তুমি কী পারবে, কী পারবে না—এটা আরেকজনকে নির্ধারণ করতে দিয়ো না

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ছিলেন দেশটির হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ২০১৭ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৯তম সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন তিনি। সমাবর্তন পাওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিয়েছিলেন তিনটি পরামর্শ।

হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলমন্ত্র হলো ভ্যারিটাস অ্যাট ইউটিলিটাস, অর্থাৎ ‘সত্য ও সেবা’। এ মন্ত্র ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে সব সময় প্রশ্ন করতে হবে—আমি কীভাবে সেবায় নিয়োজিত হব? কীভাবে সততার সঙ্গে নিজের সেরাটা দেব?

প্রশ্নের উত্তর হিসেবে আমার কাছে তিনটি পরামর্শ আছে।

প্রথম পরামর্শ
নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য, এগিয়ে যাওয়ার জন্য সব ধরনের মিথ্যা ও ভুল ধারণা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমি হাওয়ার্ড থেকে ছাত্রজীবনে শিখেছি, তুমি চাইলে যেকোনো কিছুই পারবে, চাইলে সবকিছুই পারবে। তুমি চাইলে ফুটবলার হয়েও সবচেয়ে বড় ডিগ্রিটা অর্জন করতে পারবে। চাইলে কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়েও হতে পারবে কবি।

আমাদের সময়ে কিন্তু আমি তৎকালীন বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেও শিক্ষানবিশি করেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ভবনে। আমি একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিক সোসাইটির হয়ে কাজ করতাম, আবার হাওয়ার্ড বিতর্ক দলেরও সদস্য ছিলাম। আমি কী পারব আর কী পারব না, এ বিষয়ে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ভুল ধারণা কখনোই আমাকে প্রভাবিত করেনি। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া বিভ্রান্তিমূলক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেই আমি এখানে এসে পৌঁছেছি।

পেশাজীবনে দেখেছি, মানুষ অপরাধের বেলায় হয় খুব কঠোর হয়ে ওঠে, অথবা নরম হয়ে যায়। কিন্তু আমি মনে করি, অপরাধ ও অপরাধীদের বেলায় নরম বা শক্ত নয়, আমাদের হতে হবে বিচক্ষণ। যেমন আইন পেশায় থাকা রক্ষণশীল অগ্রজেরা আমাকে সব সময় বলতেন, ‘আইন তৈরি করা তোমার কাজ না। তুমি শুধু আইন মেনে অপরাধীদের ধরো, আর জেলে পাঠাও।’ কিন্তু আমি এটা মেনে নিইনি। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে ‘প্রথমবার অপরাধী সাব্যস্ত’ (ফার্স্ট টাইম অফেন্ডার) ব্যক্তিদের সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তাদের জেলে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম।

বাস্তবতা হলো অনিয়মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হলে একজনকে অন্তত গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে দেখাতে হবে, অনিয়মকে বদলে দিতে হবে। কোনো একটা জায়গা থেকে এ বদল শুরু করতে হবে। আর এ জন্য তোমাদের সব জায়গায় সব সময় সজাগ থাকতে হবে। কেউ ঐতিহ্য, রীতি, নীতির দোহাই দিলে পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে থেকো না। মিথ্যা আর ভ্রান্ত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে তুমি নিজের সত্য প্রতিষ্ঠা করো। তুমি কী পারবে, কী পারবে না—এটা আরেকজনকে নির্ধারণ করতে দিয়ো না।

দ্বিতীয় পরামর্শ
সত্যকে ছড়িয়ে দাও। সত্য বলা আর সত্য ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। সত্য বলা হলো কল্পকাহিনি থেকে তথ্যটাকে আলাদা করা। যেমন: পৃথিবী গোল, আকাশ নীল ইত্যাদি। আর সত্য ছড়িয়ে দেওয়া মানে জোর গলায় বলা, সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এমনকি যখন কেউ তোমাকে জিজ্ঞাসা করেনি, যেখানে সত্য কথা বলাটা অস্বস্তিকর, সেখানেও বলো।

এখান থেকে বের হওয়ার পর জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসবে, যেখানে তোমার মতাদর্শ, তোমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে আর কারওটা মিলবে না। সে সময় হয়তো নিজেকে একা মনে হতে পারে। তোমাদের জোর গলায় বলতে পারি, তুমি যেখানেই থাকো না কেন, সত্য প্রকাশ করে এগিয়ে গেলে তুমি কখনোই একা নও।

তৃতীয় পরামর্শ
একটি গল্প দিয়ে শেষ করি। বড় পরিবর্তন আনার জন্য বড় পদবি বা ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না।

ল স্কুলে দ্বিতীয় বছর শেষ হওয়ার পর গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি অ্যালানিডা কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিসে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ নিই। সে সময় একদিন একটা বড় মাদক চোরাকারবারির মামলা আসে। তদন্ত করতে গিয়ে দেখি একজন নির্দোষ পথচারীকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হতে হতে শুক্রবার বিকেল হয়ে যায়। ওই সময়ে অনেকে অফিস থেকে বেরিয়েও গেছে। আমি বুঝতে পারছিলাম, এখন নির্দোষ ব্যক্তিকে ছাড়ানোর জন্য আমাকে পরের সপ্তাহের সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ ছুটির এই দুই দিন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কাটাতে হবে জেলে। আমি জানতে পারলাম অভিযুক্ত ব্যক্তির ছোট বাচ্চা তার জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করছে। যদিও আমি তখন মামুলি এক ইন্টার্ন, তবু একজন নির্দোষ ব্যক্তির সাজা ভোগ করার বিষয়টা মানতে পারছিলাম না। এটা উচিত নয়। তাই আমি আমার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কোর্টরুমে ঠায় বসে থাকলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম।

আমাকে আদালতের কর্মচারীরা বারবার বলছিলেন, অপেক্ষা করা বৃথা। কিন্তু আমি তাঁদের কাছে বারবার বলে যেতে থাকলাম যেন বিচারককে অনুরোধ করে ডেকে আনা হয়। বিচারক না আসা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। সবশেষে বিচারক এলেন, আর কলমের এক আঁচড়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকে মুক্ত করে দিলেন।

সেই দিনের সেই অপেক্ষা থেকে আমি উপলব্ধি করেছিলাম, সত্যকে ধারণ করে এগিয়ে গেলে কেউ তোমাকে দমাতে পারবে না। তুমি যত ক্ষুদ্রই হও না কেন, তাতে কিছু যায়–আসে না। তোমার সত্যই তোমার সঙ্গী, তোমার শক্তি। তাই বড় পরিবর্তনের জন্য বড় পদবি বা ক্ষমতার প্রয়োজন নেই। এটাই তোমার সময়। এখনই আওয়াজ তোলো।

আগামী দিনগুলোয় তুমি যা-ই করো না কেন, কোনো অ্যাপ বানাও, অথবা ব্যবসা করো, কিংবা ক্যানসার নিরাময়ে কাজ করো না কেন—এই সত্য ও সেবার নীতিকে নিজের পথপ্রদর্শক মেনে এগিয়ে যেয়ো। তুমি আইনজীবী হও, কিংবা শিক্ষক; দন্তচিকিৎসক হও, কিংবা হিসাবরক্ষক, তোমার জীবনের মূলনীতি হোক সত্য ও সেবা।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আদর রহমান

তথ্যসূত্র: হ্যারিস ডট সিনেট ডট গভ

আপনার মতামত দিন