নিপুর ভূত দেখা

মোস্তাফিজুল হক

নিপুর ইশকুল বন্ধ। গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। হাতে অনেক সময়। তবু ঘর থেকে বের হওয়া যায় না। যাবে কী করে? বাইরে যে তেতে ওঠা আগুনের মতো সোনা রোদের ঝিলিক। এতোটা রোদে বাইরে এসে কেউ খেলতে চায় না। নিপুদের বিশাল বাড়ি। বাড়িতে কতরকম ফলের গাছ। তাই বাড়ির ভেতরে থাকাটাই আরামদায়ক। কিন্তু একা একা ফাঁকা বাড়িতে খুব কি ভালো লাগে? এসময় দাদুও বাড়ি নেই। গত সপ্তাহে বড় চাচা এসে ঢাকায় নিয়ে গেছেন। নিপুর কেমন যেন উদাস উদাস লাগে। লেখাপড়ার পাশাপাশি বেশকিছু কিশোর ম্যাগাজিন আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই-ই ওর অফুরন্ত অবসরের একমাত্র সঙ্গী। মাঝে মাঝে পাশের বাড়ির শাহীন এসে জানালার পাশে দাঁড়ায়। কোন গাছে কী পেকেছে, কোথায় পাখি বাচ্চা দিয়েছে- এসব খবর নিয়ে আসে। শাহীনের বাবা বেঁচে নেই। ও যখন থ্রিতে পড়ে তখন মারা গেছে। ওরা নিতান্ত গরিব মানুষ। ফলে ওর মা নিপুদের ঘরে ঝি এর কাজ করে। বুধবার দুপুরে এসে শাহীন বলে গেল, “নিপু ভাইয়া, তুমগো জাম গাছে জাম পাকছে। জাম গাছের লগে কদম গাছে কাঠকুড়ালি ডিম ফুটাইছে। দুইটা ছানা। পাইড়া দিমুনে; একটা তোমার, একটা আমার।”

নিপুর কাছে এই পাখিটাকে খুব ভালো লাগে। সে আলী ইমামের বই পড়ে জেনেছে এটা বাংলা কাঠঠোকরা।হাতুড়ির মতো কালো সূচালো ঠোঁটে  ঠকঠক সারাদিন গাছে ঠোকরায়। এরা শত্রুর উপস্থিতি টের পেলে চড়াগলায় ডেকে ওঠে। এক গাছ থেকে উড়ে গিয়ে অন্য গাছে বসে। লালঝুঁটির এ পাখিটা দেখতে খুবই চমৎকার!

নিপু শাহীনের কথার জবাবে বললো, “দূর বোকা! পাখিদের ছানা ঘরে পুষতে নেই। তোকে যদি কেউ ধরে নিয়ে বন্দি করে রাখে, তোর কি ভালো লাগবে? তাছাড়া এরা তো কাঠ ঠোকরাতে না পারলে ঠোঁট বেড়ে মারা যাবে, বুঝলি?”
নিপুর পড়ার ঘর থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে কদম গাছটাকে দেখা যায়। সে খেয়াল করলো সত্যিই তো খোড়লের সামনে দুটো ছানাকে মা পাখিটা মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।

দুইদিন পর শুক্রবার মাগরিবের পর নিপু ঘরে বসে পড়ছিল। তীব্র গরমে জানালা খোলা রেখেছে। আকাশ পরিষ্কার। খুব একটা অন্ধকার নেই। পাখিরা সন্ধ্যার আগেই চেচামেচি বন্ধ করেছে। তবে কদম গাছে কাঠকুড়ালি এই অসময়ে চড়া সুরে ডাকাডাকি করছে কেন? নিপু খুব ভালো করে গাছের দিকে তাকালো। ওমা! এত্তো বড়ো লেজ যে! চোখেও আগুন জ্বলে! ও দুটো কী তবে? নাকি কদম গাছে ভূত এসেছে!

নিপু মনেমনে বলে, “দাঁড়া, টর্চটা নিয়ে বাইরে আসছি” বলেই ভয়ে খুকখুক করে কাশে।

হঠাৎ চারপাশে যে আতপচালের সুবাস ছড়ালো? আজব ব্যাপার দেখি! তবে কি পাখির ছানা খাবে বলে ভূত দুটো রেকি করছে নাকি? এবার নিপু আর স্থির থাকতে পারলো না। সে ড্রয়িংরুমে এসে ওর বাবাকে বললো, “বাবা, বাইরে এসো। সাথে টর্চটা নাও।”
বাবা বললেন, “কেন কী হয়েছে? একদম কথা বলো না। মা শুনলে ভয় পাবে। তুমি কিন্তু আবার ভয় পেয়ো না।”
ছেলের কথায় বাবা মুচকি হাসি হাসলেও তাঁর ভেতরেও বেশ একটা কৌতুহল তৈরি হয়েছে। পিতাপুত্র টর্চ নিয়ে বাইরে বেরুলো। কদম গাছের কাছাকাছি পৌঁছে নিপু বলতে লাগলো, “ঐ যে দেখো, কদম ডালে দুটো ভূতের ছানা। ওদের চোখে আগুন ঝরছে। ওরা পাখির ছানা খাবে বলে গাছে
নাচ জুড়েছে। একটু পরপর আতপ চালের ঘ্রাণ পাচ্ছি। আমার তো মনেহয় ওরাই ছড়াচ্ছে।”

বাবা এবার হেসেই মরে। “ভূত কোথা রে খোকা? এগুলো তো গন্ধগোকুল! এদের আরেক নাম খাটাশ। নিশাচর প্রাণী। এরা মানুষের কাছাকাছি থাকে। দিনের বেলা বড় কোনো গাছের ডালে নয়তো ঘরের সিলিংএ লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে। গন্ধগোকুল মূলত ফলখেকো হলেও কীটপতঙ্গ, শামুক, পাখির ডিম, পাখির ছানা, ছোট প্রাণী, তাল ও খেজুরের রস খায়। খাদ্যের অভাবে মুরগি ও কবুতর চুরি করে। এরা ইঁদুর ও ফল-ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। ধূসর রঙের এই প্রাণী অন্ধকারে অন্য প্রাণীর গায়ের গন্ধ শুঁকে চিনতে পারে। এরা পোলাওয়ের চালের মতো ঘ্রাণ ছড়াতে পারে। একসময় গন্ধগোকুলের গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রস দিয়ে সুগন্ধি তৈরি হত। এখন এরা বিলুপ্ত প্রায় প্রাণী।”

এবার নিপু কিছুটা লজ্জিত হয়েই বললো, “বাবা, আর যাই বলো, ভূত না দেখা হলেও আজ কিন্তু আমি অনেক কিছুই জানতে পারলাম। চলো, এবার ঘরে ফিরে যাই।”

আপনার মতামত দিন