মানুষ যা বিশ্বাস করে তাই হয়ে যায় : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আমি একটা উদাহরণ দেই, প্রেরণা দিয়ে কী হয়? পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত ১৮টা সভ্যতা এসেছে। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সভ্যতা হলো গ্রিক সভ্যতা। গ্রিক সভ্যতা যাদের হাতে সম্পূর্ণতা পেয়ে সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছে তারা ছিলো এথেন্সের কিছু মানুষ। এই এথেন্সের জনসংখ্যা ছিলো তিন লাখ। তার মধ্যে এক লাখ ছিলো ক্রীতদাস। তাদের না ছিলো কোনো ভোটাধিকার, না ছিলো কোনো কথা বলার সুযোগ। তাহলে থাকলো কত? দুই লাখ। দুই লাখের ভেতরে অর্ধেক নারী। গ্রিকরা বিশ্বাস করতো, নারীদের আত্মা নেই। সুতরাং তাদের কোনো কথা নয়। সুতরাং থাকলো এক লাখ। এক লাখের ভেতরে যদি শিশুকিশোর এগুলো বাদ দেওয়া হয় তাহলে আর বাকি থাকলো ৫০ হাজার। সুতরাং দেখা যাচ্ছে তিন লাখ মানুষ শ্রেষ্ঠ সভ্যতাকে তৈরি করেছিলো।
কী দিয়ে? প্রেরণা দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে এবং তারা বিশ্বাস করতো, আমরা পারবোই। যখন পিলক্রিস এথেন্স শাসন করতো তখন এথেন্সের ছেলেরা যারা ১৮ বছরে উত্তীর্ণ হতো, তাদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে সবার সামনে হাত উঁচু করে প্রতিজ্ঞা করতে হতো! আমি জন্মের সময় যে এথেন্সকে পেয়েছি, আমি সারা জীবন এমন কাজ করবো, যাতে আমার মৃত্যুর সময় পৃথিবীতে অনেক উচ্চতম এথেন্সকে রেখে যেতে পারবো। এটাই হচ্ছে প্রেরণা। ওই যে একবার জ্বলে উঠলো মানুষ, এই জ্বলা মশাল হয়ে ঘুরতে থাকবে। সেজন্য প্রেরণাটা দরকার। আমরা এখন সবার কাছে হতাশার কথা শুনি, হতাশ হয়ে লাভটা কি? হতাশ হয়ে কি তোমার আয়ু বাড়বে। হতাশ হয়ে তুমি কি কিছু পাবে? তুমি কি অসাধ্য কিছু করতে পারবে? তাহলে কিসের হতাশা? ভুল হোক, মিথ্যা হোক, আসুন আমরা আশাতে বিশ্বাস করি।
শিক্ষার ব্যাপারে আজকে আমাদের দেশে, একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, প্রত্যেকে আজকে শিক্ষার কথা বলে, কেন আজকে শিক্ষার কথা এতোটা ভাবে? কারণ মানুষ টের পেয়ে গেছে শিক্ষার মাধ্যমে মুক্তি। সকাল বেলায় যখন সেই ভোরের শিকারি এসে দাঁড়ায় আমাদের পুব দিগন্তে এবং তার হাতের সেই উজ্জ্বল বর্শা মেরে অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে দেয়, তেমনি শিক্ষা অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে দেয়। শিক্ষা মানে জীবন, শিক্ষা মানে মুক্তি, শিক্ষা মানে স্বপ্ন, শিক্ষা মানে আমাদের বিকাশ। সবাই আজকে স্কুলমুখী। কেবল আজ কবিতার মতো করে যদি বলতে হয়, তাহলে বলতে হবে, শিক্ষার সোনার খাঁচাটা তৈরি হয়েছে। এখন এর মধ্যে গানের পাখিটা এসে বসাতে হবে। গানের পাখি মানে কী? উন্নত শিক্ষা। যে শিক্ষা দিয়ে আমাদের চলছে, সেই শিক্ষা দিয়ে আর চলবে না। সুন্দর একটা কোটেশন, যে কোটেশন চীনা ভাষায়। ওখানে বলা হচ্ছেÑ ‘যদি এক বছরের জন্য পরিকল্পনা করো, তাহলে ধান লাগিও। যদি ত্রিশ বছরের জন্য পরিকল্পনা করো তাহলে গাছ লাগিও, আর যদি ১০০ বছরের জন্য পরিকল্পনা করো তাহলে মানুষ বপন করো।’
তোমরা টমাস আলভা এডিসনের নাম জানো সবাই। ওনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, আপনি জীবনে কতগুলো ভুল করেছিলেন! উনি বলেছিলেন ১০ হাজার। ১০ হাজার! তাহলে তো আপনার মাথায় বুদ্ধিই নেই! দেখা যায়। তো ১০ হাজার বার যে ভুল করলেন, এতে কি আপনার কোনো উপকার হয়েছে? উনি বলেন যে, হ্যাঁ হয়েছে! কী হয়েছে? ১০ হাজার নতুন বুদ্ধি আমার মাথায় এসেছে। এবং সেই বুদ্ধি দিয়ে আমি নতুন নতুন কাজ করেছি। তাই এতো আবিষ্কার হয়েছে। সুতরাং ভুল করো, কাজ করো, আক্রমণ করো জীবনকে। দাঁড়িয়ে থেকো না। পালিয়ে যেও না। আরেকটা কথা হচ্ছে, যা কিছুই করো সম্পূর্ণ জীবন দিয়ে করবে। মন-প্রাণ ভালোবাসা দিয়ে করবে। একটা উদাহরণ দেই, একজন দার্শনিক তার ছাত্রকে বহুভাবে দর্শন বোঝানোর চেষ্টা করেন। ছাত্র কিছু কিছু বুঝে আর কিছু এদিক-ওদিক তাকিয়ে থাকে। কিছুতেই তার মন পুরোপুরি দর্শনে আসে না। তখন সেই দার্শনিক ঠিক করলেন ওকে, ওর মনটাকে দর্শনের ভেতরে ঢুকাবেন। তো একদিন বললো চলো সমুদ্রের ধারে গিয়ে ঘুরে আসি। বা সমুদ্র স্নান করে আসি। তো দুজন গেছেন সমুদ্রে। গিয়ে কিছু দূর নামার পরে। তো হঠাৎ দার্শনিক, তার ছাত্রের মাথা ধরে পানির নিচে চেপে ধরে রাখলো। তো যখন যায় যায় অবস্থা তখন উঠিয়ে দার্শনিক বললো, যখন মাথা পানির নিচে চেপে ধরে রেখেছিলাম তখন তুমি কি চেয়েছিলে? তখন ছাত্র বলল, বাতাস চেয়েছিলাম বাতাস। ঠিক যেভাবে বাতাস চেয়েছিলে ঠিক সেইভাবেই দর্শনকে চাও। তাহলে তুমি দার্শনিক হবে। তো তোমরাও যা হতে চাও, কেউ অর্থহীন কিছুই হতে চাও না, এমনও তো অনেকে থাকতে পারে, যেমন আমি জীবনে কিছুই হতে চাইনি। কিন্তু কিছুও যে হতে চাই না, সেটাও সিরিয়াসলি হওয়া উচিত। তো যেটাই করবে সেটা পরিপূর্ণ মনোযোগ দিয়ে, শক্তি দিয়ে করবে। যদিও পড়োই তাহলে কি হওয়ার জন্য পড়ছো, লাস্ট হওয়ার জন্য নাকি ফার্স্ট হওয়ার জন্য। বিশ্বাস করো। মানুষ যা বিশ্বাস করে তা হয়ে যায়।

*২৩ অক্টোবর ২০১৮ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে অদম্য মেধাবী পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্য থেকে অনুলিখন : মুজিবুল হক