ধারাবাহিক কিশোর থ্রিলার : অপারেশন দস্যুবাড়ি (৪)

ইকবাল খন্দকার

।। চার।।

দিদারদের বাসা মাঠের খুব কাছে। তাই সে তামিমের আগেই বাসায় পৌঁছে যায়। তামিমের বাসায় পৌঁছতে আরেকটু দেরি হয় দোকান থেকে টুথপেস্ট কিনতে গিয়ে। গতকালই তার পেস্ট ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু কেনার সময় পায়নি। আজ সকালে অনেক চাপাচাপি করে একটু পেস্ট বের করেছিল। এখন পেস্ট নিয়ে না গেলে কাল আর দাঁত ব্রাশ করা হবে না। তামিম টুথপেস্ট নিয়ে বাড়ির গেটের কাছে এসে দেখে মাঠের সেই ছেলেটা ভেতরে ঢুকছে। কিন্তু ছিটওয়ালা কাউকে তো সে বাড়িতে ঢুকতে দিতে পারে না। এই ছেলে ভেতরে ঢুকে যদি কোন অঘটন ঘটিয়ে বসে! যে ছেলে মাঠ কর্তৃপক্ষকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করতে পারে, সে তো কারো কথা শুনবে না। কাউকে মানবে না। কিন্তু এলাকায় এতো বাড়ি থাকতে পাগলটা তাদের বাড়িতে এলো কেন!

-এই ছেলে দাঁড়াও।
-আমি তো দাঁড়িয়েই আছি। আমি বসেও নেই, শুয়েও নেই।
-এই ছেলে, পাকা পাকা কথা বলবে না বলে দিচ্ছি।
-আম কাঁঠাল পাকা না হলে খাও না। অথচ কথা পাকা হলেই যত সমস্যা। এখন বলো দাঁড়াতে বলছো কেন।
-কেন দাঁড়াতে বলছি বোঝো না? তুমি আমাদের বাড়িতে ঢুকছো কেন?
-আমি কারো বাড়িতে ঢুকছি না। আমি ঢুকছি আমাদের বাড়িতে।
-এই ছেলে, মাথার নাট-বল্টু সব ঢিলে হয়ে গেছে? কোন বেআক্কেল বলেছে এটা তোমাদের বাসা? লেখা-পড়া কিছু জানো? নাকি গণ্ডমূর্খ? গণ্ডমূর্খ না হলে পড়ে দেখতে পারো গেটে কী লেখা আছে। লেখা আছে ‘তামিম ভিলা’। আর এই তামিমটা হচ্ছি আমি। এটা যদি তোমাদের বাড়ি হয় তাহলে তোমার নাম লেখা নেই কেন? আর একটা কথাও না বলে এখান থেকে চলে যাও। নইলে বাবাকে ডেকে এমন দাবড়ানি দেবো না!
-এমনভাবে বলছো যেন বাবা শুধু তোমার একারই আছে। তুমি তোমার বাবাকে ডাকলে আমিও আমার বাবাকে ডাকবো।
-উফ! কোত্থেকে যে পাগল ছাগল এসে জোটে!
-আমাকে পাগল বলছো? কিন্তু তুমি কি জানো তুমি আস্ত একটা বোকা?
-এই ফাজিল ছেলে, মুখ সামলে কথা বলবে। নইলে মুখ বাঁকা বানিয়ে ফেলবো। এই বেয়াদব, তুমি আমাকে বোকা বলছো কোন সাহসে?
-তুমি তো বোকাই। নইলে তুমি কেন বুঝতে পারছো না আমি তোমাদের ভাড়াটিয়া হতে পারি।

তামিম এবার লজ্জায় পড়ে যায়। ঠিকই তো! ছেলেটা তাদের ভাড়াটিয়া সাদিক আংকেলের ছেলে হতে পারে- কেন তার মাথায় আসেনি? তাহলে তো এতো কথা বলতে হতো না। ছেলেটা তামিমের কাছে এসে হাত বাড়ায়- আমার নাম আদনান। বাবার নাম তো জানোই, তাই বললাম না। তুমি যে স্কুলে পড়ো, আমিও সে স্কুলেই পড়ি। ক্লাসও একই। তামিম অবাক হয়- একই ক্লাস! কই, তোমাকে তো একদিনও দেখিনি! আদনান হাসে- এই তো আবার বোকার মত কথা বললে। আমরা তোমাদের বাসায় যে কদিন ধরে উঠেছি, তুমি তো সে কদিন বাড়িতেই ছিলে না। স্কুলেও যাওনি। তাই তুমি আমাকে বাড়িতে বা স্কুলে কোথাও দেখোনি।
– আমি কিন্তু গতকাল বাড়ি ফিরেছি। গতকাল স্কুলে না গেলেও আজ গিয়েছিলাম। তোমাকে দেখলাম না তো!
– ক্লাসে শ দেড়েক ছাত্র। আমাকে তুমি না-ই দেখতে পারো। তবে আমি তোমাকে দেখেছি। কিন্তু তুমি যে বাড়িওয়ালা আংকেলের ছেলে, বুঝতে পারিনি।
– তুমি তো তাহলে এখানে আসার পর থেকেই মাঠে খেলতে যাচ্ছো। এতোদিনেও মাঠের নিয়ম কানুন শিখতে পারোনি? আজ আমি আর দিদার না থাকলে তোমার কী বিপদ হতো চিন্তা করে দেখেছো?
– না, দেখিনি। আর তুমি যে বললে নিয়ম কানুনের কথা, নিয়ম কানুন আমি প্রথমদিন মাঠে গিয়েই জেনেছি। কিন্তু খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। সন্ধ্যার আগে মাঠ ছাড়ার নিয়মটা আমাদের জন্যেই ভালো। কারণ মাগরিবের নামায পড়ে পড়তে বসা উচিত। এই নিয়মটা মানা যেতে পারে। আমি মেনেছিও। তবে কোন সমস্যা হলেও আমাকে সন্ধ্যার আগেই মাঠ ছাড়তে হবে, এটা আমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। কেন, দেশে কি জরুরী আইন চলছে যে, না মানলে জেল-জরিমানা হবে?

-জরুরী আইনের চেয়েও বেশি। তুমি তো আসল ব্যাপার জানো না তাই এতো কথা বলছো। যদি জানতে তাহলে মুখ দিয়ে কোন কথা বের হতো না। একদম বোবা হয়ে যেতে।
-বোবা হয়ে গেলে বোবার চিকিৎসাও আছে। আমার এক খালু গাছগাছড়া দিয়ে খুব উপকারি একটা ওষুধ বানায়। এক ডোজ খেলে বোবারা কথা না বলে পারে না।
-তুমি কিন্তু আবার মশকরা করছো। এটা মশকরা করার বিষয় না। সিরিয়াস হও।
-সিরিয়াস হতে হলে কী কী যোগ্যতা লাগবে?
-ধুত্তরি!

আদনানের উপর চরম বিরক্ত হয়ে বাসার ভেতর চলে যেতে থাকে তামিম। তার গতি দেখে আদনান বুঝতে পারে শত ডাকলেও সে পেছনে ফিরে তাকাবে না। বেশি ডাকাডাকি করলে রেগে গিয়ে গালাগালও করতে পারে। সে যাচ্ছে, যাক। গিয়ে রেস্ট নিক। মাঠ থেকে ফেরার পর এমনিতেই টায়ার্ড লাগে। তার নিজেরও লাগছে। রেস্ট নিয়ে অন্যসময় কথা বলা যাবে। একই বাড়িতে থাকবে, একই রুমে বসে ক্লাস করবে, একই মাঠে খেলবে- কথা তো মিনিটে মিনিটে বলতে পারবে। সে যা আড্ডাবাজ! তামিম যদি তার মতো হয়, তাহলে আড্ডায় আড্ডায়ই দিন চলে যাবে। লেখাপড়া আর হবে না। পরীক্ষার খাতায় গোল্লা পেতে হবে। যে গোল্লাকে ঘোড়ার ডিম নামে অভিহিত করা হয়। কেউ কেউ ঘোড়ার আণ্ডাও বলে থাকে।

খেলার মাঠ থেকে ফিরে গোসল না করে পড়তে বসতে পারে না আদনান। গরমে তার অস্থির লাগে। শীতকালেও গোসল করেই পড়ার টেবিলে যায়। তবে শৈত্যপ্রবাহের কারণে যদি মাঠ থেকে ফেরার পথেই গা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, তাহলে আর গোসল করে বরফ হতে চায় না। হাত-পা ধুয়ে এসে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে পড়ে। প্রতিদিনের মতো আজও আদনান গোসল করার জন্যে বাথরুমে ঢোকে। আর বাথরুমে ঢোকামাত্রই তার মধ্যে পরিবর্তন চলে আসে। খেলার মাঠে যে আদনান খেলোয়াড় পরিচয়ে পরিচিত থাকে, বাথরুমে ঢুকে সে হয়ে যায় শিল্পী। সংগীত শিল্পী। কল ছাড়া এবং গলা ছাড়া- দুটো ছাড়ার কাজই সে একসঙ্গে করে। কল হয়তো একটু পরপর বন্ধ হয়। কিন্তু গলা বন্ধ হয় না। এক গানের পর এক গান চলতেই থাকে।

আজ আদনান বাথরুমে ঢুকে অন্যদিনের মতো শিল্পী বনে যায় না। তার মন খারাপ না, সে গান গাইতে ভুলেও যায়নি। তবে তার মনে তামিমের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। তামিম বলেছে মাঠের আইন নাকি জরুরী আইনের চেয়েও বেশি। মাঠের আসল ব্যাপার জানলে নাকি সে বোবা হয়ে যেত। আসল ব্যাপারটা তাহলে কী? কোনো এলাকায় গেলে সে এলাকার সবকিছু ভালোভাবে জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। তার জেনে নেওয়া উচিত ছিল। অথচ সে জানেনি, জানার চেষ্টাও করেনি। কালই তামিমকে জিজ্ঞেস করে সবকিছু জেনে নিতে হবে। আজ রাতে ঘুমুনোর আগে বারান্দায় গেলে যদি তামিমকে পেয়ে যায়, তাহলে তখনও জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। কী হতে পারে ‘আসল ব্যাপারটা।’ ভৌতিক কোন ব্যাপার নাতো?
(চলবে…)
প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- ধারাবাহিক কিশোর থ্রিলার : অপারেশন দস্যুবাড়ি (১)
দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- ধারাবাহিক কিশোর থ্রিলার : অপারেশন দস্যুবাড়ি (২)
তৃতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- ধারাবাহিক কিশোর থ্রিলার : অপারেশন দস্যুবাড়ি (৩)