লেখক-প্রকাশকের ধান্দা

মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম

শুরুতেই বলে নেই আমি সাইনবোর্ডধারী কোনো লেখক কিংবা প্রকাশক নই। তবে লেখালেখি নিয়ে আগ্রহ থাকার কারণে এই শাখা সম্পর্কে বেশ ভালোই জানাশোনা রয়েছে। এই লেখাটি লেখার আগে, লেখক এবং প্রকাশকদের নিয়ে কমপক্ষে ৫টি আর্টিকেল পড়েছি। সেই আর্টিকেলগুলোর ভিত্তিতে নিজের জ্ঞানের উপর নির্ভর করে, এক মহাসমুদ্রের কিছু অংশ নিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছি মাত্র।
আমাদের দেশে পুরো ফেব্রুয়ারী মাসকে কেন্দ্র করে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের খুব অল্প সংখ্যক দেশেই পুরো একমাস ধরে বই মেলার আয়োজন করা হয়। সে হিসেবে আমরা নিজেদের কিছুটা ভাগ্যবান বলে দাবী করতে পারি।
বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, ২০১৮ সালের বইমেলায় সবের্মাট বই প্রকাশিত হয়েছিল ৪৫৯১টি এবং বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সেই হিসেবে বলতেই পারি, বই মেলা উপলক্ষে আমাদের দেশে প্রতিবছর শতশত নতুন লেখকের আবির্ভাব হয়। তারা একবুক আশা নিয়ে তাদের বই লিখে থাকে। প্রকাশকগণ সে বই প্রকাশ করে। প্রকাশক মেলায় স্টল নেয় এবং সেখান থেকে বই বিক্রি করে। পাঠক ঘুরে ঘুরে তাদের পছন্দের লেখকের বই ক্রয় করে। অনেকেই নবীন লেখকের বইয়ের কয়েক পাতা পড়ে, ভালো লাগলে সে বই নিজের ঝুলিতে পুরে নেয়৷ সম্পূর্ণ ফেব্রুয়ারী মাস লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকের কাছে আনন্দ ও উৎসবমুখর।
শত আনন্দের মাঝেও কিছু ব্যাথা থেকে যায়। সে ব্যাথা থেকেই এ লেখা লিখতে বসেছি। লেখাটি একটু বড় হলেও ধৈর্যসহকারে পড়ার অনুরোধ রইলো।

প্রথমেই আমি লেখকদের নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, বর্তমান সময় লেখালেখি খুব ভালো বিস্তার লাভ করেছে। প্রযুক্তি নির্ভর এই যুগে লেখালেখির জন্য খাতা-কলমের ব্যবহার করতে হয় না। এখন মানুষ অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিংবা ল্যাপটপ ব্যবহার করে থাকে। কারও কাছে যদি একটা অ্যান্ড্রয়েট ফোন থাকে আর সে যদি ইচ্ছে শক্তি থাকে তাহলে লেখালেখি করতে পারে।
লেখা প্রকাশের জন্যেও এখন আর পত্রিকার অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকলে সেখানে লেখা প্রকাশ করা যায়। লেখা প্রকাশের এতো এতো সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্বেও বই ছাপানোর ইচ্ছে একজন লেখকের থেকেই যায়। লেখকের জীবনে সব থেকে বড় পাওয়া হচ্ছে, তার লেখা দিয়ে বই প্রকাশ করা। সেটা নবীন হোক কিংবা প্রবীণ, ভালো হোক কিংবা মন্দ সব লেখকই নিজের বই প্রকাশ করতে চায়।
তবুও বর্তমান সময়ের লেখকদ্বয় বই প্রকাশের জন্য একটু বেশিই মরিয়া হয়ে উঠে। তারা তাদের সাহিত্য মান নিয়ে মোটেও ভাবে না। ভাবে একটা বই প্রকাশ করলেই সে লেখক হয়ে যাবে। কিন্তু একজন লেখকের বই প্রকাশ করার আগে অবশ্যই সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। লেখক’কে ভাবতে হবে তার বই পড়ে পাঠক কিছু পাবে কী না! যদি না পায়, তাহলে সেই লেখকের আপাতত বই প্রকাশ করার কোনো দরকার নেই। যখন ভালো কিছু লিখবে, তখন না হয় বই প্রকাশ করবে।
আর বর্তমান সময়ের বিষয়টা হচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো। কেউ দু’লাইন লিখতে পারলেই নিজেকে লেখক ভেবে বসে থাকে। লেখক ভাবুক তাকে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একটু লিখতে পেরে বই প্রকাশের জন্য যে মরিয়া হয়ে উঠে, এটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগে না। একবারও ভেবে দেখে না তার বই পড়ে পাঠক কিছু জানতে, বুঝতে, শিখতে পারবে কি না! আবারও বলছি যে বই মানুষের জানার, বোঝার এবং শেখার কাজে লাগে না সেই বই প্রকাশ না করাই ভালো।
এখন আমরা আরও একটা বিষয় দেখতে পাচ্ছি যে নায়ক, গায়কসহ অনেক সেলিব্রিটিই বই বের করছে। তারা যদি বই বের করে এটা নিয়েও আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে যদি তাদের বইগুলোতে ভালো সাহিত্য মান থাকে, তাহলে অবশ্যই তারা বই বের করতে পারে। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলে দেখা যায় বেশিরভাগ সেলিব্রিটির লেখায় কোনো সাহিত্যমান নেই। তাদের লেখা সম্পূর্ণ মানহীন। তারা যে পরিচিতি লাভ করেছে মূলত সেটাকে পুঁজি করে নিজের বই প্রকাশ করে। তাদের ভক্তবৃন্দরাও বই কেনার জন্য মেতে উঠে। আর এসব লেখক কম, সেলিব্রিটি বেশি মার্কা লোকদের বই প্রকাশ করতেই প্রকাশকগণ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমার মতে, লেখক সেলিব্রিটিকে অবশ্যই আগে একজন ভালো লেখক হতে হবে, তারপর বই বের করতে হবে।

এবার প্রকাশকদের কাছে আসা যাক। প্রকাশকেরা এখন সাহিত্য দেখে বই প্রকাশ করেন না, টাকা দেখে বই করেন। নবীন লেখক কোনো প্রকাশকের কাছে বই নিয়ে গেলে, প্রকাশক মনে করে যে একটা টাকার গাছ পেয়েছি। লেখকের লেখার মান যেমনই হোক, যদি বই প্রকাশ করতে হয় তাহলে অবশ্যই প্রকাশককে টাকা দিতে হবে।
নবীন লেখকদের ক্ষেত্রে রয়্যালটির কথা চিন্তা করাও পাপ। কেননা প্রকাশক দয়া করে তার বই প্রকাশ করে দিচ্ছে, এখানে আবার রয়্যালটি কী? উল্টো লেখকের নিজেকেই আরও টাকা দিতে হবে। তবেই না বই প্রকাশ হবে। নবীন লেখকের সে বইটি কবে প্রকাশিত হবে সেটা কিন্তু লেখক জানে না। প্রকাশক নিজে জানে নাকি এতেও সন্দেহ রয়েছে।
বেশির ভাগ প্রকাশক নতুন লেখকদের মুরগীর মতো ব্যবহার করে। প্রকাশকগণ তাদের বই মেলার শেষের দিকে নিয়ে আসে। যদিও মেলার শেষের দিকে বই নিয়ে এসেছে, তবুও সে বইয়ে ব্যবহৃত কাগজগুলো থাকে মানহীন। নবীন লেখককের এসব বিষয় মুখ বুঝে সহ্য করে নিতে হয়। বর্তমান সময়ের অনেক প্রকাশক আছে যারা সাহিত্যের কিছুই বুঝে না। তারা শুধুমাত্র নিজেদের পকেট গরম করার জন্য মানহীন বই প্রকাশ করে।
একটু আগে বলেছিলাম প্রকাশকগণ সেলিব্রিটিদের বই প্রকাশের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এর পিছনে তাদের অবশ্য অনেক বড় স্বার্থ রয়েছে। সেটা হচ্ছে কোনো সেলিব্রিটির বই প্রকাশ করা মাত্রই বিক্রি হয়ে যায়। অন্ধভক্তকুল তার বই কিনে নেয়। আর এজন্যই তাদের বই প্রকাশ করে, অনেক প্রকাশক লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নেয়। আর এই টাকা কামানের ধান্দা থেকেই তারা সেলিব্রিটিদের বই প্রকাশ করে।
নবীন অনেক লেখক আছে যাদের লেখার মান ভালো। কিন্তু টাকার অভাবে তারা বই প্রকাশ করতে পারে না। এমন কয়েকজন লেখকের সাথে আমার কথাও হয়েছে। যাদের কাছে বই প্রকাশের জন্য মোটা অংকের টাকা চেয়েছে। কয়েকজন টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করেছে। আবার কেউ কেউ টাকা না দেওয়ার কারণে প্রকাশ করতে পারে’নি।

মূলত লেখকের কাজ হচ্ছে লেখা। আর প্রকাশকের কাজ হচ্ছে অর্থের ধান্দা না করে, মানসম্মত লেখক’কে জাতির সামনে তুলে ধরা।আমার মতে লেখক, প্রকাশক সকলকেই যথাক্রমে মানহীন লেখা দিয়ে বই প্রকাশ এবং টাকার ধান্দা বাদ দিতে হবে। তাহলে পাঠক সমাজ শক্তিমান কিছু লেখক পাবেন। যাদের লেখা পড়ে পাঠক হাসবে, কাঁদবে, মুগ্ধ হবে।

আপনার মতামত দিন