মা দিবস : প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মোহাম্মদ মাসুদ

“মা”—ক্ষুদ্র শব্দগুলির একটি। কিন্তু এর অনুভূতি-শক্তি কতটা শক্তিশালী তা সকলেরই প্রত্যক্ষ থাকার কথা। তারপরও এই শব্দটি আরো তাৎপর্য সহ বুঝতে হলে পড়তে হবে— ম্যাক্সিম গোর্কির— ‘মা’, শওকত ওসমানের— ‘জননী’ অথবা আনিসুল হকের— ‘মা’ উপন্যাস। মা’রা কতটা ত্যাগীর মূলমন্ত্র জানে তা এসব উপন্যাসে স্পষ্ট।
সভ্যতার বিবর্তনে মানব জাতি কিছু দিবস উদ্ যাপন করার প্রচলন শুরু করে। বিশ্বব্যাপী একটা পর্যায়ে আসে ‘মা’ দিবস। এর ইতিহাস খুঁজতে গেলে পাওয়া যায়— কিছু ইতিহাসবেত্তার মতে, মা-কে নিয়ে এই দিবসটি প্রাচীন গ্রিসের মাতৃ আরাধনার রীতি বা প্রথা থেকে যাত্রা শুরু হয়। একটি উৎসব গ্রিক দেবতাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট দেবী সিবেলের উদ্দেশে পালন করা হত। এশিয়া মাইনরে মহাবিষ্ণু-এর সময়েও এমন একটি উৎসব পালন করা হত বলে অনুমান করা হয়। এদিকে প্রাচীন রোমানদের ‘ম্যাত্রোনালিয়া’ নামে দেবী জুনোর প্রতি উৎসর্গিত আরও একটি বিশেষ দিন বা ছুটির দিনের কথাও উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই দিনটিতে মায়েদের বিভিন্ন ধরনের উপহার দেওয়া হত।
মাদারিং সানডের মতো ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে পালিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছিল যা খ্রিস্টানদের অ্যাংগ্লিকানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পঞ্জিকায় উল্লেখ করা রয়েছে। সেসময় সেখানে মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে আলাদা করে রাখা হত।
ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এটিকে বলা হয় লেতারে সানডে, যা কিনা লালেন্টের সময়ে চতুর্থ রবিবার পালন করা হয় ভার্জিন মেরি বা কুমারী মাতার সম্মানে। সোজা কথায় বলা যায়, খ্রিস্টানদের ক্যাথলিক ধর্মে এই দিবসটি বিশেষভাবে ভার্জিন মেরি বা কুমারী মাতার পূজায় উৎসর্গিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে সনাতন ধর্মে এই দিবসটিকে ‘মাতা তীর্থ আনুসি’ বা ‘এক পক্ষকালব্যাপী মাতৃ তীর্থযাত্রা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের আনা জার্ভিসের উদ্যোগে প্রথম মা দিবস পালিত হয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে তার মা’র মতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সব মাকে স্বীকৃতি দিতে আনা জার্ভিস প্রচার শুরু করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার সাত বছরের চেষ্টায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায় মা দিবস। ১৯১১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যে মা দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
সারাবিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এখন মার্চ, এপ্রিল বা মে মাসেই বিশ্ব মা দিবস পালন করা হয়।
আমরাও বিশ্ব মা দিবস পালন করি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আমরা মাকে স্মরণ করে একগাদা কথা লিখে এবং মায়ের সঙ্গে নিজের যুক্ত থাকা একটি ছবি যোগ করে সকলকে জানিয়ে দেই— ‘মা তোমায় ভালোবাসি’। কিন্তু সে ভালোবাসার গভীরতায় আমরা প্রবেশ করিনা, করতে চেষ্টা করিনা। প্রতিটি সন্তানেরও উচিত মা-কে নিরাপদে রাখা অবশ্যই আমৃত্যু পর্যন্ত। কারণ এই সন্তানই একটা সময় মায়ের কোলে নিরাপদ থাকে। কিন্তু মাকে নিয়ে— গভীর রাতে জঙ্গলে ফেলে আসার, রাস্তায় ফেলে রাখার, বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসার সহ নানান হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা চোখের সামনে ভাসতেও দেখি। সত্য কঠিন হলেও স্বীকার করতে হবে যে, দিন দিন জাতি যত আধুনিক হচ্ছে ততই তাদের মানবিকতার অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ কেন যেন, প্রাগৈতিহাসিকের দিকে দাবিত হচ্ছে!
আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, আমাদের মানুষ হতে হবে। কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে মানবিকতা। মা নিজ সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনা। সে মাকে কেন আমরা একটু ভালো রাখার চেষ্টা করবো না! কেন আমরা পারিনা মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে নিজ ঘরকে প্রতিষ্ঠা করতে! দিনশেষে কয়টা মা-ই আত্মতৃপ্তির শ্বাস নিয়ে ঘুমোতে পারে! এই হিসেবগুলো আমাদের করতে হবে— যদি আমরা নিজেদের সভ্য জাতি হিসেবে মনে করি।
কথাগুলি আমরা কথা হিসেবেই নিলে কালো কালিই মনে হবে। কিন্তু না এসব উপলব্ধি করতে হবে। মা-কে লোক দেখানোর সম্মানের ঘোর থেকে বের করে দেখতে হবে। প্রতিটি বছর ‘মা দিবস’ এসে আমাদের লজ্জা দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়— মায়ের জন্য একটি দিন নয়। প্রতিটি দিনই মা-কে আদর করার, সম্মান করার ও ভালোবাসার। আসুন মাকে ভালোবাসার চর্চা করি, ভালো রাখার চেষ্টা করি।

লেখক: উপাধ্যক্ষ, এ এম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ

আপনার মতামত দিন