বই রিভিউ : ইশতিয়াক আহমেদের আদর্শলিপি দশে আট

শরীফ বিল্লাহ

”রাগি মেয়েদের আবিষ্কার করা যায় সহজে। চুপচাপ থাকাদের ক্ষেত্রে সমস্যা। তারা সমুদ্র থেকেও গভীর। তানিয়া সমুদ্র ক্যাটাগরির। তাদের সম্পর্কের জানা, সমুদ্রে জাল ফেলার মতো। এই টাইপের মেয়েদের একটা গোপন বিষয় থাকে। তারা যে কোন সময় পাল্টে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। সুযোগ পেলেই সেটা প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।”

-বইয়ের এই কথাগুলো অামার বেশ ভালো লেগেছে। লেখকের লেখার গভীরতা কতটুকু তা এখান থেকে সহজে বুঝা যায়।

লেখক ইশতিয়াক আহমেদ। জন্ম ২২ নভেম্বর। সাংবাদিকতা করছেন দেশের শীর্ষ একটি জাতীয় পত্রিকায়। লিখে চলেছেন দু’হাতে। অনেকগুলো বই প্রকাশ করেছেন। কয়েকটি বই সম্পাদনা করেছেন। গল্প,উপন্যাস ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছড়ার বই। গান ও নাটক লিখছেন। নির্মাণের ক্ষেত্রেও তাঁর হাত বেশ ভালো।

উপন্যাসের সারসংক্ষেপ:
আনিস একজন ব্যবসায়ী। আয়না ব্যবসায়ী। তার দোকানের নাম আদর্শ কাঁচ ঘর। ব্যবসাতে তার কোন মনোযোগ নেই। ব্যবসা ছাড়াও তিনি এলাকায় খবরদারি করেন। যে কোন লোককে গায়ে হাত তুলেন।তানিয়াকে আনিস পছন্দ করে। কিন্তু তানিয়া তাকে পছন্দ না করে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরায়। তার থেকে সকল সুবিধা আদায় করে নেয়। একদিন আনিসের এলাকায় নতুন ভাড়াটিয়া লিপি আসলো। লিপিকে দেখে আনিসের খুব ভালো লেগে গেল। সে তানিয়াকে মন থেকে সরিয়ে লিপিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু লিপির পরিবার তাতে রাজি হচ্ছিল না।
কেন রাজি হচ্ছিল না? শেষে কি রাজি হয়েছিল? কিভাবে রাজি হয়েছিল? অানিস যখন তখন মানুষকে মারতো- তার কি শাস্তি পেয়েছিল?
উপন্যাসটি পড়ে বিস্তারিত জানতে পারবে পাঠকরা।

এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্রগুলোর দিকে আলোকপাত করা যাক-

আনিস: এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আনিস। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে এই উপন্যাস। আনিসের চরিত্রে একদিকে পাওয়া যায় কঠোরতা আরেকদিকে পাওয়া যায় কোমলতা। সে কথায় কথায় মানুষের গালে চড় দেয় আবার সুন্দরী মেয়ে দেখলে অল্পতেই তার প্রেমে পড়ে যায়। মাকে কখনো কষ্ট দিয়ে কথা বলে না। মনির চাচা দোকানের কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও খুবই সম্মান দিয়ে, নরম স্বরে কথা বলে।

লিপি: একজন স্বপ্নবাজ তরুনী। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন। কখনো অনির্বাণের সাথে হাত ধরে দূর পাহাড়ে চলে যান আবার কখনো বারান্দায় গাছের সাথে কথা বলেন। একদিন তো স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে বারান্দায় গাছের জীবন নিয়ে নানা কথা বলেন। উপন্যাসের শুরুতে তাকে মূল চরিত্রে দেখা না গেলেও শেষের দিকে মূল চরিত্র তাকে ঘিরেই তৈরি হয়।

মনির চাচা: একজন রহস্যময় লোক। আনিসের নানা মানবিক দূর্বলতা তিনি সবসময় তার সামনে তুলে ধরেছেন। সবাই অানিসের ভয়ে কিছু বলতে সাহস না করলেও মনির চাচা সব অপকটে বলে দিতেন। তানিয়া যে তাকে ব্যবহার করছে এটা প্রথম আনিসকে জানান তিনি। বিনা কারনে মানুষের গায়ে যেন হাত না তুলে, এটাও সবসময় বলতেন। প্রকৃতির যে একটা বিচার আছে এটাও তাকে মনে করিয়ে দিতেন।

তানিয়া: স্বভাবগত দিক দিয়ে উপন্যাসের ভিলেন হওয়ার কথা ছিল আনিস। কিন্তু তাকে ছাড়িয়ে সবার কাছে ভিলেনরুপে চলে আসে তানিয়া। কারণ আনিসের ভালোলাগার দূর্বলতার সুযোগে তানিয়া তাকে ব্যবহার করা শুরু করে। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করতে থাকে। এটা আনিসের কাছে আস্তে আস্তে প্রকাশ হতে থাকে।

জাহানারা বেগম: আনিসের মা। আনিস তার মাকে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে পারেন না। তার কোন কথা ফেলে দিতে পারেন না। মায়ের প্রতি সকল ছেলেমেয়ের ভালোবাসা আনিসের ব্যবহারের মাধ্যমে ফুটে উঠে।

অ্যারিস্টটল: উপন্যাসের একটি কাল্পনিক চরিত্র। আনিস তাকে বড় ভাই মনে করে। সবসময় আনিসের সাথে কথা বলে। তাদের অালোচনা পাঠকের মনে বেশ রসের সৃষ্টি করবে।

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু: উপন্যাসের আরেকটি কাল্পনিক চরিত্র। স্বপ্নে লিপির সাথে তাঁর দেখা হয়েছে। তার বারান্দায় এসে গাছের জীবন নিয়ে কথা বলেছেন।

শাহীন: উপন্যাসে সবচেয়ে মজার চরিত্র এই শাহীন। আনিসের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তাকে সবাই চিনে। সে পত্রিকার ভাষায় কথা বলে। যেমন- “এভাবে চলমান বিচ্ছেদ আমাদের ব্যাথিত করে। তারউপর নারীগন আমাদের স্থানীয়।”

কিছু উক্তি বা সংলাপঃ
১.দুনিয়ার যতবড় বক্তা বা ক্ষমতাধর হোক, চুল কমে যাচ্ছে বললে সে কিছুটা ভড়কে যাবেই।
২.কালচার থেকে মেয়েটিকে আমি এগ্রিকালচারে নিয়ে যেতে পারি।
৩.জীবনের মহাসমুদ্রে ক্ষমতা একটা লাইফ জ্যাকেটের মতো। সাঁতার পারলেও এটা জড়িয়ে রাখতে হয়। ছাড়া যায় না।
৪. দীর্ঘশ্বাস নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করে।
৫. অন্য কেউ বিপদে পড়লে দু:খি দু:খি চেহারা করে সেটা উপভোগের একটা আলাদা মজা আছে। …বড় ঘটনা দু একটা চড় থাপ্পড় ছাড়া জমে না।
৬. ভালোবাসা মানে কাউকে ব্যবহার করা না। নিজেকে ক্ষয় করে ভালোবাসতে হয়।
৭. বিপদ না আসলেও এগুলোর ফলাফল ভালো হয় না। প্রকৃতির বিচার আছে।
৮. তার সবচেয়ে রহস্যের জায়গাটা চুপ থাকা। কথা বললে হয়তো আমিও তাকে ধরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু সে যেহেতু কথা বলে কম তাই আমি বুঝি না তাকে।
৯. স্রষ্টা মায়েদের একটা অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছেন। সন্তানের চেহারা পড়ার।
১০. মানুষ নিজে নিজের শ্রেষ্ঠ মাপকাঠি। মানুষ ভালো কাজ করলে তার ভেতরেই সেই অনুভূতি রক্তের সাথে মিশে গিয়ে তাকে ভালো রাখে।

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
মানুষের জীবন অনেক কঠিন। জীবনের কোন কিছু কারো হিসেব মত মিলবে না। মানুষের কর্ম একদিন প্রকৃতি বিচার করে। মানুষ নিজেকে দেখার দুটি উপায় আছে। প্রথমটি আয়না আর দ্বিতীয়টি গার্লফ্রেন্ড। বাইরের চেহারা মানুষ আয়নায় দেখতে পায় আরভেতরের মানুষকে দেখতে পায় তার প্রিয় মানুষ।

অনেক উপন্যাস পড়েছি যেখানে ভাষা অত্যন্ত দুর্বোধ্য লেগেছে। লেখকের “অাদর্শলিপি” উপন্যাসের ভাষা খুব সহজ সরল। শব্দচয়নে লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ছোট ছোট বাক্যে পুরো উপন্যাস রচিত। আমাদের বাস্তবিক জীবনের কয়েকটি দিক গল্পের অংশ হয়ে আমাদের হ্রদয়কে ছুঁয়ে দিয়েছে। প্রাঞ্জলভাষায় লেখক জীবনের নানা অংশ তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসে থাকে নানা চরিত্র। পড়তে গেলে এসব চরিত্রগুলো তালগোল পাকিয়ে ফেলি। কিন্তু এ বইয়ের চরিত্রগুলো মনে রাখা বেশ সহজ। নামগুলো অামাদের অাশেপাশের পরিচিত মানুষের মত করে অামাদের কাছে ধরা দেয়।

যে কোন লেখায় লেখকের বড় একটা ক্রেডিট হচ্ছে পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া। পাঠক যদি কয়েকপাতা পড়ে বুঝতে পারে এর শেষে কী হবে, তাহলে পাঠক পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ দিক দিয়ে বলবো- লেখক আপনাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে পারবে। শেষ লাইন পড়ার আগ পর্যন্ত পাঠক বুঝতে পরবেনা, উপন্যাসে কি ঘটতে যাচ্ছে। বইটির সর্বশেষ লাইন পড়ে পাঠকের হাহাকার লাগবে-নিশ্চিত।

অনেক ভালো উপন্যাস আছে যা বোদ্ধা মহলে বেশ জনপ্রিয় কিন্তু সাধারণ পাঠক মহলে ততটা জনপ্রিয় নয়। এই বইটি সাধারন পাঠকের বেশ ভালো লাগবে।

তবে,
উপন্যাসটির অধ্যায়গুলো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। আরেকটু বড় হওয়া উচিত ছিল পুরো উপন্যাসটি। লেখক লেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করেছেন বলে মনে হয়।

লেখক ইশতিয়াক আহমেদ অসাধারণ একজন লেখক। তাঁর অধীনে আমি দীর্ঘদিন লেখালেখি করেছি। বাংলাসাহিত্য বেশ বড়মানের একজন লেখক পেতে যাচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ পরবর্তি লেখকের অভাব তাঁর হাত দিয়েই পূরণ হতে যাচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস।

বইয়ের নাম: আদর্শলিপি
লেখকের নাম: ইশতিয়াক আহমেদ
প্রকাশক: ফয়সল আরেফিন দীপন
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
ধরন: উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫
পৃষ্ঠা সংখা: ৮০
মূল্য: ১৬০ টাকা

রেটিংঃ ১০ এর মধ্যে ৮(অামার মতে)

লেখক : শরীফ বিল্লাহ। রম্য লেখক ও গল্পকার।

আপনার মতামত দিন