মেঘনা নদীর পাড়ে

মুহিব্বুল্লাহ কাফি

আর কদিন পরই পরীক্ষা শেষ। ছুটি। আট-দশদিন। এবারের ছুটিটা একটু অন্য আঙ্গিকে ভাবা দরকার। কোথাও যাওয়া দরকার। দূরে। বহুদূরে নয়। কিছু দূরে। কিন্তু যাব কোথায়? কোন সে দূরে। আচ্ছা কী দিয়ে যাব? বাসে না ট্রেনে? যদি বাসে যাই তাহলে কোথায় যাওয়া যেতে পারে? বেশি দূরে নয়। কাছাকাছি। বেড়ানোর সময়সীমা দু-তিনদিন। কারণ ছুটিটা বাবা-মার সঙ্গেও ভাগাভাগি করা দরকার।
আর যদি ট্রেনে যাই তাহলে যাব কোথায়? সিলেট,কক্সবাজার,রাঙামাটি, কুয়াকাটা? আরে না না! এত দূরে না। সফরের প্রাসঙ্গিক নিয়ে একরাতে সহপাঠীদের সঙ্গে চলছে সরস আলোচনা। কিন্তু মীমাংসা আসছে না।শুধু বৈঠক দীর্ঘায়ু হচ্ছে। হঠাৎ কাউসার ভাই বলে বসলেন, এবার নৌপথে যাওয়া যেতে পারে। লঞ্চে। আকস্মিক এ ধরনের প্রস্তাব পেয়ে আমি ও শরীফ ভাই এক পায়ে খাড়া। হুম, আমি যাব। কোনোদিন লঞ্চে চড়িনি। এক সুরে বললাম আমরা দুজন। কাউসার ও শরীফ ভাই শহরের স্থানীয় বাসিন্দা হলেও আমি না। তবে শৈশবের কিছুসময় মফস্বলে কাটালেও শৈশবের বাকি সময়, পুরো কৈশোর ও তারুণ্যের বর্তমান সময়ে শহরেই আছি। তাই শৈশবস্মৃতি বেশি একটা মনে আনতে পারি না।
যাক সে কথা।
তো, কোথায় যাব। কাছাকাছি কোনো পর্যটনকেন্দ্র আছি কি! আচ্ছা যাব কোন লঞ্চে। কখন চড়ব, দিনে না তারে? এসব একগাদা অস্থির প্রশ্ন ছুড়তে থাকি আমরা একে অপরকে। তবে রাতে যাওয়ার ওপর স্থির হই।
আমাদের কথা শোনে মজলিসেই ফয়সাল ভাই বলে উঠলেন,আমাদের বাড়ি যাওয়া যেতে পারে। তার এ কথায় স্থির মজলিস। আমাদের নজর এখন তার দিকে। আমরা যেন তার এ বুলির অপেক্ষা-ই ছিলাম। জানি না তার এ আহবান আমাদের কথনের কারণে করতে বাধ্য করেছিল কি না! কারণ তিনি জানতেন, তার বাড়ি যে চাঁদপুর তা আমরা ভালো করেই জানি।
সে যাইহোক, আমরা রাজি হয়ে গেলাম। যাব চাঁদপুর। ফয়সাল ভাইদের বাড়ি। সবচেয়ে বড় কথা যাব লঞ্চে। কাছে দূরে এখন ফারাক নেই। ফয়সাল ভাইয়ের বাবা আমাদের জামিআর স্টাফ। তাকে যখন জানানো হল তিনি যারপরনাই খুশি হলেন। বললেন,তোমরা আমাদের বাড়ি গেলে ভালোই হবে। শুনলাম তোমরা নাকি লঞ্চে কখনো চড়নি। এবার চড়বে, কোনো ভয় নেই। তিনি জানতেন আমরা শহরে বেড়ে ওঠা ছেলেপেলে। তাই তিনি আমাদের অভয় দিয়ে স্বাগতম জানালেন তাদের বাড়ি যাওয়ার এরাদাকে। তিনি অত্যন্ত সৌম-শান্ত লোক। যা স্বতঃস্ফূর্ত ফুটে ওঠে তার চেহারায়। কিন্তু ফয়সাল ভাইকে দেখে হিসেব মেলে না!
আমাদের সংলাপ শোনে মিজান ভাই ও মোহাম্মদুল্লাহ ভাই সফরে সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলেন। মিজান ভাই কোনো এক সম্পর্কের টানে এর আগে এক-দুবার চাঁদপুর ফয়সাল ভাইদের বাড়ির মেহমান হয়েছেন। মোহাম্মদুল্লাহ ভাইও আগে কখনো লঞ্চে উঠেননি। তাই তিনিও বিস্ময় প্রকাশ করলেন এবং সফরের সঙ্গী হবেন।
দুই
পরীক্ষা শেষ সকাল দশটার ভেতর। সবাই নাড়ির টানে মাতৃছায়ার আশ্রয়ে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি,নিজান কাউসার শরীফ ফয়সাল ও মোহামদুল্লাহ ভাই; আমাদের প্রস্তুতি চাঁদপুরের লক্ষ্যে। যে যার মতন কিছু কেনাকাটা সেরে নিলাম। লঞ্চ ছাড়বে সাড়ে দশটায়। পৌঁছাবে ভোরে। সারারাত লঞ্চে। ভাবতেই অন্যরকম লাগছে।
ফয়সাল ভাইয়ের বাবা একদিন আগে চলে গেলেন। কাউসার ভাই পরে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন বলে তাকে রেখেই আমরা পাঁচজন আসর পড়ে বাসে চেপে বসি। যাব সদরঘাট। শহরের যানজটের কথা মাথায় রেখেই একটু আগেভাগে বের হলাম। আমাদের আমির মোহাম্মদ ভাই।
গাড়ি চলছে। থামছে। চলছে। আবার থামছে। এবার আর সচল হয় না গাড়ির চাকা। থেমে আছে। থেমেই আছে। বেশ বড়সড় একটা ঘুম দিয়ে এবার চলছে গাড়ি। এভাবে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বাস থামল বাংলাবাজারের মোড়ে। রাত নয়টায়। তবু এভেবে স্বস্তি পেলাম যে, বিশাল জ্যামের সাগর পাড়ি তো দিয়েছি!
ফয়সাল ভাই আমাদের এক লঞ্চের সামনে দাঁড় করালেন। নাম তাকওয়া। একলোক দাঁড়িয়ে ডাকছে। চাঁদপুর, হাইমচর, আরো কী কী জানি। হুম, আমরা চাঁদপুর হয়ে হাইমচর যাব। উঠলাম তাকওয়ায়। লোকদের ভিড় ঠেলে। তবে ভেতরে এত লোক নেই যা বাইরে থেকে ভেবেছিলাম। রাত দশটা। আর আধঘন্টা পর ছাড়বে লঞ্চ। কিন্তু কাউসার ভাইয়ের কোনো খবর নেই। ফোন ধরছেন না। সবাই চিন্তিত। বিরক্ত। একে-অপরকে বলছি এ ছেলে সবসময়ই দেড়ি করে। একটু ঢেলা। ছেলেটার কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছু নেই। খানিক বাদে সদরঘাট ছাড়বে লঞ্চ কিন্তু তার আসার খবর নেই। আমাদের এ কথোপকথনের মধ্যেই সহসা হাজির হন আমাদের বিলম্ব ব্যক্তি। কাউসার ভাই। হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিতে চাইলেন আমাদের বিরক্তির ছাপকে। সফলও হলেন। আমরা তাকে অন্য এক নামে সম্বোধন করি। থাক, এখানে তা না-ই বললাম।
আমির সাহেব তথা মোহাম্মদুল্লাহ ভাই ও ফয়সাল ভাই কী ভেবে যেন লঞ্চের দোতলায় ঢালাও বিছানা নিলেন। অবশ্য আমাদেরও সম্মতি নিয়েছেন। আমি ছিলাম নিমরাজি। তবুও বাকিরা যেদিকে আমিও সেদিকে ঝুঁকলাম। এখানে দেখি মানুষের গুমগুম। এত মানুষ এলো কোত্থেকে। ও…সস্তা বলে কথা।
বেশ শীত। কিন্তু কিছুই আনিনি। আমরা যতটুকু জায়গা পেলাম একটা চাদর বিছিয়ে বসে পড়লাম। আমরা ছজন। সঙ্গে ইসমাঈল। ফয়সাল ভাইদের পড়শি। একই প্রতিষ্ঠানে পড়ায় একসঙ্গে বাড়ি ফেরা আর কি।
লঞ্চ ছেড়েছে। আস্তে আস্তে সদরঘাট, পোস্তগোলা ব্রিজ দূরে যেতে লাগল কিংবা আমাদের লঞ্চ এগুলো থেকে অদৃশ্য হতে লাগল। ধীরে ধীরে শীত জেঁকে আসছে। কনকনে। লঞ্চের ভেতর থেকে বাইরে আসলেই কাঁপিয়ে দিচ্ছে হাঁড়। হু হু আর দুহাতের তালুর ঘষাঘষির শব্দ ভেসে আসছে সবার থেকে। লঞ্চের সামনে কিছু জায়গায় নামাজের জন্য বরাদ্দ করা আছে। গেলাম নামাজ আদায় করতে। দাঁড়িয়েছি নামাজে। চেহারা-হাত-পা উন্মুক্ত থাকায় তীব্র বাতাস আর কুয়াশার আলতো স্পর্শের মধ্যে কোনো পর্দা নেই। ঠাণ্ডায় হাত-পা কাঁপছে। নামাজে তাকবির গুলোও ঠিকমতো মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না। কেমন যানি নিথর হয়ে যাচ্ছিলাম। নামাজ শেষ হতেই ছুটি লঞ্চের ভেতর। হু হু শব্দ করতে করতে। বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শীতের রাতকে উপভোগ করার ইচ্ছে ছিল। ইচ্ছে ছিল ছাদে ওঠে দুহাত দুদিকে প্রসারিত করে জোরে জোরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ব। অবলোকন করব চারপাশ। মন জানতে চাচ্ছিল কেমন দেখতে রাতের সমুদ্র বা নদী। কেমন তার ঢেউ। কেমন তার উথাল পাথাল কিংবা স্থিরতা। কেমন দেখতে রাতের সমুদ্রের ওপর তারা ভরা খোলা আকাশ। তা আর হল কোথায়! যে শীত ঘুরাফেরা করছে বাইরে, তাতে আর কেউ না হোক আমি যাচ্ছি না ছাদে। কিছুক্ষণ থাকলে নির্ঘাত মারা পড়ব। সাহসে কুলালো না। তাই সবার সঙ্গে দৌড়ে গেলাম নিজ আসনে। কিছুক্ষণ বসে রইলাম। নাক বরাবর মাথার ওপর চলছে টেলিভিশন। চারদিক ভোমরের মতন ভুঁ ভুঁ আওয়াজ। এ আওয়াজের ভেতরই অনেকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে টেলিভিশনের দিকে। বুড়ো থেকে যুবক শিশু সবাই। মাঝে মধ্যে খিলখিল করে হেসে ওঠে। কিন্তু আমার ভালো লাগছে না। কিছুক্ষণ বসে শুয়ে পড়লাম ব্যাগ মাথায় দিয়ে। ঘুম আসছে না। আসবে কীভাবে? একে তো মানুষের ঠেষাঠেষি ও ক্যাঁচরম্যাচর তার ওপর শীতের উৎপাত। আর বাজার জমানোর আওয়াজ তো আছেই। কিছুসময় একাত ওকাত করলাম। ঘুম আর বসল না আমার চোখে।
কখন যে মিজান ভাই ও মোহাম্মদুল্লাহ ভাই লঞ্চের ছাদে গেলেন লক্ষই করিনি। এখন তারা ছাদ থেকে ফিরে আসলেন। চেহারায় তৃপ্তির আভাস ভাসছে। হয়ত ছাদে বেশ আনন্দ উপভোগ করেছেন। এসে বলছেনও তা। আমি উৎসাহ পেলাম। সাহস পেলাম। আত্মবিশ্বাস যোগালাম। না! এবার যাওয়া যেতে পারে। শরীফ ভাইকে ইঙ্গিত দিলাম। তিনি অন্য এক সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধ হচ্ছিলেন। আমার ডাকে তার ঘোর ভাঙল। তিনি সম্মতি দিলেন।
গেলাম ছাদে। দুজন। আতঙ্ক ও উদগ্রীব নিয়ে। ভালো করে চেহারা রোমালে বেঁধে। যেন শীত আমার ব্যগ্রতা ভেঙে না দেয়। ছাদে অনেক মানুষ। সবাই দূরে কোন লক্ষ্যে যানি দৃষ্টি ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও ছুড়লাম দৃষ্টি। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না অন্ধকার ছাড়া। কেউ বসে আছে। কেউ আছে শুয়ে। আড্ডা দিচ্ছে। ফোনে কথা বলছে। আর শীতে আমার দাঁত লেগে যাচ্ছে। ভেবে পাই না তারা কীভাবে এখান দাঁড়িয়ে-শুয়ে-বসে আছে। আরে! একজন দেখি উদলা গায়ে বসে আছে। তাকে দেখে আমার চোখ ওপরে ওঠে গেল।  কীভাবে সম্ভব।
শরীফ ভাই ভালো করে রোমাল বাঁধছেন চেহারা খোলা রেখে। দেখতে বেশ লাগছে। বললেন,কাফি ভাই আমি গেলাম। চলে গেলেন। তার সেজেগুজে দ্রুত চলে যাওয়ার রহস্য পরে আমার কাজে উন্মোচন হয়ে ছিল।
আমি দাঁড়িয়ে আছি। দুহাতে গ্রিল চেপে সামনের দিকে তাকিয়ে। একঝাঁক শীতল বাতাস আমার চেহারায় এসে বসছে। কষ্ট হচ্ছে তবে ভালো লাগছে। মাঝে মধ্যে এক-দুটি লঞ্চ দেখা যায়। আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। তাকিয়ে বিশাল এ নদীর কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাই না। ওপরে শুধু জ্বলে ওঠা তারার মিতালি দেখা যায় আকাশে। হয়ত কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে সব। হঠাৎ মনে ওঠলো হুমায়ূন আহমেদের হিমুর কথা। হিমু তো লঞ্চে চড়ার অনুভূতি জানানোর জন্য ফোন করেছিল রুপাকে। রাতের বিশাল  আকাশের নিচে সমতল পানির ওপর চড়ার কথা শুনে রুপাও চমকে ছিল। আমিও ফোনটা হাতে নিলাম। কিন্তু আমার তো কোনো রুপা নেই। নেই কোনো চুলে খোঁপা বাঁধা সঙ্গী, যার কাছে বলব,আমার লঞ্চের রাত্রি বিলাস অপূর্ব লাগছে। ম্লান আলোয় নিজকে হারিয়ে ফেলেছি এ জেঁকে বসা শীতের মাঝেও। কিন্তু আমার যে কেউ নেই। তাই ব্যর্থ মনে ফোন পকেটে পুরে নিলাম। এতক্ষণে ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে গেছি। শরীর বরফ হয়ে আসছিল। দৌড়ে নিচে চলে আসলাম।
অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিস্তব্ধতা ছেয়ে আসছে। আমার সঙ্গীরাও ঘুমের ঘরে কাউসার ভাই ও শরীফ ভাই ব্যতীত। তারা অন্য এক নেশায় বিভোর। কোন এক মিথ্যা স্বপ্নের হাতছানির আশায় আছেন তারা। তাহলে এ নেশাই ছিল শরীফ ভাই ছাদ গিয়ে সেজেগুজে আসার ছুতো। মনে মনে একগাল হেসে নিলাম। আর কাউসার ভাই তো আছেই। তিনি কম কিসে। তাদের সঙ্গী হওয়ার জো না পেয়ে নিজেকে এলিয়ে দিলাম বিছানো চাদরে।
তিন
যখন চোখ খুললাম, দেখি লঞ্চ ঘাটে দাঁড়িয়ে। অনেকে নামছে। লঞ্চ এখন অনেকটাই খালি। কাউসার ভাই ও শরীফ ভাই তো জেগে আছেই অন্যরাও আমার মতন আড়মোড়া ভাঙছে। হন্তদন্ত হয়ে ফয়সাল ভাইকে জিজ্ঞেসা করলে তিনি জানান এর পরের ঘাট হল হাইমচর। শেষ ঘাট। এবং ওটাই তাদের বাড়ির ঘাট। কাউসার ভাই ও শরীফ ভাইকে দেখে মনে হল, সারারাত ঘুমকে জয় করার যে বিজয় উল্লাস তাদের ভেতর ছিল,তা যেন তাদের পরাজিত করে নেমে যাচ্ছে এ ঘাটে। লঞ্চ আবার ভাসছে। আমরা সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে। তারা দুজন যেন নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সদ্য ছেড়ে আসা ঘাটে। আমি গলা খাঁকারি দিতেই তাদের সংবিৎ ফরে আসে।
ফজরের আজান ভেসে আসছে। লঞ্চও ততক্ষণে তার শেষ গন্তব্যে এসে দাঁড়িয়েছে। ওই তো দেখা যায় ফয়সাল ভাইয়ের বাবাকে। চাচাকে দেখে আমরা হাত শূন্যে উঠিয়ে নাড়ালাম। তিনি দেখে এগিয়ে এসে আমাদের স্বাগত জানালেন। নামলাম আমরা। হাঁটছি। চাচার পিছু পিছু। তিনি সবার আগে। রাহবার। পাঁচ-ছ মিনিট খেতের ঘোঁজপথ ধরে হেঁটে হেঁটে ঘরে পৌঁছালাম। গাঁয়ের একটু ভেতরে। কোনো আড়ম্বর নেই। সাদাসিধে দুটি টিনশেড দাঁড় করানো। একটি থাকার অন্যটি রান্নার। থাকার ঘরটি পুব পশ্চিম হয়ে লম্বা দাঁড়ানো। ভেতরে তিনটি কামরা। আমরা উঠলাম পশ্চিম কামরায়। চৌকাঠের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি পেঁপেগাছ। একটু দূরে বরইগাছ। খাটো। কিন্তু ঝাঁক বেঁধে আছে চুকা বরই। আরেকটু দূরে রান্নাঘরের পাশে কিছু সবজি লাগানো। হয়ত কাঁচাবাজার করতে বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন খুব কম হয়। আরো দূরে দক্ষিণ পশ্চিমে একটি পুকুর। যেন নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে। আটপৌরে মনে হয় না। গোসল করার উপযোগীও না। কচুরিপানা ভরপুর। তার পাশেই উত্তরপশ্চিমে শৌচাগার।
নামাজ আদায় করে সবাই একসঙ্গে বসে আছি। সূর্য এখনো জাগেনি। এমন সময় ফয়সাল ভাইয়ের বাবা এক জগ তাজা খেজুররস নিয়ে হাজির। এ প্রথম তাজা খেজুররসে চুমুক দিলাম। তৃপ্তি ভরে পান করলাম। আমরা আসব বলে তিনি একসপ্তাহ আগে বলে রেখেছেন রসঅলাকে। না হয় রস পাওয়ার জো নেই। একরাশ চাহিদা। আহা! সেই রস এখনো মুখে লেগে আছে। শরীফ,কাউসার ও মোহাম্মদুল্লাহ ভাই পশ্চিম রুমে আমি ফয়সাল ও মিজান ভাই মাঝ রুমে শুয়ে পড়লাম। পুব রুমটা চাচা-চাচীর। ফয়সাল ভাইয়েরা তিনভাই এক বোন। ফয়সাল ভাই বড়। মেঝ ভাই কাতারে থাকেন। আমরা আসব বলে ছোটভাই ও বোন নানার বাড়িতে। তাই বাড়িটা খালি। অবশ্য আমাদের আগমনে বাড়ি যেন প্রানবন্ত হল।
ঘুম না আসায় কিছুক্ষণ একাত ওকাত করে ওঠে বসি। মিজান ভাই নেই। বাকিরা ঘুমের ঘরে। আমি ঘর থেকে রেব হতেই দেখি মিজান ভাই রান্নাঘরে। ফয়সাল ভাইয়ের মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন। মা ছেলের মতন। পরে মনে পড়ল মিজান ভাই তো এর আগেও এক-দুবার এসেছেন। তাই তিনি একটু বেশি পরিচিত আমাদের তোলনায়।
সূর্য হালকা উঁকি মারতেই বাকিদের উঠিয়ে খেজুররসের ফিন্নি নিয়ে হাজির ফয়সাল ভাইয়ের বাবা। তিনি আমাদের নিয়ে খুব চিন্তিত। তারও খানিক বাদে খানা পরিবেশন। কতরকমের খাবার। প্রতিবারই ইলিশ ছিল। লোকটা অতিথিপরায়ণ। তার আতিথেয়তা মুগ্ধ করেছে আমাদের। খেয়ে আমার ঘুম।
মোহাম্মদুল্লাহ ভাইয়ের বাড়ি থেকে জরুরি তলব আসায় আজ রাতই লঞ্চে উঠতে চান তিনি। সকালে এসে রাতে চলে যাবেন বলে ফয়সাল ভাইয়ের মা-বাবা কিছুতেই যেতে দিচ্ছিলেন না। কিন্তু খুব জরুরি তাই যেতেই হবে। আসরের পর আমরা মোহাম্মদুল্লাহ ভাইকে এগিয়ে দিতে লঞ্চ ঘাটে আসি। লঞ্চটা বেশ বড়। আগেরটা তোলনায়। আমাদের ঈর্ষা হল। ইশ! আমরা যদি এ লঞ্চে যেতে পারতাম। সম্ভবত বোগদাদি হবে। ঠিক মনে আসছে না। বাজারে ঘোরাঘুরি করে রাত দশটায় মোহাম্মদ ভাইকে বিদায় দিয়ে চলে আসলাম।
চার
ফজর পড়ে গাঁ দেখানোর জন্য ফয়সাল ভাই আমাদের নিয়ে বের হলেন। হাঁটছি। শীত লাগছে। ভলোও লাগছে। বেশি দূর দেখা যায় না। কুয়াশায় সব ঘেরা। আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। দুপাশে শাড়ি শাড়ি নাম না জানা কত ধরনের গাছ। দেখতে সুন্দর লাগছে। রাস্তায় তাকালে মনে হয় একটু দূরে রাত নেমেছে। কুয়াশায় আবছা আবছা দেখা যায়। আমরা হাঁটছি। কাউসার ভায়ের কিছু কার্যকলাপ আমাদের বিনোদন যোগাচ্ছে। সূর্য ভয়ে ভয়ে উঁকি দিচ্ছে। কুয়াশাকে হারিয়ে সূর্যের কিরণ পড়ছে আমাদের ওপর। হালকা মিষ্টি রোদ। হাঁটতে হাঁটতে বাজার হয়ে নদীর পাড়। মেঘনা নদী। পানি থই থই। ওই দেখা যায় চর উঠেছে। আমার প্রবল ইচ্ছে থাকলেও অন্যদের অনাগ্রহে যাওয়া হয়নি চরে। নদীর পাড়ে শাড়ি-শাড়ি বড় বড় পাথর। বসলাম তার ওপর। নদী ও তার ঢেউ দেখতে ভালো লাগছে। নদী আমাদের আনন্দের কারণ বুঝতে পেরে আনন্দটাকে দ্বিগুণ করতে ঢেউ দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভালো লাগছে। মনে হল মেহমানদের আপ্যায়ন করতে শেখেছে। ভিজিয়ে দিয়ে। নদীও আমাদের চিনতে ভুল করেনি বলে ফিক করে হেসে দিলাম। অন্যরাও। কিন্তু ফয়সাল ভাই শোনালেন অন্য সুর। বিষাদের গান। এ ঢেউ-ই নাকি মাঝে মধ্যে ফোঁসে ওঠে। তলিয়ে দেয় ঘরবাড়ি। বেশিদিন হয়নি কয়েকবছর আগেও ভাসিয়ে দিয়ে ছিল তাদের ঘরবাড়ি। যা এখনো আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয়া এই ঢেউয়ের নিচে। ভিটামাটি আর ভাসেনি। আজও তলিয়ে আছে।
ফয়সাল ভাইয়ের কথা শোনে চুপসে গেলাম আমরা। তার দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি তাকিয়ে আছেন নিষ্ঠুর ঢেউয়ের দিকে। নীরবতা ঘিরে ধরল আমাদের। তাকে প্রবোধ দিলাম। নদীর ঢেউ-ও যেন লজ্জা পেয়ে থমকে আছে। নীরবতা ভেঙে আমরা বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। ততক্ষণে সূর্য হেসে উঠেছে।
খানা খেয়ে একটু আরাম করছি। কথা উঠল পুকুর নিয়ে। মাছ ধরব। চাচাকে জানানো হল। তিনি মাছ নেই বলে আমাদের প্রস্তাব নাকচ করলেন। পরে আমাদের মলিন চেহারা দেখে রাজি হলেন। আমাদের চেহারায় মলিনতা কেটে আনন্দ খেলে গেল। ঘর থেকে ঝাঁকিজাল বের করলেন। আমরাও প্রস্তুত। ভাব দেখে মনে হল আমরা জাত জেলে। পুকুরে নামলাম। আমি কাউসার ও শরীফ ভাই। নামলেন চাচাও। কচুরিপানা উঠালাম। চাচা ঝাঁকি দিয়ে ঝাঁকিজাল নিক্ষেপ করলেন শান্ত পুকুরে। পুকুর লাফিয়ে উঠল। যেন ঘুম ভাঙল তার। কিছু মাছ মারলেন চাচা। আমরা এতে অখুশি। কারণ, মাছ ধরব আমরা। তিনি কেনো। আমাদের উসখুস বুঝতে পেরে জাল আমাদের দিলেন। ফিরে আসে হাসি আমাদের। ফায়সালা করলাম প্রথম শরীফ ভাই এরপর আমি তারপর কাউসার ভাই জাল নিক্ষেপ করবেন। আমরা কেউ-ই ঝাঁকিজাল দিয়ে মাছ ধরিনি। এ প্রথম ধরব। তাই চাচা আমাদের জাল ধরা শিখিয়ে দিলেন।
শরীফ ভাই চাচার শিখিয়ে দেয়া জাল দুহাতে সাজিয়ে নিক্ষেপ করলেন পুকুরে। জাল ভালোই মেলেছে। আমরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি জাল আঁচড়ে পড়া পানির ওপর। শরীফ ভাই ধীরে ধীরে জাল টানছেন। উঠিয়ে পাড়ে নিয়ে আসলেন। আমরা ঘেরাও দিলাম। টুকরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মিজান ভাই। তিনি পুকুরে নামেননি। ফয়সাল ভাই-ও। জাল বাছাই করে ছোটো দুটো পুঁটি ছাড়া কিছুই পাইনি। আমরা ফিক ফিক হাসছি। শরীফ ভাই লজ্জা কাটিয়ে আমার ও কাউসার ভাইয়ের দিকে কথা ছুড়লেন, দেখা যাবে আপনাদের বেলায় কী ওঠে!
এবার আমার পালা। চাচা সাজিয়ে দিলেন জাল। পুরো রশি আর জালের কিছু অংশ ডানহাতে পেঁচিয়ে ও ডানহাতের কনুইয়ে কিছু জাল আটকিয়ে বাঁহাতে আরো কিছু জাল ধরে ঝাঁকি দিয়ে ছুড়লাম পুকুরে। এলোপাতাড়ি। সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। জাল বেশি মেলেনি। জোরে নিক্ষেপ করায় রশি ছুটে যায় হাত থেকে। হি হি করে হেসে ওঠে সবাই। লজ্জা দমিয়ে লাফ দিয়ে রশি ধরি। আস্তে আস্তে রশি টানি। পানি ঝেড়ে ওঠে আসছে জাল। শরীফ ভাই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছেন। ওই যে মাছ ওই যে মাছ বলে বলে কাউসার ও শরীফ ভাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে হাসতে লাগলেন। জাল বাছা শেষ। একটি পুঁটিমাছও আসেনি। হায় হায় লজ্জা লুকাই কোথায়! ব্যর্থতার হাসি হেসে জাল দিলাম কাউসার ভাইকে। তিনি করলেন আরেক কাণ্ড। জাল পুকুরে ছুড়তে গিয়ে জালসহ তিনিও পুকুরে। হাসি কি আর ধরে রাখা যায়! এবার চাচাও আমাদের সঙ্গে তার হাসি এঁটে দিলেন। কাউসার ভাই পুকুর থেকেই হাঁদা হয়ে তাকিয়ে থাকলেন আমাদের দিকে। শেষমেশ চাচাই আরো কিছু মাছ মেরে চাচীর কাছে নিয়ে গেলেন। রান্নঘরে।
আমরা গেলাম মেঘনাতে। নাইতে। পাড়ে ডিঙি বাঁধা থাকায় আমরা ডিঙিতে ওঠি। সবাই সাঁতার জানলেও জনেন না কাউসার ভাই। পাড়ে পানি কম ভেবে সংকল্প করলাম হাতে হাত ধরে একসঙ্গে ডিঙি থেকে ঝাঁপ দেব। দিলামও ঝাঁপ। হায় হায় ঠাঁই পাচ্ছি না! পানির অতলে যাচ্ছি তো যাচ্ছি-ই। কাউসার ভাইয়ের কথা মনে হতেই কেঁপে উঠল বুক। নিজকে সামলিয়ে কোনোমতে হাতড়ে মাথা ভাসাই। দেখি কাউসার ভাই ডিঙিতেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের সঙ্গে ঝাঁপ দেননি। যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তবে তার ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি দেখে সবাই হাত ও মুখ দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি যে, ভাই ঝাঁপ দিয়েন না। অনেক গভীর। ঠাঁই পাওয়া যায় না। তিনি আমাদের বারণ শুনে ঝাঁপ দেয়া থেকে বিরত থাকলেন। কিন্তু তিনি একগুঁয়ে মানুষ। ঝাঁপ দেবেই। তাই ডিঙির একেবারে সামনে এসে জোরে লাফ দিলেন। আমরা আহ শব্দ শুনলাম। কমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ান তিনি। বুক পানি ভেবে কমড় পানিতে লাফ দিলেন। তাই কমড়ে আঘাত পেয়েছেন। তবু ডুবে মরার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেন বলে আমরা তাকে প্রবোধ দিলাম। না হয় তো আজ লবেজানের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো। এখন ভাবী সেদিন কতবড় দুঃসংবাদ থেকেই না বেঁচে গিয়েছিলাম। আল্লাহ তাআলাই আমাদের বাঁচিয়ে ছিলেন।
পাঁচ
দুপুরে খানা খাওয়া শেষে পিঠা। পিঠা শেষে কচি ডাব। খেয়ে কাইলুল্লা করার জন্য কাত হতেই ঘুমের চাপে তলিয়ে যাই। আজ রাতে লঞ্চে চড়ব। ঢাকার উদ্দেশ্যে। ঘুম ভেঙে আসর পড়ে চাচীর থেকে বিদায় নিয়ে ঢুঁ মারলাম বাজারে। চাঁদপুর ইলিশে বিখ্যাত। কাউসার ভাই ও শরীফ ভাই কিনলেন পাঁচ কেজি করে দশ কেজি ইলিশ। বরফ দিয়ে সুন্দর করে বাজার ব্যাগে সাজিয়ে দিলেন ফয়সাল ভাইয়ের বাবা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান তিনি। ঢাকায় ফেরব আমি কাউসার ভাই ও শরীফ ভাই। মিজান ভাই ছুটি শেষ করে ফয়সাল ভাইয়ের সঙ্গে আসবেন।
লঞ্চ আসল। এবার টিকিট কাটলাম লঞ্চের শৌখিনে। একটু ভালোভাবে যাব। আরামে। রাত দশটায় লঞ্চ নদীতে ভাসিয়ে দিল। ঘাট থেকে হাত নেড়ে বিদায়-সম্ভাষণ জানালেন ফয়সাল ভাই ও মিজান ভাই। ধীরে ধীরে কুয়াশার চাদর তাদের ঢেকে নিল। এবার আর ছাদে বা অলিন্দে দাঁড়িয়ে কুয়াশায় ঘেরা নদীর সাথে আলাপে যায়নি। ইচ্ছেও করেনি। ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে লম্বা এক ঘুম। চোখ খোলে দেখি শৌখিন খালি। আমরা তিনজনই দেদার ঘুমচ্ছি। এভাবেও কি কেউ ঘুমায়! সকাল হয়েছে সে কখন। আড়মোড়া ভেঙে হাত-মুখ ধুয়ে নামলাম লঞ্চ থেকে। সদরঘাটে। হাঁটা দিলাম। যে যার বাড়ির দিকে।
তিনবছর পর যতটুকু মনে পড়েছে স্মৃতির সাগর থেকে হাতড়ে নিয়ে আসলাম। এখন খুব মনে পড়ছে সফরসঙ্গীদের কথা। চাঁদপুর, মেঘনা নদীর কথা। ফয়সাল ভাইয়ের বাব-মা ও তাদেরকে পুকুরের কথা। সহপাঠীদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে ফোনালাপ হলেও দেখা হয় খুব কম। পৃথিবী এমন-ই। শুধু বিচ্ছিন্ন করতে জানে। একত্র করার সুত্র বোধহয় তার ডিকশনারিতে কমই আছে।

আপনার মতামত দিন