মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল

চাকার পকেট যখন ফাঁকা

এম এইচ ইমন 

“হাওয়ার ওপর চলে গাড়ি
লাগে না পেট্রোল ডিজেল 
মানুষ একটা দুই চাকার
    ‘সাইকেল’।’
এই গান মতে, মানুষ যদি সাইকেল হয় তাহলে আমার দেয়া নামখানা ভুল হওয়ার কথা নয়। আমি অবশ্য জ্ঞানী নয়,তবে জ্ঞানপিপাসু।
আমার পাশের বাসার এক বড় ভাই আছেন।চাকরির কারণে এখন দেশের বাহিরে।সম্পর্কে বড় আম্মুর ছেলে হলেও প্রতিবেশী। রক্তের কোন সম্পর্ক নেই তারপরও অনুসরণ করি।নাম মিঠু ভাইয়া।
ছোটবেলা সকালে যখন মাদ্রাসায় যেতাম তখন ভাইয়া চাকরি করতে সাইকেল নিয়ে বের হতেন।আমি ভাবতাম বেতন কম তাই হয়তো।মায়ের থেকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি এনজিওতে চাকরি করেন,হাদিয়া ভাল পান।তাহলে সাইকেল?
 ‘সচেতনতা এবং সময় বাঁচাতে  তিনি এই কাজ করতেন।’
পুরো বিশ্বটা আজ করোনার হাতে বন্দী। করোনার আজব এক খেলা,করে দিল সবাইকে সচেতন ওয়ালা। তারপরও কি আমরা সচেতন হতে পেরেছি?
অবশ্যই পেরেছি।রাস্তার মোড়ে মোড়ে সাবান পানির ব্যবস্থা,ঘরে ঢুকেই পরিচ্ছন্ন হওয়া এসব বড় এক ধরণের সচেতনতা।
মানুষের এই ঘরবন্দী সময়কে প্রফুল্ল করতে সকালবেলা শোনা যায় পাখির কিচিরমিচির ডাক।চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যখন টিভির সামনে বসি তখন দেখা যায় প্রকৃতি তার নতুন নতুন শাখা খুলেছে,যেখানে ডানা মেলে উড়ে আসছে হাজার হাজার অতিথি পাখি।সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে লুকোচুরি খেলতে ব্যস্ত ডলফিন,তীরের বালিতে কাঁকড়া আঁকছে নিত্য নতুন শিল্প।স্বাদ সকালের চায়ের চুমুকে এসব দেখতে কতই না ভাল লাগে।
আচ্ছা পরিবেশটা যদি সর্বদা এমন থাকে তাহলে কি খুব মন্দ হয়?
অবশ্যই না।
আমরা সর্বদা আমাদের চারপাশের পরিবেশকে সজীব রাখতে চায়,কিন্তু পারি না।আমাদের ছোট ছোট কিছু ভুল একবারে স্বপ্নগুলো স্বপ্নই রেখে দেয়।তবে আমি বিশ্বাস করি আমরা চাইলে পারব,কেননা রক্তের বিনিময়ে যদি মুখের ভাষা আর পায়ের নিচের মাটি চিনিয়ে পারি তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কি এত কঠিন কিছু?
করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে অর্থ সংকট আর বেকারত্ব।বিশেষজ্ঞরা বলছেন আরও ১০লক্ষ লোক বেকার হতে পারেন। অর্থের সমস্যা যতই থাকুক না কেন,খরচের খাতা কি আর বন্ধ হয়? উল্টো নিরাপত্তার খাতিরে এখন ভাড়া বেড়েছে।আমি বলছি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং পরিবহন সেবার কথা।
ক্রেতা সব সময় অফার খুঁজে আর বিক্রেতা চায় বেশি বিক্রি করে লাভবান হতে।তবে এখানে আমি নিজেও ক্রেতা।বিক্রেতা আমার দেশ। আজকে আমি আপনাদের কাছে একটি বাম্পার অফারের কথা বলছি,আশা করি বুঝতে পেরেছেন-
 ‘সচেতনতা’।
শুধু সচেতনতা নয় শরীরের ব্যায়াম,গাড়ী ভাড়ার সঞ্চয়, জ্যামের দুশ্চিন্তা, ট্রাফিক পুলিশের মামলা,তেলের খরচ,বাসের ফাঁকা সিট,কালো ধোয়ার বিষাক্ত দূষণ এসব কিছুর সমাধান।
বলব?
নাম তার ‘সাইকেল’।
আপনারা হয়তো জানেন,সাইকেল এমন একটি বাহন  যার কোন তেল লাগে না,নেই কোন মামলা,ট্রাফিক জ্যামেও বসে থাকতে হয় না,শরীরের ব্যায়াম সুনিশ্চিত।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে একজন মেডিসিন ও বাতরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বলেছেন-
সবচেয়ে উত্তম ব্যায়াম হাটা এবং তারপরে সাইক্লিং। সাইকেল চালালে শরীরে অক্সিজেনের সঞ্চালন বাড়ে,যার ফলে পেশি গঠন সহ শরীরের কিছু সন্ধি বা জোড়া সুস্থ রাখে সে সাথে শরীরের চর্বিও কমায়।মন থাকে প্রফুল্ল।
বন্ধুদের সবার বাইক আছে? অফিসের কলিগরা কি বলবে? আমি তো মেয়ে! এমনিতেই টাকা নাই তারওপর সাইকেল পাব কয়?
ক্রমান্বয়ে নিচ থেকে উপরে যাচ্ছি।
আপনারা ইতিমধ্যে শুনেছেন হয়তো পরিবহন ভাড়া ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।অর্থাৎ আগের তুলনায় এখন বেশি ভাড়া গুনতে হবে।ধরে নিলাম ২০০০-৮০০০/= টাকা।
নিজের গাড়ি আছে।তাহলে চলুন তেল হিসেব করি।প্রতিমাসে ধরে নিলাম ৩০০০-৮০০০/= তবে এখানে ড্রাইভার,সার্ভিস চার্জ,মামলা এবং পার্কিং চার্জ যুক্ত হবে।
ব্যায়াম করতে জিম ভাড়া এবং প্রশিক্ষকের টিউশন ফি ধরে নিলাম ১০০০-৫০০০/= টাকা।
এসবের সাথে আরেকটি চরম অফার হচ্ছে অযথা সময় নষ্ট।জ্যামে পড়লে বাস ছেড়ে দিবে এই চিন্তায় নামতে ইচ্ছে করে না,বাসে বসে কোন কাজও করতে ইচ্ছে করে না।যার কারণে শুধু সময়ই নষ্ট হয়।
একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘সময়’।প্রবাদে পড়েছি- ‘সময় এবং নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না’ আবার এটাও পড়েছি ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’।
এখন পরিশ্রমের সকল সময় যায় রাস্তার জ্যামে।বাংলাদেশের সাইকেল বিষয়ক একটি সংগঠন ‘বিডিসাইক্লিস্ট’ ২৫০ জনের ওপর একটি জরিপ করে দেখেছেন যে,যারা সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করেন প্রতিদিন তাদের কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় বাঁচে।  একবার ভেবে দেখুন এই সময় কি না করা যায়?
একটি বই,ওভারটাইম, পরিবারকে একটু বাড়তি সময় ইত্যাদি।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পিছনে গাড়ির এই কালো ধোঁয়ার অবদান আছে বেশ।তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলা শুরু হয়েছে।বাংলাদেশ নিম্নভূমির একটি দেশ।কৃষিকাজ আর মৎস চাষই আমাদের জীবনের উৎস।
২০১৮ সাল বিআরটিসির পরিসংখ্যান মতে,শুধু ঢাকায় ৮,৫৩,৫০৪টি যানবাহন চলাচল করে।একবার ভাবুন এসব কি পরিবেশ দূষণ করে না?
অবশ্যই করে।পরিবেশ দূষণের দিক থেকে ঢাকা বৈশ্বিক তালিকায় দিল্লির পড়ে। এই দূষণ কি আমরা কমাতে পারি না?
অবশ্যই পারি।শুধু দরকার একটু সচেতনতা।
বাসার থেকে কম টাকা নিয়ে কে না জীবন সংগ্রাম করতে চায়? মাস শেষে পরিবার আর সন্তানের জন্য সামান্য অর্থ কে না সঞ্চয় করতে চায়? পছন্দের জামা,পছন্দের পণ্য অন্যের কাছে চলে যায় এই টাকার অভাবে।এই টাকাই তো থাকে না!
আচ্ছা আমরা যদি সাইকেল ব্যবহার করি তাহলে উপরের যে হিসাব করেছি সেখান থেকে কিন্তু অনেক টাকা বেঁচে যাবে,তা কি ভেবে দেখেছেন?
অনেক সময় বন্ধুরা বিভিন্ন দিকে ঘুড়তে যায়।টাকার অভাবে আমাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।গুগলের সার্চ আর বন্ধুদের টামলাইনে ওয়াও আর লাভ রিয়েক্ট ছাড়া কিছুই দেয়ার থাকে না।মনের মধ্যে থেকে যায় তৃষ্ণার অনুশোচনা।
জেনে আশ্চর্য হবেন যে,চট্রগ্রামের ছেলে তাম্মাত বিন খায়ের সাইকেল নিয়ে দেশের ৬৪টি জেলা ঘুড়েছেন।এতো শুধু দেশের কথা।বাংলাদেশের আরেক কৃতি সন্তান সাইক্লিস্ট আশরাফুজ্জামান ১৮ বছরে ৬টি উপমহাদেশের ৫৪টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।
কি আশ্চর্য হয়েছেন? যেখানে আমরা বিমান নিয়ে ঘুড়ব ভেবে পাশের জেলায় যেতে পারিনি সেখানে তিনি ৫৪টি দেশ জুড়ে ফেলেছেন!
হুম,ভেবে দেখুন তো একবার কোন দূষণ আর বাড়তি খরচ ছাড়া।
টিভি,পত্রিকা,বিজ্ঞাপন বোর্ডে কত রকম লোনের বিজ্ঞাপন দেখেছি,কখনো কি সাইকেল কিনতে লোন দেয়ার বিজ্ঞাপন দেখেছেন? আমি অবশ্য দেখিনি।আপনারা জানলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।তবে আমাদের দেশে এখন অ্যাপস ভিত্তিক সাইকেল ভাড়া দেয় ‘জো বাইক’।
আজ পর্যন্ত কখনো কি বাইক,কার,বাস,বিমান দিবস চোখে পড়েছে? তবে ৩রা জুন বিশ্ব সাইকেল দিবস যা জাতিসংঘ কতৃক ঘোষিত।সাইকেল দিবসের তাৎপর্য হিসেবে জাতিসংঘ বর্ণনা করেছেন-
“ভাল যাহা দুনিয়ার”
কানাডা,যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য একেকটি উন্নত দেশ।আমরা তাদের মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমরা এটাও জানি তাদের দেশের বসবাসরত মানুষগুলোও সচেতন।আমরাও চাইলে পারি সচেতন হতে।অন্যের দিকে না তাকিয়ে আমি না হয় প্রথম শুরু করি।আপনার দেখাদেখি আরও অনেকে শুরু করবে।
নিজের দেহকে সুস্থ রাখতে,সময় বাঁচাতে, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে,অর্থনৈতিক চাপ কমাতে,প্রকৃতির সৌন্দর্য ধরে রাখতে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে সাইকেলের বিকল্প নেই।তাই চলুন গণপরিবহন বাদ দিয়ে আমরা সকলে সাইকেল ব্যবহারে জোড় দি।
সচেতনতা নিজের কাছে,প্রয়োজন আর নিরাপত্তা নিজের কাছেই।
#make_a_plan_to_change_the_world

আপনার মতামত দিন