দেখে আসুন ঠাকুরগাঁওয়ের ২২৪ বছর বয়সী আমগাছ

আব‍ু তারেক বাঁধন, ঠাকুরগাঁও :

দূর থেকে দেখলে মনে হবে বিশাল আকৃতির বটগাছ। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি আসলে বটগাছ নয়, আমগাছ। প্রায় তিন একর জমিতে ডালপালা ছড়িয়ে ২২৪ বছরের বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ সূর্যপুরী জাতের এ আমগাছটি। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আমজানখোর ইউনিয়নের হরিণমারী এলাকায় অবস্থিত এ আমগাছটি। গাছটি এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা পেশার মানুষ। আসছেন বিদেশিরাও।

গাছটির বয়স সম্পর্কে সঠিক ধারণা কারো নেই বলে জানালেন পৈত্রিকসূত্রে মালিকানা পাওয়া গাছটির বর্তমান মালিক দুই ভাই সাইদুর রহমান ও নুর ইসলাম। তারা জানান, পূর্বপুরুষদের কথা অনুযায়ী গাছটির বয়স ২২৪ বছরের বেশি।

মালিকানা পাওয়ার পর গাছটির পরিচর্যা করছেন তারা। আর্থিক সংকটের কারণে টিনের বেড়া দিয়ে গাছের চারপাশে সীমানা দিয়েছেন তারা। গাছটিকে নিয়ে বৃহৎ পরিকল্পনা থাকলেও অর্থাভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দ্রুত গাছটি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য পিকনিক স্পট গড়ে তোলা সম্ভব।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ছুটির দিনগুলোতে গাছটির নিচে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। গাছটি দেখতে দর্শনার্থীদের ১০ টাকা মূল্যের টিকেট কেটে প্রবেশ করতে হচ্ছে। টিকেটের মূল্য থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে গাছটিকে পরিচর্যা এবং দুই ভাইয়ের পরিবার চলছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রশাসন এবং গাছটি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য গাছটির পাশে একটি পর্যটন কেন্দ্র অথবা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার  আশ্বাস দিয়েছেন। এ নিয়ে কয়েকটি মতবিনিময় সভাও করেছেন আমগাছ চত্বরে।

জানা গেছে, স্থানীয় আম ব্যবসায়ী সোলেমান আলীর কাছে গাছের আমগুলো ২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ এই ৩ বছরের জন্য দুই ভাই বিক্রি করেছেন।

আম ক্রয়কারী সোলেমান আলী জানান, ‘দেড় লাখ টাকায় তিন বছরের জন্য গাছটি লিজ নিয়েছি। ফলন মৌসুমে গাছটি আমাকে দেখাশোনা করতে হয়। গাছে আমের ফলন বাম্পার হয়। বিভিন্ন ঝড়ে আম বিপুল পরিমাণ ঝরে গেলেও প্রায় ৮০ মণের বেশি আম পাওয়া যায়। এ গাছের আমের মূল্য বাজারের অন্য আমের চেয়ে দ্বিগুণ।

গাছ মালিক নূর ইসলাম বলেন, ‘সূর্যপুরী জাতের এই গাছটির আম খুবই সুস্বাদু ও মিষ্টি। এর আগে প্রতি মৌসুমে ১০০ মণের বেশি আম পাওয়া গেলেও গত মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ মণ আম পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষ অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে আমের জন্য।’

দিনাজপুর থেকে গাছটিকে দেখতে আসা কলেজ ছাত্র সামিউল আলম বলেন, ঢাকায় লেখাপড়া করতে গিয়ে বাড়ি থেকে এক জেলার পার্শ্বেই এশিয়ার সর্ববৃহৎ আমগাছটি দেখার সুযোগ হয়নি এর আগে। মাতৃভাষা দিবসে কলেজ ছুটি। তাই এ সুযোগে দেখতে এসেছি কয়েকজন বন্ধুরা মিলে।

নীলফামারী থেকে আসা স্কুল শিক্ষক মমতাজ উদ্দীন জানান, ইউটিউবে আমগাছটির ভিডিও দেখেই বড় ছেলে আশিকুর রহমানের গাছটিকে সরাসরি দেখার আগ্রহ অনেক দিনের। ফেব্রুয়ারির ছুটিতে তাই সপরিবারের মাইক্রোবাস ভাড়া করে এসেছি গাছটিকে দেখতে। শিক্ষকের ছেলে আশিকুর রহমান জানায়, ইউটিউবের ভিডিওর চেয়ে সরাসরি গাছটি দেখে খুব ভাল লাগছে। গাছটির ছবি তুলেছি। বন্ধুদের গিয়ে দেখাব।

স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. আকালু বলেন, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসার দর্শনার্থীদের জন্য থাকা, খাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে পারলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এমনিতে সরকারী কর্মকর্তারা আসলে গাছটির নিচে আলোচনা সভা এবং বসে বিশ্রাম নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে গাছটির রক্ষণাবেক্ষণসহ চারপাশে বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে জায়গাটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা তৈরি করে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করেছেন। আমরা আশা করছি খুব শীঘ্রই এটি বাস্তবায়ন হবে।

উল্লেখ্য, আমগাছটি ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী পরিদর্শন করেছেন এবং পরিদর্শনের সময় গাছটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন।

যেভাবে আসবেন আমগাছটি দেখতে : ঢাকা থেকে সড়ক পথে বাসযোগে সরাসরি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় খুব সহজেই পৌঁছানো যায়। সড়কপথে ঢাকা থেকে বালিয়াডাঙ্গীর দূরত্ব প্রায় ৪৫০ কি.মি। বিমানপথে সৈয়দপুরে পৌঁছে সড়কপথে এবং রেলযোগে সৈয়দপুর অথবা দিনাজপুর পৌঁছে সড়কপথে বালিয়াডাঙ্গী নির্বিঘ্নে পৌছানো যায়। ঢাকা থেকে সরাসরি এশিয়ান হাইওয়ে বালিয়াডাঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় অধিকাংশ মূল সড়ক পাকা হলেও আনাচে কানাচে কাঁচা সড়ক। বেলে মাটি হওয়ায় বর্ষার মৌসুমেও কাঁচা সড়ক চলাচলের উপযোগী থাকে। বালিয়াডাংগী হয়ে ডাংগী বাজার দিয়ে/লাহিড়ী বাজার দিয়ে/চৌরাস্তা দিয়ে ভ্যান, বাস, মিশুক দিয়ে গিয়ে  ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সূর্যপুরী আমগাছ পরিদর্শন করা যাবে।

আপনার মতামত দিন