুক্তির কথায় ২ জন অফিসার সহ ১৮ জন পাকিস্তানি সেনার নিহতের কথা উল্লেখ করেছেন। স্থানীয় জনগণের কাছে তথ্য নিয়ে জানা যায় তিনি শুধু, বিল দিঘুলিয়ার যে ১৮ জন নিহত হয়েছে তাদের সংখ্যা তুলে ধরেছেন। পার্শ¦বর্তী এলাকার নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করেন নাই।
সেই যুদ্ধে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নিহত বা আহত হয়নি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে এসে ৫ জন গ্রামবাসী শহিদ হন। এদের মধ্যে ৩ জন ছিল কোদালিয়া শহিদনগরের। বাকী ২ জন বাগাট ও নগুরদিয়ার। তারেক মাসুদ তার মুক্তির কথায় কোদালিয়া শহিদনগরের ০৩ জনের কথা উল্লেখ করেছেন, বাকী ০২জনের কথা উল্লেখ করেনি।
১ জুন সকাল আনুমানিক ৯টার সময় পার্শ্ববর্তী এলাকা ভাঙ্গা, ফরিদপুর সদর, মুকসুদপুর হতে পাকিস্তানি সেনারা এসে নগরকান্দার ৯টি গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং তাদের সৈন্যদের লাশ উদ্ধার করার জন্য ঘোড়ামাড়া বিলের কাছে প্রায় ১৫০-২০০ সৈন্য একত্র হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের আসতে দেখে নগরকান্দার আশপাশের আতঙ্কিত গ্রামবাসীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। কোদালিয়া গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুসহ প্রায় ৪০-৪৫ জন মিয়া বাড়ির পাশের জঙ্গলে (ভেলুর ভিটা) একটি ডোবার মধ্যে আত্মগোপন করার চেষ্টা করেন। কৌশলগত কারণে আব্দুল আজিজ মোল্লার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আত্মগোপন করেন। পাকিস্তানি সেনারা গ্রামবাসীর উপস্থিতি টের পেয়ে মিয়া বাড়ির জঙ্গল ঘেরাও করে সেখান হতে নারী ও ৩ বছরের নিচের শিশুকে একটি, ৪-১৫ বছরের শিশুদের একটি এবং পুরুষদের একটি মোট ৩ ভাগে ভাগ করে এবং নারীদের কোদালিয়া মসজিদ মাদ্রাসার মাঠে নিয়ে রাখে এবং পুরুষদের দিয়ে ২৯ তারিখের মৃতদেহ ও লুটরাজ মালামাল মাথায় তুলে দিয়ে নগরকান্দা থানায় পাঠিয়ে দেয়। আর কিছু লোককে মাদ্রাসার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখে।
৪-১৫ বছরের শিশুদের বিলের ওপারে একটি জায়গায় রাখে এবং তাদের বলা হয় তোমাদের মা রান্না করছে, রান্না শেষ হলে তোমাদের যার যার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সকাল ১০টা হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত তাদের বন্দি করে রাখা হয়। নারী ও শিশুদেরকে মাদ্রাসার মাঠে বসিয়ে রেখে নারীদের বলা হয়, তোমরা কোরআন-তসবি পড়। নারীদের অনেকেই বলে, আমাদের কোরআন-তসবি বাড়িতে, আমরা গিয়ে নিয়ে আসি। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা বলে, এখন আনতে হবে না, যা আছে তাই পড়। সকাল ১০টা হতে বেলা ৪টা পর্যন্ত কোন ধরণের খাবার পানি না দিয়ে তাদের মাঠে প্রখর রোদের মধ্যে বসিয়ে রাখে। শিশুরা পানি খেতে চাইলেও তাদের পানি খেতে দেয়া হয়নি।
বেলা সাড়ে তিনটার সময় হঠাৎ করে পাকিস্তানি সেনারা সবাইকে পানি খাওয়াতে থাকে। সবাইকে গোল হয়ে মাদ্রাসার মাঠের এক কোণায় বসানো হয়। তাদের কলমা পড়ানো হয়। তারপর বিকাল আনুমানিক ৪টার সময় মাথা নিচু করে বসিয়ে তিন দিক (উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব দিক) থেকে মেশিনগান সেট করে গুলি বর্ষণ করা হয়। গুলিবর্ষণ শেষে মৃতদেহগুলো মোটা কম্বল দিয়ে ঢেকে রেখে দেয়। এবং বন্দী থাকা শিশুদের ছেড়ে দিয়ে বলা হয়, তোমাদের মা মাদ্রাসার মাঠে ভাত রান্না করে রেখেছে, তোমরা যাও। শিশুরা এসে দেখে, তাদের মা এবং ছোট ভাইবোনদের পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মাঠে রেখে গেছে।
সেই গুলিতে কোদালিয়া গ্রামের নারী শিশু সহ ১৭ জন শহিদ হন। ২ জন নারী ও ৩ জন শিশু আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে যায়। কোদালিয়া গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে ৩ জন পুরুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ফরিদ মিয়ার সামনে পশ্চিম দিকে মুখ করে মাদ্রাসার মাঠে বন্দি করে রাখা পুরুষদের মধ্যে দু’জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তারেক মাসুদ তার ‘মুক্তির কথায়’ কোদালিয়া গ্রামের ১৭ জন শহিদ নারীদের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেই দিনে কোদালিয়া গ্রামের বাকি তিনজন শহিদ পুরুষদের কথা উল্লেখ করেননি।
পাকিস্তানি সেনারা কোদালিয়ায় গণহত্যা চালায়নি। ঈশ্বরদী, ছোট পাইককান্দিতেও গণহত্যা চালায়। এতে ঈশ্বরদী গ্রামে ৫ জন, ছোট পাইককান্দি গ্রামের ১০ জন সহ কোদালিয়া শহিদনগরের ৩৭ জন শহিদ হয়। কোদালিয়া শহিদনগর গণহত্যার তারিখ ও সংখ্যা নিয়ে কিছু ভিন্নমত রয়েছে। নানাসূত্র এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুসারে গণহত্যাটি ১ জুন (১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৭৬) হয়েছিল। তাছাড়া স্থানীয় জনগণও এই হত্যায় তারিখ ১ জুন বলেছেন এবং স্মৃতিফলকে ১জুন উল্লেখ আছে।
কোদালিয়া শহিদনগর গণহত্যা দীর্ঘদিন অসংরক্ষিত অবস্থায় ছিল । তারেক মাসুদের ‘মুক্তির কথা’ প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ হলে তৎকালীন চেয়ারম্যান জাকির হোসেন নিলু স্মৃতিরক্ষার জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। ১৯ এপ্রিল, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিরক্ষার জন্য ১৩টি গ্রাম নিয়ে কোদালিয়া শহিদনগর নামে একটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করেন এবং স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন। স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি ও গণকবর দুটি সংরক্ষণের জন্য একটি তহবিল গঠন করেন। ২০০২ সালে স্মৃতিস্তম্ভের কাজ শুরু হয়। ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কে. এম ওবায়দুর রহমান স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। তারপর থেকে ১ জুন কোদালিয়া শহিদনগরে গণহত্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে।
তারেক মাসুদের মুক্তির কথা দেখার পরে কোদালিয়া গণহত্যা নিয়ে আরো জানার ইচ্ছে হয়। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন স্যার ও ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সহযোগিতায় কোদালিয়া গ্রাম সহ কোদালিয়া শহিদনগর ইউনিয়নের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করি। সেই গবেষণা পত্রটি ২০১৮ সালে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট’ প্রকাশনী থেকে ‘কোদালিয়া শহিদনগর গণহত্যা’ নামে একটি নিঘন্ট গ্রন্থমালা প্রকাশিত হয়।
২০১১ সালের আজকের এই দিনে (১৩ আগস্ট) তারেক মাসুদ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করছি।
লেখক: আর্কিভিস্ট, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা।

আপনার মতামত দিন