ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব- ৪)

লাল ডায়রি
পল্লব শাহরিয়ার

তিন
(পূর্ব প্রকাশের পর)

দিন পনেরো পরের কথা। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। কিন্তু ঘুম আসছে না। ঘুম না আসায় দরজা খুলে বাইরের টানা বারান্দায় এলো লোপা । এই বাড়িটার দোতলায় তিনটে ঘর। তার মধ্যে দুপ্রান্তের দুটো ঘরে আছে প্রফেসর আজিজ ও লোপা। মাঝখানে বিরাট ড্রয়িং রুম। নিচে ড্রাইভার, দারোয়ান, বার্বুচি, রক্ষীরা থাকে। সকলের ঘরের আলোই নেভানো। কেবল বাগানের মেইন গেটে আলো জ্বলছে। গেটের কাছে প্রতিদিনের মতো টুল নিয়ে বসে আছে দারোয়ান।
প্রফেসর আজিজ এখানে পাহারা দেওয়ার ব্যাপারে এত কড়াকড়ি কেন? আজিজ কি কাউকে ভয় পায়? তবে কি বাবা যা বলেছেন তাই সত্যি।
এই পনেরো দিনেও প্রফেসরকে ঠিক বুঝতে পারল না লোপা। কখনো মনে হয় ওর মতে ভালো মানুষ হয় না। আবার কখনো বা মনে হয়, এরকম নিষ্ঠুর মানুষ লোপা আগে কখনো দেখেনি। কোন চেহারাটা সত্যি!
লেকের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। অল্প শীত করছে। ঘর থেকে চাদরটা নেবার জন্য আবার ঘরে ঢুকল লোপা। এমন সময় হঠাৎ ট্রাকের আওয়াজ। জানালার ফাক দিয়ে লোপার চোখে পড়ল, ট্রাকটা এসে থামল এই বাড়ির সামনে। দারোয়ান উঠে গিয়ে গেটের দরজা খুলে দিল। তারপর ট্রাকটা একেবারে ভিতরে ঢুকে চলে গেল গবেষণাগারের সামনে। ট্রাক থেকে ঝটপট নেমে এলো তিন চার জন লোক। দারোয়ান দরজার তালা খুলে দিলে ভেতরে ঢুকে গেল ওরা। ঘরের অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে লোপা। লোকগুলো ভেতর থেকে কতগুলি বড় বড় কাঠের বাক্স নামিয়ে নিয়ে এলো এক এক করে। লোপা অবাক হয়ে দেখল, এগুলো সেই বাক্স যা ও প্রথমদিন দেখেছিল। এই বাক্সগুলির মধ্যে কী আছে? কোথায় যাচ্ছে এইসব বাক্স? এত রাতেই বা নিয়ে যাচ্ছে কেন? তবে কি এর মধ্যে আছে কোনো নিষিদ্ধ জিনিস?
লোপা হঠাৎ দেখতে পেল, প্রফেসর আজিজ নিজে ট্রাকের সামনে দাড়িয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলছেন। অবাক কান্ড। এত রাতে কী কথা। কোনো গোপন লেনদেনের কথা নাকি? এসব জানতে লোপার খুব ইচ্ছে করছে। এতদিন যে সন্দেহ লোপার মনে ছিল, তাই বোধহয় সত্যি। কিন্তু আসল কথা জানবার উপায় কি? ইচ্ছে থাকলেও আর বারান্দায় বেরোনোর সাহস হলো না। এই বাড়িতে এই প্রথম সত্যি সত্যিই ভয় পেল লোপা। বিছানায় শুয়ে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল এক সময়।
পরের দিন ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল লোপার। দেখল, জানলা দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে ওর বিছানায়। বেগেনভেলিয়ার গোলাপী ফুলশুদ্ধ একটা ডাল ওর ঘরের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়েছে ভেতরে। দুটো চড়ুই পাখিও বাইরে থেকে উড়ে এসে বারবার ঢুকে পড়েছে ওর ঘরের ভেতরে।
কাল রাত্তিরে ওর ঘুমটা ভালো হয়নি। তাই শরীরটা এখনো ক্লান্ত। কিন্তু ভোরের আলো, ফুল ও পাখি দেখে ওর ক্লান্তি হঠাৎ কোথায় উবে গেল।
দরজার কলিং বেলটা বাজছে। বোধ হয় প্রফেসর আজিজ কিংবা ওর কোনো লোক। একটু বেজার মুখে দরজা খুলেই দেখল, মারুফ দাড়িয়ে।
একি তুমি! এখনো তো দশটা বাজেনি। ল্যাবরেটরির কাজ শুরু হতে তো অনেক সময় বাকি
হ্যাঁ। ল্যাবরেটরির কাজে এখন আসি নি। আমি এসেছি তোমাকে দাওয়াত করতে। আজ রাতে আমার বাড়িতে তোমার দাওয়াত! আমার বাবা, মা আর ছোট বোন বিশেষ করে বলে দিয়েছে। আজ রাতে অন্য কোনো প্রোগ্রাম আর রেখো না।
কোনো আপত্তি নেই তো
না না, আপত্তি থাকবে কেন। এতদিন পরে একটি বাংলাদেশী পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হতে পারছি, এ সুযোগ ছাড়ব কেন?
ঠিক আছে, এখন চলি তাহলে। কাল রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো ?
লোপা ভাবল, কাল রাতের ঘটনাটা খুলে বলে। কিন্তু এখানে এ বাড়িতে কে কোথায় ঘাপটি মেরে রয়েছে কে জানে। আজ রাতে মারুফের বাড়িতে সময় পাওয়া যাবে। তখন বললেই চলবে।
তাই লোপা হালকাভাবে ঘাড় নাড়ে, ‘হ্যাঁ ভালোই ঘুম হয়েছে।
মারুফ চলে গেলে বাবুর্চি ঘরে ঢুকল, মেমসাব, সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরি হয়ে গেছে। প্রফেসর সাহেব আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
লোপা গম্ভীর মুখে বলল, “আমার আজ একটু দেরি হবে। প্রফেসরকে ব্রেকফাস্ট খেয়ে নিতে বললো। বার্বুচি চলে যাওয়ার তিন-চার মিনিটের মধ্যে প্রফেসর এসে দাঁড়ালেন লোপার ঘরের সামনে। ‘ঢুকতে পারি?’
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল লোপা, বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই
‘এই যে লোপা। রাতে তোমার ভালো ঘুম হয়েছে। কোনো অসুবিধে হয় নি তো!’
‘না না, কোনো অসুবিধে হয় নি। তাছাড়া আপনারা আমার ওপর এত নজর রেখেছেন।’
‘বুঝলে লোপা , আজ আমি দিন দুয়েকের জন্য বম্বে যাচ্ছি। হঠাৎ যেতে হচ্ছে। আমি সব বলে যাচ্ছি। তোমার গাড়ির দরকার হলে সেলিমকে বলো। কোনো অসুবিধে হবে না। নিচে চলো, ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে আরো কিছু আলোচনা করা যাবে।

নিচে ডাইনিং হলে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে প্রফেসর আজিজ ল্যবরেটরির কাজকর্ম সম্বন্ধে কিছু জরুরি কথা বললেন। লোপা সংকুচিত গলায় বলল, আমার বাবাকে একবার ট্রাংকল করতে হবে। সেটা করতে পারব কি!
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। তুমি তো জানোই, তোমার পাশের ঘরের টেলিফোন থেকেই এসটিডি করতে পারো। নয়তো ট্রাংকলও বুক করতে পারে। শুধু পাশে রাখা খাতায় ট্রাংকলের কথাটা লিখে রেখো। বুঝতে পারছি, আমেরিকা থেকে এসে তোমার মন উতলা হয়ে উঠেছে। তা একটু উতলা তো হবেই। সেটাই স্বাভাবিক।
ব্রেকফাস্ট খেয়ে প্রফেসর আজিজ এয়ারপোর্ট চলে গেলে নিজের ঘরে ফিরে এলো লোপা। এখন এ বাড়িতে ও স্বাধীন। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ও এ বাড়িতে এসেছে সে কাজটা এবার বোধ হয় নিশ্চিন্তে করতে পারবে। প্রফেসরের নজর ওর ওপর থাকবে না।
প্রথমেই প্রফেসর আজিজর এই ‘এনার্জি কমপ্লেক্সের একটা প্ল্যান এঁকে ফেলতে হবে। এখানে কী কী কাজ হয়, কী কী জিনিস তৈরি হয়, তার একটা ফর্দ তৈরি করতে হবে। কারা সেসব জিনিস কেনে, কোন কোন দেশে পাচার হয়, তার হিসেবও লিখে ফেলতে হবে। কিন্তু এসব করতে গেলে মারুফের সাহায্য প্রয়ােজন। কিন্তু মারুফ কি প্রফেসর আজিজর এসব অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়িত, নাকি শুধু গবেষণার কাজটুকুই করে। অবশ্য প্রফেসর আজিজ যে অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়িত, তা নিয়ে লোপা এখনো নিশ্চিত নয়। কাল রাতে ট্রাকে মাল পাঠানো অপরাধমূলক কোনো কাজ নাও হতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তেমন কিছু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত করা ঠিক হবে না।
দশটা নাগাদ মারুফ এলো। লোপাও রেডি হয়ে ছিল। ওরা দুজনে মিলে গবেষণাগারের দিকে এগোলো। গবেষণাগারের দরজায় আগের মতোই তালা লাগানো ছিল। ওরা দুজন যাওয়া মাত্র দরজা খুলে দিল রক্ষী। লিফটে চড়ে লোপা বলল, চলো, আজ দোতলা তিনতলার ঘরগুলো দেখি। ওখানে কী কাজ হচ্ছে, তা জানতে বড় ইচ্ছে করছে মারুফ । দুঃখিত গলায় স্বপ্নদীপ বলল, “সেটা সম্ভব নয় লোপা। প্রফেসরের এই এনার্জি কমপ্লেক্সে যাকে যতটুকু কাজ দেওয়া হয়েছে, সে ঠিক ততটুকুই করবে। তার বেশি জানবারও অধিকার তার নেই। আমিও তাই বেশি কিছু জানবার চেষ্টা করি না।’
‘কিন্তু একজন বিজ্ঞানী হিসেবে এই এর্নাজি কমপ্লেক্সে কী ঘটছে, তা জানতে চাইবার মধ্যে অপরাধ কোথায়?
না, তাতে কোনো অপরাধ নেই। তবে প্রফেসর আজিজ অহেতুক কৌতুহল পছন্দ করেন না বলেই হয়তে অন্য ব্যাপারে মাথা ঘামাই না’। ।
‘কিন্তু প্রফেসর কি কখনো সরাসরি আপত্তি জানিয়েছেন?
‘তা হয়তো জানাননি। তবে ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, কোনো ব্যাপারে বেশি কৌতুহল উনি পছন্দ করেন না-লিফট চারতলায় থামলে ওরা লিফট থেকে বেরিয়ে এলো।
মারুফ বলল, “চলো, আজ তোমার ঘরেই বসা যাক’
‘কিন্তু আজ আর কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। তার চেয়ে বরং প্রফেসর আজিজ এর এনার্জি কমপ্লেক্স নিয়ে তোমার কাছে গল্প শুনি। আচ্ছা, মারুফ, এই বিল্ডিংয়ের একতলায় কী আছে?
‘একতলা দোতলা মিলে রয়েছে এক বিশেষ ধরণের পারমাণবিক চুল্লি, তার সঙ্গে লাগোয়া ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট। এই ইউনিটগুলি অটোম্যাটিক। চালাবার জন্য দু’জন লোকই যথেষ্ট। এখান থেকে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরণের এনার্জি ক্যাপসুল, যার কথা তুমি হয়তো প্রফেসরের মুখ থেকে আগেই শুনেছ’।
‘হ্যাঁ শুনেছি। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবার সময় এই এনার্জি ক্যাপসুলের কথাই বলেছিলেন প্রফেসর। আচ্ছা মারুফ, তুমি কি জানো এই এনার্জি ক্যাপসুল কাদের কাছে বিক্রি করেন প্রফেসর?
লোপার কথা শুনে হঠাৎ যেন চমকে ওঠে মারুফ। তারপর চাপা গলায় বলেন, ‘এসব কথা তুমি জানলে কী করে?
গত রাতের ঘটনার সবটা খুলে বলে লোপা। সবকিছু শুনে মারুফ বলল, “তুমি এসব নিয়ে এখানে বেশি আলোচনা করো না। কে কোথায় শুনতে পাবে। তখন আমরা দুজনেই বিপদে পড়ে যাব’
লোপা চুপ করে কী যেন ভাবে। একটু পরে মারুফ আবার বলে, ‘আমার মনে হয়, প্রফেসর আজিজ যদি এইসব এর্নাজি ক্যাপসুল অন্য কাউকে বিক্রি করেন তবে তার মধ্যে অন্যায় কোথায়! এটা ওর নিজের আবিষ্কার। তাই এসব জিনিস বিক্রি করারও অধিকার ওর আছে। আর তাছাড়া এখানে কাজ করার বিনিময়ে উনি আমাকে ভালো টাকা মাইনে দিচ্ছেন। এত টাকা অন্য কোথাও আমি পেতাম না। তাই আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ।
মাথা নিচু করে বলে লোপা, সত্যি আমি দুঃখিত মারুফ। সব কিছু না জেনে আমার কথা বলা উচিত হয়নি। আমারই বুঝতে ভুল হয়েছে।’
ঘরের ইন্টারকম টেলিফোন তুলে মারুফ বলে, “বার্বুচি, আমাদের জন্য দু’কাপ কফি পাঠিয়ে দেবে ?
মিনিট দশেকের মধ্যে কফি এসে যায়।
‘এসো লোপা, কফি খেয়ে আমাদের কাজ শুরু করা যাক
‘হ্যাঁ, তাই ভালো’ বিষন্ন গলায় বলে লোপা।
কফি খাওয়া শেষ করে মারুফ ও লোপা দুজনেই হাতে গ্লাভস পরে নেয়। তারপর শুরু করে ইউরেনিয়াম স্যাম্পেল নিয়ে নানারকম পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা। কখনো বড় স্যাম্পেল নিয়ে, আবার কখনো খুব সূক্ষ পতিল স্যাম্পেল। ছাদের কাছে যে মাল্টিপল প্রিজম রয়েছে, তার ভেতর দিয়ে নানা তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সূর্যরশ্মি আসছে। সেই সূর্যরশ্মির সঙ্গে কীভাবে বিভিন্ন তাপমাত্রায় স্যাম্পেলগুলির সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটানো যায়, তা হাতে কলমে দেখিয়ে দিল মারুফ। সে সব পরীক্ষার ফলাফল লিখে রাখবার জন্য লোপাকে নতুন একটা ডায়েরি দিল মারুফ। কালো রংয়ের একটা ডায়েরি। তার ওপর লেখা ‘এর্নাজি কমপ্লেক্স’। তলায় ঠিকানা।
কালো রংয়ের ডায়েরি দেখে বাবার ডায়েরির কথাটা মনে পড়ল। বাবার যে ডায়েরিটা বাংলাদেশে হারিয়ে গিয়েছিল, সেটা ছিল লাল রংয়ের। সেই ডায়েরি কি এই এনাজি কমপ্লেক্সের ভেতরে রয়েছে? নাকি সেটা চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে। যতদিন না ওই ডায়েরিটা খুঁজে পাচ্ছে, ততদিন লোপার শান্তি নেই।
ঐ ডায়েরির কথাটা কি মারুফকে বলবে লোপা? বলতেই হবে। কারণ একলা একলা ঐ হারিয়ে যাওয়া নাকি চুরি হওয়া বাবার ডায়েরি খুঁজে বের করা লোপার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এখানে মারুফকে সে কথা বলতে পারবে না লোপা। কে কোথায় ঘাপটি মেরে কথা শুনছে কে জানে!
(চলবে…)

পড়ুন- ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব- ৩)

আপনার মতামত দিন