দিরিলিস আরতুরুল : টান টান উত্তেজনার ইতিহাসনির্ভর সিরিজ

কাদের বাবু

দিরিলিস আরতুরুল বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় তুর্কি ইতিহাসনির্ভর সিরিজ। যা দেখা শুরু করলে একজন দর্শক এমনভাবে ডুবে যাবেন পরের অংশ না দেখে থাকতে পারবেন না। এমন টান টান উত্তেজনা ও পরতে পরতে কাহিনির মোড় ঘুরে যাওয়া এবং ঘটনার ঘনঘটা সত্যিই বিস্ময়কর! তুরস্কের খ্যাতিমান নাট্যকার মেহমেত বোজদাগের চিত্রনাট্যে বিখ্যাত পরিচালক মাতিন গনির পরিচালনায় অসাধারণ সব দৃশ্যপট রয়েছে সিরিজের প্রতি পর্বে। সিরিজটি দেখতে শুরু করছিলাম পহেলা জুন। মাঝখানে সব মিলিয়ে ৭ দিন বিরতি ছিল দুই দফায়। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে সিরিজগুলো দেখা শেষ করলাম। ১৫০ পর্বের সিরিজটির প্রায় প্রতি পর্বে দুই ঘণ্টা করে। ৪৫ দিনে আমাকে অ্যাভারেজ সাড়ে তিনটা করে সিরিজ দেখতে হয়েছে। বেশ কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছি। ভালো লাগাগুলো শেয়ার করছি।

একটি রাষ্ট্র গঠন করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আরতুরুল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন সবসময় কঠোর। অন্যায় করলে কিংবা ভুল করলে নিজের ভাই, ছেলের প্রতিও তার ন্যায়বিচার ছিল সবসময় কার্যকর। তার শত্রুরাও তাকে এ বিষয়ে বিশ্বাস করত।
কাহিনির শুরুতে দেখা যায় একটি যাযাবর বসতির প্রধান আরতুরুল গাজী বাবা সোলেমান শাহ। তিনি ছেলেদের ন্যায়বিচার ও সৎ হিসেবে মানুষ করেছেন। বসতির প্রধানের ছেলে বসতি দেখবে- এটাই সাধারণ ঘটনা কিন্তু আরতুরুল বসতির চেয়ে নিজেদের একটি রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করতে থাকেন। তার বাবার মৃত্যুর পর বসতির হাল ধরে বড়ভাই। বসতিগুলোর ওপর একদিকে নাইটদের অত্যাচার অন্যদিকে মঙ্গোলদের নির্যাতনে নিষ্পেষিত জাতিকে বাঁচাতে নিজেদের একটি রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য সবসময় লড়াই করে গেছেন। তার সাহসিকতা, প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতার কারণে সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ তাকে স্নেহ করতেন। মঙ্গোল এবং নাইটদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় অসহনীয় নির্যাতন ভোগ করেছেন আরতুরুল। তবে সবসময় আল্লাহর ওপর অঢেল বিশ্বাস আর ধৈর্য ধরার কারণে তিনি ছিলেন অবিচল। অসংখ্যবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। কষ্ট সহ্য করে একের পর এক নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। নতুন ভূমির খোঁজ করেছেন যেখানে নিজেদের সন্তানেরা বেড়ে উঠবে। যাযাবর হিসেবে বেঁচে থাকতে হবে না। তাই একের পর এক এগিয়ে গেছেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে। শত্রুদের মোকাবেলায় তিনি ছিলেনতিনি অকুতোভয় ও সাহসী। শত্রুকে সহজেই হামলা করতেন না। তবে শত্রুরা তার ওপর হামলা করলে তিনি জবাব দিতেন কঠোর হাতে।

ইবনে আরাবি দিরিলিস আরতুরুলের একটি অনন্য চরিত্র। তিনি ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। তার কাছে কথা শুনেই অনেকে মুসলমান হয়ে গিয়েছেন। তেমনিভাবে আরতুরুলের ন্যায়বিচার দেখে অনেক খ্রিষ্টান, অত্যাচারী নিজে থেকেই ইসলামের পথে এসেছেন।
বিশ্বাসঘাতক সব জায়গায় লুকিয়ে থাকে, তাকে শেষ করতে না পারলে রাষ্ট্র কেন নিজের ঘরও পরিচালনা করা যায় না। তাই বিশ্বাসঘাতক কাউকে কোনো সুযোগ দেয়া যাবে না। এই সিরিজের অন্যতম শিক্ষা। এছাড়া আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে, কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরলে তিনি মানুষকে পুরস্কৃত করেন।

যেকোনো ব্যক্তি একাই সব সামলাতে পারেন না। আরতুরুলের উত্থান সিরিজ দেখে এটা স্পষ্ট, আরতুরুলের সঙ্গে তার মা হাইমে খাতুন, স্ত্রী হালিমা খাতুন, সন্তান গুন্দুজ, সাভচী, উসমান, সবসময়ের সঙ্গী যোদ্ধা আর্তুক বে, তুরগুত, বামসি, দোগান, আবদুর রহমান, দুমরুল এবং ইবনে আরাবির মতো পরামর্শক থাকাটা কত জরুরি। নিজের বসতিতেই যেখানে শত্রু থাকে কুরতুগলু। তার মতো আরও অনেক রাষ্ট্রের শত্রুকে মোকাবেলা করা, আমির সাদউদ্দিন কোপেকের মতো বিশ্বাসঘাতকে নির্মূল করা কত কঠিন তা না দেখলে সত্যিই বোঝা যায় না।
পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন সন্তানের প্রতি যত্নশীল। স্বামী হিসেবে বউয়ের প্রতি ছিলেন প্রেমাবেগী। ছেলে হিসেবে ছিল তার মায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। ভাই ও বন্ধু হিসেবে দায়িত্বপরায়ণ। যে কারণে আজ বিশ্ববাসী তাকে মনে রেখেছে, তা হলো যোদ্ধা হিসেবে তিনি অকুতোভয় ও সাহসী। এই সাহসের পেছনে ছিল আল্লাহর ওপর বিশ্বাস।

প্রতি পর্বের পরতে পরতে সাসপেন্স। কাহিনি কোন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে বোঝা যায় না। ফলে পরের পর্বগুলো দেখার জন্য উন্মুখ থাকে মন।
তুরস্কের সরকার এটি নির্মাণে সহায়তা করেছে। ইতিহাসভিত্তিক এই সিরিজটি পরিবারের সবাই একসঙ্গে দেখার মতো।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও প্রকাশক।

আপনার মতামত দিন