মতামতঃ তিক্ত হলেও বাস্তব কথা !

রাফিজ উদ্দিন

সংস্কৃতি একটি সমাজের নির্ধারক। আর এ সংস্কৃতি যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে সমাজে টিকে থাকাই কঠিন।
অনেকের কাছে হয়তো খারাপ লাগবে যা বলতে যাচ্ছি। কিন্তু ভাবুন ভুল বলছি কিনা। আমাদের এ সমাজ নষ্ট এক সমাজ যেখানে কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেলে বাকীরা সেলফি তোলে, মৃতের পকেটে খুঁজে বেড়ায় টাকা ছিল কিনা কিংবা ফোনটা আত্মসাৎ করে প্রথমে। এ সমাজে এখন বেশিরভাগই আত্মকেন্দ্রিক। প্রতিবেশীর না খেয়ে থাকা আর কাউকে নাড়া দেয় না। নিজের খাওয়া ও ছবি আপ্লোড করাতেই চরম সুখ।

বাবা-মায়েরা সন্তানকে নিয়ে ভাবেন না। তারা ভাবেন নিজেদের নিয়ে। কীভাবে? তারা সন্তান কী খেলো, কী পরলো আর কী পড়লো নিয়ে ভাবেন। কেননা সমাজে নিজের মাথাটা উঁচু রাখতে হবে। ঠাট বজায় রাখতে হবে। ভাবীদের সাথে বলতে হবে, আমার জামাই আমাকে এত্তো ভালোবাসে। কেননা সে আমাকে অমুক জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যায়। এতো হাজার টাকার শাড়ি গিফটায়, তমুক দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়। সন্তানদের ঠাট বজায় রাখার প্রশিক্ষণ দেওয়া চলে, অন্যের সন্তানের কী আছে তা আমার সন্তানেরও থাকতে হবে। অন্যের সন্তানের চেয়ে বেশি জিপিএ আমার সন্তানের পেতে হবে। সেটা বৈধ না অবৈধ উপায়ে হবে তা মাথাব্যথার কারণে নেই।
সেদিন এ সমাজের সবচেয়ে ক্ষতি করা হয়েছে যেদিন আমাদের সংস্কৃতিকে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:
– অনুকরণ প্রিয় সংস্কৃতির কোন নিজস্বতা থাকে না। আর যার নিজস্বতা নেই সে আত্মঘাতী। ভালো কিছু নয়, বরং পশ্চিমের সকল নষ্টামি অনুসরণের লক্ষ যখন তখন এ সমাজ টিকটিকির গর্তে ঢুকার আগ পর্যন্ত থামবে না।
– প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। একে তো পরীক্ষায় নম্বরপ্রাপ্তিই শিক্ষার মূলে হয়ে গেছে, আর পিতামাতাই প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। গত কয়েক বছর আমরা তা দেখেছি।
– সন্তানকে অভাব বুঝতে না দিয়ে যা চায় তাই দেওয়ায় তাকে পার্মানেন্টলি নষ্ট করে দিচ্ছেন অনেক বাবা-মায়েরা। “তুমি এ প্লাস পেলে আইফোন কিনে দিবো।” একটি কমন আশ্বাস। কথা হলো, এরপর একে একে অন্য আশাও পূরণ করতে করতে একটা সময় এমন আশা এসে দাঁড়াবে যা আপনি পূরণ করতে পারবেন না আর আপনার সন্তানও সহ্য করতে পারবে না। ফলত, যা ঘটার তা পত্রিকা খুললেই দেখতে পারবেন প্রায়ই। “বাইক কেনার টাকা না পেয়ে বাবাকে পুড়িয়ে হত্যা” একটা শিরোনাম দেখেছিলাম বছর দুয়েক আগে।
– সন্তানকে তার খায়েশ পূরণের সব আয়োজন করে দিয়ে বলছেন, “এই বয়সে একটু অমন করতেই পারে।” এরপর আপনার বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার সময় হলে আবার বলবেন এ কথা আশা করি। সন্তান নষ্ট হলেও আপনার ভাবোদয় হবে না। সে অশ্লীলতা দেখবে, প্রেম করবে (প্রেম নয় কোনো পাপ যারা বিশ্বাস করেন তা আরেকটু ভাবেন), খারাপ পোশাক পরবে, বাজে ছেলেদের সাথে মিশবে, আপনার মনে হবে, “এই বয়সে একটু অমন করতেই পারে”?
– আসবেন কার্টুনে? একটা নির্দিষ্ট মূল্যবোধ সেখানে এঁটে দেওয়া আছে। তা প্রমোট করতে প্রস্তুত প্রতিটা বিনোদন মেশিন অটল উদ্দেশ্যে। আপনি সরল। ফলাফল, আপনার সন্তানকে আপনি ধর্মের কথা শেখাতে পারবেন না। নামাজ-কালাম তো নস্যি! আপনার কথার গুরুত্বই দিবে না। কেননা কার্টুনগুলো শেখাচ্ছেও- বাবা-মা তোমাকে বোঝে না। “বন্ধুউউউ বোঝে আমাকে।”
– আপনার মেয়ে স্কুলে নাচছে আইটেম গানের সাথে। আপনি খুশি। জানেন না “তু চিজ বারি হে মাস্তো মাস্তো” মানে কী। জানেন না আপনার ছোট্ট মেয়েটিকে কেউ যৌনতার দিকে আহবান করছে। আর সে এটাতে নাচছে। হ্যাঁ! তাই বলছে। আপনি ভাববারই প্রয়োজন বোধ করেননি পর্নোগ্রাফি আসক্ত যুবকগুলো চোখ ঠিকরে আপনার মেয়ের নাচ দেখছে। এরপর? জানেন তো- দুই বছরের আয়েশা মনিকেও ধর্ষণ করছে পার্ভার্ট কেউ। আর আলো আধারি, সংক্ষিপ্ত পোশাক পরা দেহব্যবসায়ীদের নাচের অনুকরণ করলে আল্লাহ না করুক আরো অনেক কিছুই হতে পারে।
– আপনি গান শুনবেন। রবীন্দ্র নজরুল ভালো লাগবে। আপনার সন্তান শুনবে এবং/অথবা ইউটিউবে রিকোমেন্ডেশনে আসা “ভেভো” যেখানে মাদক গ্রহণ, পর্নোগ্রাফি, সেক্সুয়ালিটি ইত্যাদিকে ডালভাত করা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে।
– আপনি কিছু যৌনকর্মী ও তাদের খদ্দেরদের সেলিব্রিটি ভাবছেন। আপনার সন্তানও তাই ভাববে। এটুকুই নয়, তারা ওদের অনুকরণ করবে। একই কাজ “for the sake of curiosity” করবে। পৃথিবীর তাবৎ বিনোদন জগতের আইডল হচ্ছে হলিউড এখন। আর সেগুলোকে খোলা যৌনতার বাজার ওরফে পতিতালয় বললে ভুল হবে?
– সোশাল মিডিয়ায় খুললাম খোলা ক্রমাগত ছবি আপলোডের মাধ্যমে বিপরীত লিঙ্গের চোখের চাহিদা কি মেটায় আপনার সন্তান, নাকি এমনিতেই দে্ নাকি নিজের সম্পর্কে একটু যাচাই করে নেয়- উদ্দেশ্যটা নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছেন কখনো? শরীর উন্মুক্ত করা ফ্যাশন মডেলরা আবার তার আইডল হলে চিন্তা করা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে তারাই পথের ওপ্রান্তে। এদিকে পার্ভার্টদের নষ্ট চোখ আপনার মেয়েকে দেখে জুড়ায় না। তারা চায় আরো কিছু দেখতে। আরো এগোতে। কামনা-বাসনা তো এমনই।
– পরিবার ভেঙে দেওয়া পুঁজিবাদের অনেক বড় প্রজেক্ট। এই ফ্যামিলি সার্ভিসগুলো নিয়েই পুঁজিবাদ এরপর ব্যবসা করবে। শুরুও করে দিয়েছে তারা। বিয়ের উদ্দেশ্যই ছিল একটা আদর্শ পরিবার গঠন। যৌনতার সুস্থতার পূর্ণতা বিয়েতেই। অথচ অসুস্থ যৌনতার সকল প্রজেক্ট হাতে হাতে বিলানো ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে পুঁজিবাদ। লোনা পানির সাগরে প্রজন্মকে ফেলা হয়েছে মিঠা পানির অভাব পূরণ করতে।
– আপনার সন্তান ক্রমাগত শেখানো আইডিয়া নিয়ে বড় হচ্ছে। না, পজিটিভ পরিবর্তনের আইডিয়া না। নিজেকে অন্যের চোখে আকর্ষণীয় করার আইডিয়া (নার্সিসিজম), যাকিছু ভোগের সব দরকার (ভোগবাদ) যা কামনা-বাসনার দাস বানিয়ে দিচ্ছে প্রজন্মকে।
– খাদ্যে ভেজাল, দুর্নীতি, মিথ্যা বলা, যৌনতা, রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে চলা এখন সমাজের স্মারক।
– ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, টাকার জন্য অন্ধ হয়ে যাওয়া, খ্যাতির মোহে লজ্জাটাও হারিয়ে ফেলা এখন সমাজের চিহ্ন।
– সমাজে এখন ভালো মানুষকে ইতোমধ্যেই জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। আপনি কয়জন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম বলতে পারেন যারা পৃথিবীকে বদলেছে? কয়জন? এই করোনাকালেও তো আমাদের চিন্তার দরকার ছিল কারা সমাজের সবচেয়ে মনে রাখার মতো ব্যক্তিত্ব হওয়া উচিত। অথচ সে জায়গায় রেখেছি আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রী আর খেলোয়ারদের নাম! দেখুন দেদারসে আসে মুখে। কাকে মনে রাখছেন? চরিত্রের বালাই না থাকা কোনো ছাইপাশকে? সন্তানের মধ্যে ভালো আশা করাটা তবে একটু বেশিই।
কামনা-বাসনা যখন কারো প্রভু হয়ে যায়, তার বিবেকবোধ, চিন্তার ক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা লোপ পায়। এমন এক মানসিক বৈকল্য এখন ভাইরাল যে তা থেকে সমাজকে বাঁচানোর মিশনই লক্ষ্য হতে হবে। নইলে আপনি না বাঁচাতে পারছেন নিজেকে, না আপনার পরিবারকে। তাই ‘থু’ দিতে হবে শয়তানের ফিসফিসানিকে।
কাদের সাথে আপনার সন্তানকে মিশতে দিচ্ছেন। আপনিই বা কাদের সাথে ঠাট বজায় রেখে নিজের সন্তানকে সে ছাঁচে গড়ছে এটা খুব জরুরি। পরিবর্তিত এ সমাজে প্যারেন্টিং খুব চিন্তাভাবনা করে করতে হবে। আল্লাহর কাছে দু’আ করতে হবে। নিজেকে বদলাতে হবে। আশপাশ বদলাতে হবে।

আপনার মতামত দিন