ময়মনসিংহের রাজবাড়ি শশী লজের ইতিহাস

তাসনীমুল হাসান মুবিন (১৭), ময়মনসিংহ

শশী লজ বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মহারাজা শশীকান্ত আচার্যের বাড়ি। যা ময়মনসিংহেরর রাজবাড়ী নামেও পরিচিত। শহরের কেন্দ্রস্থলে ব্রক্ষপুত্র নদের অদূরে এই রাজবাড়ী অবস্থিত। ১৯৫২ সাল থেকে শশী লজ ব্যবহূত হচ্ছে মহিলা শিক্ষক পষিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে।

মুক্তাগাছা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উওরপুরুষ রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরীর নি:সন্তান ছিলেন। অথচ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সম্পত্তি সংরক্ষণে সক্ষম একটি পুত্রসন্তান ভীষণভাবে প্রয়োজন।

তাই দওক পুত্র গ্রহণের সিদ্বান্তে উপনীত হলেন তিনি। গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দওক নিলেন রঘুনন্দন। মৃত্যুর আগে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারীর ভার অর্পণ করেন। জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি। সন্তানহীন অবস্থায় অকালপ্রয়াণ ঘটল তাঁরও। গৌরীকান্তের বিধবা পত্নী বিমলা দেবি দওক নিলেন কাশীকান্তকে। কাশীকান্তের কপালও মন্দ ছিল ভীষণ। দীর্ঘ রোগযন্ত্রণায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোকগমন করলেন তিনিও। তাঁর বিধবা পত্নী লক্ষ্ণী দেবী আচার্য চৌধুরানী পূর্বসূরিদের পথে অনুসরণ করে দত্তক নিলেন চন্দ্রকান্তকে।

ভাগ্যের বিরুদ্ধাচরণে চন্দ্রকান্তও ত্যাগ করলেন পৃথিবীর মায়া। তবে হাল ছাড়লেন না লক্ষ্ণী দেবী। পুনরায় দওক নিলেন তিনি। দ্বিতীয় দওক পুএের পূর্বনাম পূর্ণচন্দ্র মজুমদার। কুলগুরুর সামনে মহাসমারোহে লক্ষ্ণী দেবী নতুন পু্ত্রের নাম রাখলেন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।

সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর শাসনামলে ব্রক্ষপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হলো সোনালি মাত্রা। প্রায় ৪১ বছর জমিদারি পরিচালনার প্রশস্ত প্রেক্ষাপটে বহু জনহিতকর কাজ করলেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। ঊনবিংশ শতকের শেষপাদে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রন্থলে ৯ একর ভূমির ওপর একটি আসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করলেন সূর্যকান্ত। নি:সন্তান সূর্যকান্তের দওক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হলো শশীলজ।

বিখ্যাত এই ভবনটি ১৮৯৭ সালের ১২ জুন গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হলে অত্যন্ত ব্যথিত হন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুনভাবে শশী লজ নির্মাণ করেন পরবর্তী জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯১১ সালে শশী লজের সৌন্দর্যবর্ধনে তিনি সম্পন্ন করেন আরও কিছু সংষ্কারকাজ। নবীন জমিদারের প্রাণান্ত প্রয়াসে শশী লজ হয়ে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দর অপরুপ। শশীলজের মূল ফটকে রয়েছে ১৬ টি গম্বুজ।

ভেতরে প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে ছাদ তেকে ঝুলন্ত, প্রায় একই রকম দেখতে, ঝাড়বাতি। সাধারণ বাসভবণ ছাড়াও রাড়িটিতে আছে নাচঘর, স্নানঘর। স্নানঘরে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ। ধারণা করা হয় এই সুড়ঙ্গপথে মুক্তাগাছা যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মূল ভবনের পেছন ভাগেও রয়েছে একটি স্নানঘর। পিছনের স্নানঘরটি দোতলা।

এই স্নানঘরে বসে রানী পাশের পুকুরে হাঁসের খেলা দেখতেন। পুকুরটির ঘাট মার্বেল পাথরে বাঁধানো। শশীলজের মূল ভবনের সামনে রয়েছে বাগান। সেই বাগানের মাঝখানে আছে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা, যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্বল্পবসনা স্নানরতা মর্মর মূর্তি। বাগানের ঠিক পেছনেই লালচে ইট আর হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশী লজ। এর পাশেই রয়েছে পদ্নাবাগান। বাড়িটির আশেপাশে রয়েছে বেশিকিছু দুষ্প্রাপ্য ও প্রচীন গাছগাছালি, আছে দুষ্প্রাপ্য নাগলিঙ্গম বৃক্ষ যা তখন হাতির খাবার হিসিবে ব্যবহৃত হতো।

২০০৩ শালে শশীলজেই ধারণ করা হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও নওয়াজীশ আলী খান পরিচালিত বিখ্যাত ধারাবাহিক নাটক অয়োময় এর পর্বগুলো,যা বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল।
মূলত এই নাটকের পরিচিতির পরেই স্থানীয়দের কাছে বাড়িটি জমিদারবাড়ি হিসেবে পরিচিতি পায়। এছাড়াও রাখাল বন্ধু নামে আরেকটি ধারাবাহিক নাটকের শ্যুটিংও এই রাজবাড়িতে হয়েছিল।