বঙ্গবন্ধু পদাবলী

বঙ্গবন্ধু পদাবলী
নাসের মাহমুদ

প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে উত্তরোত্তর যুগে
পলল সঞ্চিত হয়ে দরিয়ার বক্ষে জাগে
সবুজ শ্যামল বদ্বীপ, যেন ঝিনুকের মাঝে মুক্তোর প্রদীপ।
উত্তরে বান্ধা আছে সারি বাধা পাহাড়
দক্ষিণে বিশাল নীল জল রাশির আধাঁর।
বুক জুড়ে তার বহমান নদী
খাল বিল জলাশয়ে জল নিরবধি।
ফি বছর প্লাবনে ভেসে যায় ভূমি
পলির পরশে তাই উর্বর জমি।
সুফলা কৃষিজাত সোনার ফসলে ভরপুর
শষ্যের ঘ্রাণে আসে ভেসে/টেনে আনে ডিঙ্গা জলদস্যূর।
এলো মগ, বর্গী, হুন, মোগল,ইংরেজ,পাঠান
নির্মম নির্যাতনে আত্না ছাড়া খাঁচা বাঙ্গালির পরাণ।
পরদেশী শাসকের ত্রাসের শাসন
করে বঙ্গ ভুমের মাটি, সম্পদ লুন্ঠন।
বহিরাগত শাসকের উদ্ভট বিকৃত উচ্চারণ ব্যর্থতায়
বঙ্গদেশকে ডাকে বাঙলাহ, বেঙ্গল নানা অভিধায়।
পলাশীর আম বাগানে গেল অস্ত, বাঙ্গালির স্বাধীনতার সূর্য।
আনতে সোনালী ভোর, করতে ইংরেজ শাসন অবসান
নিখোঁজ হলো নেতাজী সুভাষ বোস,মাস্টারদা সূর্যসেন দিলো প্রাণ ।
সাম্প্রদায়িক আচঁড়ে দ্বিখন্ডিত ভারতবর্ষ
সিরিল র‌্যাড ক্লিফের কাঁচির আঘাতে ছিড়লো মানচিত্র।
শরৎ বোস,সোহরাওয়ার্দীর যুক্তবঙ্গের প্রস্তাবনা হলো বরবাদ
ডাইরেক্ট একশন দিবসে রক্তে রঞ্জিত কোলকাতার পথঘাট।
সোহরাওয়ার্দী , গণতন্ত্রের মানস পুত্র
সংস্পর্শে এসে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, তরুন মুজিব করে রপ্ত।
করতে দাঙ্গার অবসান, বাচাঁতে মানুষের জীবন,মানসম্মান
ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রনেতা, শেখ মুজিব লড়ে দিয়ে জানপ্রান।
দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তাক্ত তরবারী, খড়্গের উদ্যোত রোষানল এড়িয়ে
জীবন বাজী রেখে, খাদ্য পৌছে দেয় অভুক্ত মানবে, নিজে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে।
খন্ডিত হৃদয়ে নতুন আশা নিয়ে ফিরে আসে ঢাকা
সম্প্রীতির বাঁধন দৃঢ় করে, দাঙ্গা রূখে, দেশত্যাগে দেয় বাধা।
প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশে
জন্ম দেয় ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ, বাঙ্গালি ছাত্রদের মানসে।
হাজার বছরের বাঙ্গলির পরাধীনতার গ্লানি
কুঁড়ে কুঁড়ে খায় শেখ মুজিবের হৃদয়খানি।
সংস্কৃতি,সামাজিক আচার ,ভাষার ভিন্নতা
গড়ে তোলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে আপোষহীনতা।
পাকিস্তান গর্ভনরের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দু, নির্বাচনের উদ্যোত অহংকার
কার্জন হলে উঠে প্রতিবাদের গর্জন, শেখ মুজিব সহ ছাত্রদের না না না ধ্বনির হুংকার।

রক্তে উঠে জাগি, পরাধীনতার গ্লানি
দুরদৃষ্টিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাষা আন্দোলনে দেয় নেতৃত্ব
জাতির চেতনায় শেখ মুজিব বুনে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম দিবসের প্রথম সফল হরতালে
নেতৃত্ব দিয়ে বন্দি হয়ে মুজিব যায় কারাগেরে।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন করে পরিচালনা
জেল হতে চিরকূট, চিঠিতে দিয়ে নির্দেশনা
চুয়ান্নের হক-ভাসানী যুক্তফ্রন্ট গঠনে হলেন সেতুবন্ধনকারী
কারাগারে অন্তরীণ থেকে হলেন আওয়ামী লীগের জয়েণ্ট সেক্রেটারী।
ছাপ্পান্নতে সংসদে দাঁড়িয়ে খুজঁলেন কার্যবিবরণী
বাংলায় না পেয়ে ছুড়ঁলেন অভিযোগের তীরখানি।
বঙ্গদেশের অস্তিস্ত্ব না পাই বঙ্গোপসাগর ছাড়া
স্বৈরশাসক পূর্ববাংলাকে প্রতিস্থাপন করে পূর্ব পাকিস্থান দ্বারা।
ছাড়লেন মণ্ত্রীত্ব, ধরলেন আওয়ামী লীগের হাল
বুঝলেন জনসংম্পৃক্ত আন্দোলন ছাড়া
বাঙ্গালির মুক্তি,স্বাধীনতার নাগাল না যাবে ধরা।
আইয়ুব খানের মার্শাল ল’, বেসিক ডেমক্রেসীর অত্যাচারে
জর্জরিত সারা বাংলা, প্রতিবাদে সংশপ্তক শেখ মুজিব নিক্ষিপ্ত কারেগারে।
বাষট্টির শিক্ষা কমিশন বিরোধী তীব্র আন্দোলন সংগ্রাম চলমান
রাজপথে লড়াকু বীর শেখ মুজিব পাহাড় সমান।
রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ, ফরমান করে জারী
শেখ সাহেবের ইচ্ছায় “ আমার সোনার বাংলা” গানটাই
প্রতিবাদী সভার সূচণাকারী।
সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে
সর্ব দলীয় রাজনৈতিক সম্মেলন কুঞ্জে
শেখ মুজিব পেশ করলেন ঐতিহাসিক ছয় দফা
যাকে বলা হয় বাঙ্গালির মুক্তির সনদ, বাংলার ম্যাগনা কার্টা।
বাঙ্গালির ন্যায্য অধিকার হরনে যত অপতৎপরতা
স্বৈরাচারী পশ্চিমা সরকার দেয় মিথ্যা আগরতলা যড়যণ্ত্র মামলা।
ঊনসত্তোরের গণঅভ্যূত্থানে আইয়ুবশাহী হয়ে ভয়ে দিশেহারা
গোল টেবিল বৈঠকের ছলে প্যারোলে মুক্তির দেয় ইশারা
শর্তারোপিত মুক্তি শেখ মুজিব করে ঘৃনা ভরে প্রত্যাখান
জনরোষে বাধ্য হয়ে মামলা প্রত্যাহারে দেয় নিঃর্শত মুক্তিদান।
ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান দশ লক্ষ জনসমাবেশে পূর্ণ, বিশাল তার পরিধি
বাঙ্গালি জাতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ভালবেসে দেয় বঙ্গবন্ধু উপাধি।
ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে দিলেন নির্দেশ
ঘোষনা করলেন বাঙ্গালির স্বাধীন ভূ-খন্ডের নাম শুধুমাত্র বাংলাদেশ।
সত্তোরের নির্বাচনে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয় জনগন
নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা বঙ্গবন্ধুর দল করে অর্জন।
গদি আকঁড়ে রাখতে পাশার দান দেয় উল্টে
ভুট্টোর পরামর্শে ইয়াহিয়ার ছদ্দবেশ যায় পাল্টে।
জাতীয় পরিষদের বৈঠক করে স্থগিত
জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে রহিত।
বাঙ্গালির রক্তের স্রোত বহে বাংলার রাস্তা ঘাটে
ধৈর্যের বাঁধ যায় ভেঙ্গে,দেওয়ালে পিঠ যায় ঠেকে।
সাতই মার্চের ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে অনুধাবন করে বাঙ্গালির বাসনা

বজ্রকন্ঠে তর্জনী উচিঁয়ে বঙ্গবন্ধু দেয় জাতির মুক্তির ঘোষণা।
“ সাত কোটি বাঙ্গালিরে দাবায়ে রাখতে পারবা না,
রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরোও দেবো
এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ”।
পঁচিশে মার্চ কালো রাত্রিতে, ঝাপিয়ে পড়ে পাকিস্থানী হায়না
ঘুমন্ত বাঙ্গালিরের বুক থেকে ঝড়ায় রক্তের বন্যা।
ছাব্বিশে মার্চ প্রথম প্রহরে ইপিআরের ওয়ারলেস বার্তায়
দেশবাসী হয় আশ্বস্থ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনায়।
“যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে করো যুদ্ধ
শত্রুর প্রতিরোধে ঘরে ঘরে গড়ে তোল দুর্গ”।
যবে নাহি হবে সর্বশেষ পাকিস্থানী সৈন্য, এদেশ হতে নিষ্ক্রান্ত
চালাবে যুদ্ধ, করতে শত্রূকে পরাস্ত, চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত।
পরাধীনতার শেকল কাটার চুড়ান্ত লক্ষ্যে, রাজনীতি তাঁর প্রকাশ্যে
ছিল না বিশ্বাস গোপন , পলায়নপর মনোবৃত্তে।
মুক্তিযুদ্ধকে না করতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
নিজ বাসভুমে বীরের মত গ্রেফতার হন বাঙ্গলির মহাজন।
সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি, বঙ্গবন্ধুর শেষ বার্তার নির্দেশে
মুক্তিযুদ্ধে বাংলার কৃষক,শ্রমিক, ছাত্র লড়াই করে অসীম সাহসে।
বঙ্গবন্ধুর নামে করে শপথ,সাঁড়াশী আক্রমন চালায়, ধরতে বিজয় রথ
মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমনে অবরূদ্ধ হয় পাকিস্থানী সৈন্যের চলার পথ।
প্রবাসী সরকার মুজিবনগরে সুসম্পন্ন করে শপথ অনুষ্ঠান
বিশ্বসম্প্রদায়ের পায় সমর্থন, আকাশবাণী গায় মুক্তিযুদ্ধের জয়গান
উজ্জীবিত মুক্তিবাহিনীর ত্রিমূখী আক্রমন হয়ে উঠে বেগবান।
দীর্ঘ নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের রক্ত ক্ষরণ শেষে
জেনারেল নিয়াজী আত্নসমর্পণ করে রেসকোর্স ময়দানে এসে।
মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে দেয় রায়, বিচারের নামে করে প্রহসন
ফয়সালাবাদ সেলের পাশে কবর খোঁড়ে, প্রাণে জাগাতে ভয়ানক শিহরণ।
দেখে দৃঢ়চিত্তে বঙ্গবন্ধু হেসে কয়
আমি বাঙ্গালি, আমি মুসলমান, আমি মানুষ
একবার মরে , দুইবার কভু নয়।
আন্তর্জাতিক চাপে করে নতি স্বীকার
বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দানে বাধ্য হয় পাকিস্থানী সরকার।
স্বদেশ যাত্রার মাঝে দিল্লী এয়ারপোর্ট
ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারে রাখেন অনুরোধ।
শ্রীমতি ইন্দীরা গান্ধী ও তাঁর জনগনের প্রতি জানান আন্তরিক কৃতজ্ঞতা
বাংলার মানুষকে ভালবাসা বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা
বাঙ্গালিকে প্রাণাধিক ভালবাসা ছিল তাঁর দুর্বলতা।
অবশেষে হলো, অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রার অবসান
প্রতীক্ষায় থাকা জনগণ কে দেখতে,
ঢাকা বিমানবন্দর হতে সোজা গেলেন রেসকোর্স ময়দান।
অশ্রুভেজা কন্ঠে বললেন, বন্দি হওয়ার পূর্বে আমার বাঙ্গালি দিয়েছে রক্ত
কারাবন্দী অবস্থায় নয় মাস করেছে মুক্তিযুদ্ধ
আমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় বাঙ্গালি আজ বিজয়ী বীর অনিরূদ্ধ।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে স্বাধীনতা পায় পূর্নতা
ধ্বংসস্তুপের বাংলায় করে প্রত্যয়, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা।
হাজার বছরের পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে
বাঙ্গালি কে এনে দিলো মুক্তির স্বাধীনতা
সভ্যতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা নাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের জাতির পিতা।

আপনার মতামত দিন