পথ শিশুদের ঈদ

বছর ঘুরে একটি বার ঈদ আসে। আবার চলেও যায়। কিন্তু ঈদ নিয়ে আমাদের থাকে হাজারো রকমের চাওয়া-পাওয়া৷ ঈদ আসলেই আমাদের মাঝে আলাদা আনন্দ কাজ করে। একটা একটা করে দিন গুনতে থাকি কবে আসবে ঈদ। আলাদা একটা উন্মাদনা কাজ করে সবার মাঝে।
ঈদ তো আর হেলায় ফেলায় কাটতে দেয়া যায় না। তাই ঈদের অনেক আগে থেকেই থাকে আমাদের নানা আয়োজন। কে কী কিনবে, কার ঈদের বাজেট কতো? ঈদে কে কোথায় ঘুরতে যাবে! কার কার কাছ থেকে ঈদের সেলামি নিবে! কে কার বাসায় আগে যাবে!
আরো কতো কি!
ঈদের সময় বাবা-মায়েরাও অনেক চেষ্টা করে সন্তানকে একটু ভালো জিনিস দিতে ভালো খাওয়াতে।
কিন্তু অনেক বাবা-মাই পারে না তাদের সন্তানদেরকে ভালো কিছু দিতে, ভালো কিছু পরাতে, মুখে ভালো কিছু তুলে দিতে। অনেক বাবা-মার কাছেই এটা অনেক কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের মতো রাস্তায় ঐ ছোট ছোট বাচ্চারও ঈদের অনেক কিছু করতে মনে চায়! কিন্তু নির্মম বাস্তবতা তাদের গ্রাস করে ফেলে। যার জন্য তাদের ইচ্ছেগুলোকে মাটি চাপা দিতে হয়। রাস্তায় পড়ে থাকা ঐ মানুষগুলোর পাশে দাড়ানোর মতো কেউ নেই।।
অনেক পরিবারের সন্তানেরই ঠিকানাটা হয়ে দাঁড়ায় রাস্তার ফুটপাত, শহরের কোনো বস্তি বা ব্যাস্ততম কোনো ব্রিজ। তারা স্বপ্ন দেখতে পারে না! দিন শেষে তাদের মনের মনেও জাগে মা-বাবার পাশে থাকতে। মা-বাবার ভালোবাসা পেতে। দিন শেষে তাদের মনে হয় তারাও যদি পড়তে পারতো। আমাদের মতো মানুষদের সকাল শুরু হয় আলসেমিতে বা কারো স্কুল দিয়ে। কিন্তু ঐ মানুষগুলোর দিনই শুরু হয় হাতে একটা পুরনো বস্তা নিয়ে।
মানুষের মৌলিক অধিকার তাদের ভাগ্য জুটে না। তাদেরও মনে আনন্দ হয় যখন বছর ঘুরে আবার ঈদ আসে। তারাও বন্ধু বান্ধব মিলে আলোচনা করতে পারে যে আমার ঈদে আমি এগুলো নিবো। আমার ঈদে আমি এগুলো কিনবো।আমার ঈদে আমি এর কাছে সেলামি নিবো ওর কাছে সেলামি নিবো। পাবার আশা তাদেরও আছে নেয়ার আশাও তাদের চোখ জুড়ে। কিন্তু তাদের এ পাওয়া আর নেয়ার মাঝে আছে বিস্তর ফারাক, যার জোড়া জীবনেও লাগার মতো নয়।।
পথশিশুরা আমাদের মতো এতো ভাবতে পারে না যে তাদের জীবন এমন হবে বা এমন হতে পারতো। তাদের শুধু একটাই চিন্তা দিন শেষে যাতে পেট ভরে খেতে পারে। এটিই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। তাদের মনে এটা ধরে না যে ঈদে আমার এটা লাগবে, আমার ঈদে ওটা লাগবে।।
ঈদে বন্ধুদের সাথে রাস্তার ধারেই একটা দোকান থেকে কিছু খাচ্ছিলাম। সবাই মিলে হাসি-ঠাট্টা করছি। বলাবলি করছি এবার কার সেলামি কতো উঠলো। কিন্তু রাস্তার ঠিক ঐ পাড়েই কয়েকজন পথ শিশু যারের কাধের উপরে ঝুলানো পুরনো সব বস্তা। আমি চুপ করে বিষয়টি লক্ষ্য করছি যে তারা কি করে বা তারা কই যায়। দেখলাম তাদের মনে কোনো কষ্ট নেই।তাদের কোনো অভিযোগও নেই সবাই হাসি খুশি। সচরাচর পথশিশু মাঝে মাঝেই দেখা হয়। কিন্তু ঈদের দিনেই তাদের রাস্তায় দেখিনি, আজই প্রথম। আমার তখন কিছুই করার ছিলো না!
কিন্তু ঐ শিশুদের দেখে মনে মনে কিছু ভাবতে পেরেছি। যে তারাও তো আমাদের মতোই মানুষ। প্রাকৃতিক বা পারিবারিক নানা কারণে তাদের আজকের যায়গা এখানে হয়েছে। তাদের তো কোনো দোষ ছিলো না। কিন্তু তাদের কেনো আজ এই অবস্থা। তারা কেনো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেস্তায় একটি নোংরা ময়লা বস্তা নিয়ে। তারা কেনো আমাদের মতো পড়াশোনা করে না। তারা কেনো আমাদের মতো স্কুলে যায় না। তারা কেনো তিন বেলা খেতে পারে না। তারে কেনো পারে না বন্ধু বান্ধবদের সাথে মিলে এক সাথে মজা করতে। বা কোনো জায়গায় ঘুরতে।
ভাবলাম তাদের মতো যদি আমারও অবস্থান একি যায়গায় হতো। তাদের মতো যদি আমারও প্রতিদিন সকাল বেলা একটি করে নোংরা ময়লা বস্তা নিয়ে রাস্তায় বের হতে।ভাবতেই খুব কস্ট হয়ে ছিলো। মনে হয়েছিল, আমারও যদি তিন বেলা পেট ভরে খেতে সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ময়লা টোকাতে হতো। আর রাতের বেলা খোলা আকাশের নিচে ফুটপাত বা রাস্তার এক ছোট্র কোনে শুয়ে থাকতে হতো। কনকনে ঠান্ডা শীতেও, আবার বর্ষায়ও। আমারও যদি ঐ খানেই অবস্থান হতো যেখানে আমি এখনকার মতো বই পড়তে পারতাম না, পারতাম না মা-বাবার সাথে একি টেবিলে বসে রাতের খাবারটা খেতে। পারতাম না ভালো না লাগলেই মোবাইল টিপতে, পারতাম না বসে বসে টিভি দেখতে। পারতাম না বিকেল হলে পাড়ার পাঠে খেলতে। পারতাম না বন্ধুদের সাথে মিলে কোনো রেস্টুরেন্টে বসে বসে খেতে। পারতাম না মায়ের হাতের মজার মজার খাবারগুলো। এখন যখন মা-বাবার কাছে যা আবদার করি তাই পাই, তখন কিছুই পেতাম না।
পারতাম না ঈদ আসলে মা-বাবার সাথে মিলে মার্কেটে গিয়ে নিজের চয়েজ অনুযায়ী কোনো কিছু কিনতে।
আরও অনেক কিছুই ভাবতে থাকি কিন্তু নিমিষেই সেই ভাবনা আমার কাছ থেকে উড়ে যায়। কারণ বন্ধুরা সেখানে অনেক মজা করছিল। আমি ইচ্ছে করলেও পারবো না তাদের সাহায্য করতে। আমি ইচ্ছে করলেই পারবো না তাদের পাশে দাঁড়াতে।
তাও সেদিনকার কথাগুলো আজও মনে আছে আমার। পথ শিশু তারা ফেলনা না। তারাও আমার মতো রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। তারাও চায় আমাদের মতো থাকতে। আমাদের মতো চলতে আমাদের মতো পড়ালেখা করতে। আমারা যারা এই পথ শিশুদের সাহায্য যদি করতে না পারি কিন্তু তাদের তাদের যেনো আমারা কখনো খারাপ চোখে না দেখি। তাদের কখনো অবজ্ঞা না করি। যাদের আছে তারা তাদের পাশে দাঁড়াবেন এটাই হলো মানবতা।

বিল্লাল হোসেন (১৫), ঢাকা
শির্ক্ষার্থী- মোহাম্মদ আলী ইয়াকুব আলী স্কুল এন্ড কলেজ।