ভ্রমণ: ট্রেন ভ্রমণ

জোবায়ের বাপ্পি

তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। নতুন বছরে নতুন বই। এ এক অন্যরকম ভালো লাগা। তিনটা বই পেয়েছিলাম। বাংলা,ইংরেজী,গণিত। বাংলা বইয়ের সবগুলো পাতা ভালো ভাবে উলটপালট করে দেখছিলাম। হঠাত্ কবি শামসুর রহমনের ট্রেন কবিতাটি বানান করতে করতে পড়ে ফেলি।
ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে অই
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?

কি এই ট্রেন?ট্রেনের বাড়ি কোথায়?ছোট্টবেলায় এমন প্রশ্ন আর এমন ভাবনাই ছিলো। তারপর ইচ্ছেটিতেই থেকে গেলো কয়েক বছর।
এবার দাদাদের দেশে যাবো ভারতের কলকাতায় যাবো। তারপর…

আরামদায়ক শীতের সকাল। সূর্যের মিষ্টি আলোয় ভিজে যাচ্ছি আমি। জীবনের প্রথম ট্রেন এ ওঠা তাও আবার বর্ডার পার হয়ে। ইমিগ্রেশনের কাজ শেরে পেট্রাপোল থেকে ছুটে চলেছি বনগাঁ রেলওয়েস্টেশনে।
২০রুপি দিয়ে টিকিট কেটে বসে পড়ি ট্রেনে। ট্রেন চলেছে বনগাঁ থেকে শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে।

কিছুক্ষণ যেতে দেখলাম যাত্রীদের উপচে পড়া ভীড়। ইদে বাড়ি ফেরা ছাড়া আমার দেশে ট্রেন গুলোতে এমন ভীড় লক্ষ্য করা যায় না এবং তা কখনো নজরেও আসে নি।

এই পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি না।
ট্রেন চলেছে তার নিজ গন্তব্যে,
মাইলের পর মাইল, অক্লান্ত দুর্বার গতিতে।

আমি জানালার কাছে একটি আসন নিয়ে বসেছি। ট্রেন চলছে..দৃষ্টি তখন সীমানা ছাড়িয়ে, আমার শৈশব তখন ট্রেনের জানালায় এসে ভীড় করছে, হাত বাড়ালেই যে ছুঁয়ে ফেলতে পারি তাকে।
যা হোক, আস্তে আস্তে ট্রেনের ভিতরের পরিবেশ আরো অস্থির হয়ে ওঠলো।

আমি বিরক্তবোধ করছিলাম।

মহিলা, বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে অনেকে। উঠে যে তাঁদের বসতে দিবো তারও কোনো উপায় নেই। আমাদের মতো তারা আবার বসার জন্য এতো ব্যাকুল হয়েও নেই।
অন্যান্য অনেকে যারা সহজে দাঁড়িয়ে তাদের বসতে দিতে পারতেন, তারাও তা করছেন না। এটাই তাদের প্রতিদিনকার নিয়ম।

আমার দেশ তো এমন নয়,গর্ব হচ্ছে আমার।

আমার পাশে বসেছেন একজন। বয়স প্রায় সত্তোরের কাছাকাছি হবে। চুলগুলো বড় বড়, চুলের রঙগুলো দেখতে সাদা কাশফুলের মতো। ট্রেন চলছে। শত শত গাছপালা, বাড়িঘর, ফসলি জমি সব পেছনে চলে যাচ্ছে।

মানুষ প্রতিটা স্টেশনে উঠছে, নামছে। ট্রেনে ওঠা ছোটখাটো যুদ্ধ এখানে। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি জানালার বাহিরে তাকিয়ে আছি। বনগাঁ স্টেশনে হতে শিয়ালদহ পর্যন্ত যেতে সর্বমোট ২৩ টা স্টেশন পেরুতে হয়। আমি শুরু থেকেই মুখস্ত করতে থাকি।

বনগাঁ জংশন, ঠাকুরনগর,
গোবরডাঙা, কুঠিবাড়ী, মছলন্দপুর,
সংহতি,হাবড়া,অশোকনগর,­গুমা,বিড়া,দত্তপুকুর,­বামুনগাছি, বারাসত, হৃদয়পুর, মধ্যমবিলাম,নিউ বারাকপুর,বিসরপাড়া,বি­রাটি,দূর্গানগর,দমদম ক্যান্টনমেন্ট,দমদম জংশন, বিধান নগর, শিয়ালদহ

তারপর আমি শিয়ালদহ থেকে ট্যাক্সি করে ছুটে চলি ইকবালপুরের দিকে।

আপনার মতামত দিন