রোজনামচা: বৃষ্টিস্নাত প্রাণের হিল্লোল

নকীবুল হক

বুঁদ হয়ে পড়েছিলাম ডাইনামিকসের অঙ্কেে। কখন যে ফ্রান্স আর জার্মানির ফুটবল ম্যাচে জিদানের সমবেগে আমিও গতিশীল হয়ে গেলাম–তা আর খেয়াল করিনি। সম্বিত ফিরে আসে মেঘের ‘গুড়ুম গুড়ুম’ গর্জনে। তটস্থ হয়ে জানালার পর্দাটা একপাশ করতেই বিচলিত হয়ে ওঠে ভোরের অভিপ্রেত মনটা। এ যেন ভোরের আগেই এক অনামিক, অপ্রত্যাশিত, বিষণ্ন সন্ধ্যের আয়োজন৷ অগত্যা বিচলিত মন নিয়ে বসে পড়ি জানালার পাশ ঘেঁষে। নিঃসীম শূন্যতা পেড়িয়ে দৃষ্টি টেকে নীল আকাশের গায়ে। আকাশের রংটা এখন আর নীল নেই। ছায়ার চেয়ে খানিকটা গাঢ় কিংবা ছায়ার চেয়ে খানিকটা হালকা রঙে ছেয়ে গেছে পুরো আকাশ। দূর থেকে ভেসে আসছে বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ। এরইমধ্যে শুরু হয়েছে বৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন ধারা। বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে, ক্রমশ এগিয়ে আসছে এদিকে। দেখতে দেখতেই গাছগুলো দুলে উঠছে। উত্তর-পূর্ব কোণের বেণুবন থেকে একটা বাঁশ এসে ছাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছটার কানে যেন বলে যায় কী কথা। সেই গোপন কথা শুনেই নাকি বৃষ্টি আর বাতাসের সংহত ছোঁয়ায়–কী কারণে যেন আমগাছটাও দুলে উঠে, ফুলে উঠে। কখনো বা পাতাগুলো একপাশ করে দেখিয়ে দেয় কয়েকটা ডাল-পালা। সৈনিকদের মতো সারি সারি দাঁড়ানো সুপারিগাছগুলো যেন সৈনিকদের ‘লেফট-রাইট’র তালে তালে মাথা দুলছে। যেন মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলো শক্ত করে বেণী পাকিয়ে আলগোছে ছুঁয়ে দিচ্ছে এর বেণী ওর গায়ে, ওর বেণী এর গায়ে।
আমি বসে থাকি বিচলিত মন নিয়ে। চেয়ে থাকি। চেয়ে চেয়ে দেখি প্রকৃতির এই ভীমরূপ কিংবা কান্তিরূপ। আস্তে আস্তে নির্লিপ্ততা এসে আমার বিচলিত মনটাকে ক্রমশ গ্রাস করে নেয়। উদাস নয়নে বসে থাকি আমি৷ যেন আমি এখন অন্যমনস্ক। অথবা আমার যেন কোনো মন নেই। কিংবা আমার একটা মন ছিল। এখন সেটা ভাগ হয়ে গেছে দুটো, তিনটে, চারটে কিংবা আরও অনেক ভাগে। যার একেকটা ভাগ একাকার হয়ে মিশে গেছে প্রকৃতির একেকটা ভাঁজে।
ধীরে ধীরে কমে যায় বাতাসের তোড়। বৃষ্টির ধারাও খানিকটা ক্ষীণ হয়ে আসে। কিন্তু পড়তে থাকে অবিরাম, অবিচ্ছিন্ন। আমার নির্লিপ্ততাও যেন কিছুটা কেটে যায়। কিংবা থেকে যায় কিছুটা। অধর ছুঁয়ে দেয় একটি অনামিক বৃষ্টির ফোঁটা। অজান্তেই কেঁপে উঠে ঠোঁট দুটো। শ্রুতিগোচর হয় অস্পষ্ট একটা ধ্বনি-‘এমন দিনে তারে বলা যায়…।’

আপনার মতামত দিন