ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব- ৩)

লাল ডায়রি
পল্লব শাহরিয়ার

তিন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর কিছুটা বিশ্রাম করে সবাই মিলে প্রফেসরের ল্যাবরেটরি দেখতে যাওয়া হলো। ল্যাবরেটরিতে ঢুকবার মুখে বিরাট লোহার গ্রিলের দরজা। দরজায় তালা দেওয়া। বাইরে দু’জন রক্ষী। প্রফেসরের নির্দেশে একজন রক্ষী চাবি দিয়ে দরজা খুলে দিল। ওরা ভেতরে ঢুকে গেলে আবার দরজায় তালা পড়ল।
একতলার করিডোর দিয়ে খানিকটা এগোতেই একটা লিফট। লিফটের উল্টোদিকে বিরাট হলঘর। দরজার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে, বিশাল আকারের সব যন্ত্রপাতি। যন্ত্রপাতিগুলি বোধহয় এখন বন্ধ। কোনো রকম আওয়াজ হচ্ছে না। বোতাম টিপতেই লিফটের দরজা খুলে গেল। ওরা তিনজনে লিফটে ঢুকল। অটোম্যাটিক লিফট। বোতাম টিপতেই লিফট চলতে শুরু করল। প্রফেসর বোধ হয় ভুল করে দু’নম্বর সুইচ টিপেছিলেন। তাই তিন তলায় উঠে লিফট থেমে গেল। লিফটের দরজা খুলে গেলে লোপা দেখতে পেল একটা বিরাট হলঘর। সেখানে বিরাট বিরাট কাঠের বাক্স। বাক্সের গায়ে বিভিন্ন দেশের নাম লেখা।
লোপা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এই কাঠের বাক্সগুলি কী?
প্রফেসর গম্ভীর মুখে বললেন, “আমার এই ল্যাবরেটরির গবেষণায় নানা যন্ত্রপাতি লাগে। সেগুলো আনতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। তারই খালি বাক্সগুলি পড়ে আছে এখানে। এগুলি নিয়ে তোমার মাথা ঘামাবার কিছু নেই। চারতলায় লিফট থেকে বেরোলেই একটা লম্বা করিডোর। করিডোরের পাশে পরপর বেশ কয়েকটা ঘর। ঘরগুলির দরজা কোনোটা বন্ধ, কোনোটা আধখোলা, আবার কোনোটা পুরোপুরি খোলা। ঘরগুলির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়, সব কটা ঘরেই নানারকম যন্ত্রপাতি রয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে একটা ঘরের সামনে ওরা দাড়াল। দরজাটা বন্ধ। হাত দিয়ে ঠেলতেই অবশ্য খুলে গেল। প্রফেসর বললেন, এটা তোমার কাজ করবার ঘর, লোপা। পাশের ঘরটা মারুফের। তোমার কাজে প্রথম দিকে ওই তোমাকে সাহায্য করবে। ‘ঘরটা মাঝারি সাইজের, ষোল ফুট বাই ষোল ফুট। ঘরটার মধ্যে নানারকম যন্ত্রপাতি। লোপা চিনতে পারল, একটা ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ। ও ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে কাজ করত, হুবহু সেই একই মডেল। কাজ করতে ওর কোনো অসুবিধে হবে না। এছাড়া এই ঘরের ছাদের কাছে অনেকটা জায়গা ফাঁকা। সেখানে একটা বড় প্রিজম্ বসানো। সূর্যের আলো ঘরের ভেতরে ঢোকাবার জন্য এই ব্যবস্থা। একটা ছোট কমপিউটারও রয়েছে ঘরে।
প্রফেসর লোপার দিকে চেয়ে বললেন, এটা হলো ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ। এখানে নানা ধরনের ইউরেনিয়াম স্যাম্পেল আছে। আপাতত সেগুলিকে খুব ভালো করে পরীক্ষা করতে হবে। এই স্যাপেলগুলি দেখা হয়ে গেলে তোমাকে আরো স্যাম্পেল দেবে স্বপ্নদীপ।
ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ রেখে তন্ময়ভাবে লোপা বলল, “ঠিক এই রকম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপেই আমি কাজ করতাম। এখানে কাজ করতে আমার কোন অসুবিধে হবে না।’
মারুফ এগিয়ে গিয়ে কমপিউটার চালু করে কয়েকটা সুইচ টিপল। সঙ্গে সঙ্গে টিভি স্ক্রিনের পর্দায় লেখা ফুটে উঠল, “ওয়েলকাম টু ইয়োর রিসার্চ রুম মিস লোপা। ঐ লেখা পড়ে লোপা খুব হাসল, ‘বা, মারুফ, তোমার কমপিউটার তো খুব ভদ্র। শিষ্টাচার জানে ভালোই।’
মারুফ বলল, “শুধু কমপিউটার নয়, এই গবেষণাগারের সবাই শিষ্টাচার জানে ভালোই। তোমার কি সন্দেহ আছে?

পাশের ঘরটা মারুফের। ঐ ঘরে একটা বিরাট কমপিউটার। সেই কম্পিউটারের কাজ বোঝাতে বোঝাতে বলল মারুফ, ‘এই কমপিউটারের কাজ যে কোনো ইউরেনিয়াম স্যাম্পেলের রাসায়নিক উপাদান সঠিক ভাবে বলা। স্যাম্পেলের মধ্যে যে কোনো মৌলিক পদার্থ, তা সে যতই কম থাকুক না কেন, এই কম্পিউটার তা সঠিকভাবে বলে দেবে।
খুশি খুশি গলায় লোপা বলল, “বাঃ দারুণ তো। প্রফেসর, আপনার এখানকার সব যন্ত্রপাতি খুবই আধুনিক। কিন্তু একটা ব্যাপার আপনার এখানে সিকিউরিটি দেখছি, খুবই কড়া। আমাদের কি প্রতিদিন এভাবেই গবেষণাগারে ঢুকতে হবে?
ক্ষণিকের জন্য মুখ কঠিন হয়ে উঠলেও প্রফেসর পর মুহূর্তেই মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললেন, “না না, এতে তোমার কোনো অসুবিধে হবে না। গেটের রক্ষীই তোমাদের দরজা খুলে দেবে প্রয়োজন মতো। তবে আমরা যে ধরনের গবেষণায় লিপ্ত আছি, তার জন্য বোধহয় কিছুটা গোপনীয়তা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফল আজেবাজে লোকের হাতে পড়লে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। ঠিক আছে, আজ আর নয়। এবার গিয়ে বিশ্রাম নাও। রাতে তোমার অনারে একটা ডিনার পার্টির আয়োজন হয়েছে। শহরের কয়েকজন গণ্যমান্য মানুষকে সেখানে দাওয়াত করেছি।’
ওরা তিনজন লিফটে চেপে নিচে নেমে এলো। মেইন গেটে তালা লাগানো। রক্ষীদের একজন তালা খুলে দিলে ওরা তিনজনে বাইরে বেরিয়ে এলো।
লোপা মনে মনে ভাবল, প্রফেসরকে যতটা সিধেসাধা মনে করেছিলাম, দেখছি উনি মোটেই তা নন। খুবই হুশিয়ার মানুষ।
বাইরে লনে বেরিয়ে একটা স্কুটারে চেপে বসল মারুফ। লোপা জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার কোথায় যাচ্ছ?
‘একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসছি। আবার সন্ধে নাগাদ ফিরে আসছি।
সে কি, তুমি এখানে থাক না?’ ‘না, আমার বাড়ি নিকেতনে।
লোপা মনে মনে হিসেব করল, তার মানে এই বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে প্রফেসর নিজে, সেলিম ও আরো একজন ড্রাইভার, দু তিন জন রক্ষী ও বাবুর্চি। এই নিয়েই প্রফেসর আজিজের সংসার। আজ থেকে সেই সংসারে যুক্ত হলো আরেকটি নাম লোপা। অবশ্য লোপা নিজে কত দিন এখানে থাকবে তা নিজেই জানে না। তবে নিজের কাজ শেষ করতে যতদিন লাগে, তার চেয়ে একদিনও বেশি নয়।
রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নানারকম কথা চিন্তা করছিল লোপা। আজ সন্ধেবেলার পার্টিটা খুব জাকজমকের হলেও তেমন ভালো লাগেনি ওর। কেবল মারুফ ছাড়া শুধুই বুড়ো মানুষের ভিড়। দুতিন জন মহিলাও এসেছিলেন অবশ্য। কিন্তু ওদের সঙ্গে তেমন আর জমল না। বয়স ছাড়াও চিন্তার তফাত খুবই বেশি। ফলে দায়সারা গোছের কিছু হালকা আলাপ হলো। তাছাড়া সকলেরই একটা প্রশ্ন, আমেরিকার মতো সুদ্ধ দেশ থেকে এত দূরের দেশ বাংলাদেশে ওর মতো আধুনিক মেয়ে কাজ করতে এলো কেন : এই কিন্তু প্রশ্নের উত্তর ও কাকেই বা দেবে?
যে উদ্দেশ্য নিয়ে লোপা এদেশে এসেছে, তা’ও কাউকেই বলবে না, বলতে পারবে না। জানে না, ওর সেই উদ্দেশ্য সফল হবে কিনা। এ কাজে যে ওকে সাহায্য করতে পারে মনে হয়, সে হলো মারুফ। তবু মারুফকে বুঝতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে।
(চলবে…)
পড়ুন- ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব- ২)

আপনার মতামত দিন