যেভাবে এলো মুক্তাগাছার মন্ডা

তাসনীমুল হাসান মুবিন (১৭), ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহ শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে মুক্তাগাছা। প্রায় ২০০ বছর আগে গোপাল পাল নামে এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখা পান এক সন্ন্যাসীর। তার কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন এক রকম মিষ্টি তৈরির প্রণালি। তিনি এইটাকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করলেন। উত্তরসূরিরাও ধরলেন পূর্বপুরুষের ব্যবসার হাল। চ্যাপ্টা আকৃতির মণ্ডা ছানা ও চিনির রসায়নে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের সন্দেশ।

আজো মুক্তাগাছায় গেলে স্বাদ পাওয়া যেতে পারে এর। মণ্ডার প্রস্তুত প্রণালি কখনই পরিবারের বাইরে যায়নি। মন্ডা কয়েক ধরনের আছে, চিড়ার মন্ডা, দুধের ছানার মন্ডা, খেজুরের গুরের মন্ডা। এমনকি যেখানে এটি তৈরি হয়, তার চৌকাঠ বাড়ির নারীদের পার হওয়াও বারণ।
পূর্বপুরুষদের আদেশ মেনেই নাকি এ রীতি। এমন কিছু উল্লেখযোগ্য দুধের তৈরি মিষ্টি আছে যার কারণে একটি দেশ এবং দেশের ঐ অঞ্চল বিখ্যাত।
যেমন ভারতের দিল্লির লাড্ডু , আলমোড়ার বালামিঠাই , লাল মোহন, রাজভোগ রয়্যাল উল্লেখযোগ্য । তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে আছে মুক্তাগাছার গোপাল পালের মন্ডা , কুমিল্লার রসমালাই, পোড়াবাড়ির চমচম, বগুড়ার দই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি।


মন্ডা নিয়ে একটি কিংবদন্তি রয়েছে । দুই শতাধিক বছর আগে মুক্তাগাছার প্রসিদ্ধ মন্ডার জনক গোপাল পাল এক রাতে স্বপ্নাদিষ্ট হলেন । শিয়রে দাঁড়িয়ে এক ঋষি তাকে আদেশ দিচ্ছেন মন্ডা মিষ্টি তৈরি কর । পরদির গোপাল ঋষির আদেশে চুল্লি খনন শুরু করলেন । দৈবাৎ উদয় হলেন সাধু । তিনি হাত বুলিয়ে দিলেন চুল্লিতে । শিখিয়ে দিলেন মন্ডা তৈরির কলাকৌশল গোপালকে । দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি হলো মন্ডা । গোপাল তার নব উদ্ভাবিত মন্ডা পরিবেশন করলেন তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর রাজদরবারে ।
মন্ডা খেয়ে মহারাজা পেলেন পরম তৃপ্তি , আর বাহবা দিলেন গোপালকে । শুরু হলো মন্ডার যাত্রা । বাংলা ১২০৬ সালে তৎকালীন ভারতবর্ষের মুর্শিদাবাদে গোপাল জন্মগ্রহণ করেন । নবাব সিরাজদৌলার মৃত্যুর পর গোপাল মাতৃভূমি রাজশাহীতে চলে আসেন । পরে বাংলা ১২৩০ সালে তিনি মুক্তাগাছায় বসত গড়েন।
প্রথম মন্ডা তৈরি হয় বাংলা ১২৩১ সালে । মন্ডার মূল উপাদান দুধ ও চিনি । বর্তমানে ছানার মন্ডা ২৫ টাকা পিছ, চিড়ার মন্ডা ২০ টাকা পিছ, খেজুরের গুরের মন্ডা ৩২ টাকা পিস, ২০পিছে এক কেজি মন্ডা হয়।
মন্ডা তৈরির পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয় না । স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরমের সময় ৩/৪ দিন ও শীতকালে ১০/১২ দিন ভালো থাকে ।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সারোদ বাদক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ মন্ডা খেয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন ।
উল্লেখ্য, ময়মনসিংহ শহরে ও মুক্তাগাছার বেশ কিছু দোকানে মন্ডা বিক্রি হয় ।
যা আসল মন্ডা নয় । আসল মন্ডা গোপাল পালের আদি মন্ডা হিসাবে পরিচিত যার কোন শাখা নেই। মুক্তা-গাছার মন্ডা একটি বিখ্যাত খাবার।