সাক্ষাৎকার: কবি দরিদ্র হতে পারেন, গরিব হন না!

কবি ভাস্কর চৌধুরীর লেখা ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’ একটি বিখ্যাত কবিতা। আবৃত্তি শিল্পীরা বিভিন্ন মঞ্চে পড়ে থাকেন। ঘরবন্দী সময়ে অনলাইনে— পরিচয়ের মুখোমুখি হয়েছেন কবি ভাস্কর চৌধুরী । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল ইসলাম

সাইফুল ইসলাম: কবিতা আপনাকে কি দিয়েছে?

ভাস্কর চৌধুরী: আপনাদের ভালোবাসা।

সাইফুল ইসলাম: কবি হিসেবে নিজের প্রতি সন্তুষ্ট?

ভাস্কর চৌধুরী: না। তাই তো লিখি ও নিজেকে বদল করি। ভাঙ্গি।

সাইফুল ইসলাম: আপনার পছন্দের কবি কে?

ভাস্কর চৌধুরী: বিনয় মজুমদার, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত।

সাইফুল ইসলাম: এই সময়ের তরুণদের কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

ভাস্কর চৌধুরী: ভাবনার বিষয়। কারণ এখন কবিতা জটিল হয়ে আসছে। আমি এটি পছন্দ করি না।
আপনি যদি নিজে খেয়াল করেন, দেখবেন নির্মলেন্দু গুণ,আবুল হাসান, হুমায়ুন আজাদ বা মহাদেব সাহার পর কেউ এমনভাবে দাঁড়াতে পারে নি যে, নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে। তো আপনি স্বকীয় চিন্তার কবি বের করতে পারবেন? কেউ কি দাঁড়ালো?
তেলবাজি করে লিখা যায় না। সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

সাইফুল ইসলাম: বর্তমান সময়ে ইমতিয়াজ মাহমুদ ভালো লিখছেন। তাঁর কবিতা আমার ভালো লাগে। আরো অনেকে লিখছেন। ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা পড়েছেন?

ভাস্কর চৌধুরী: অনেকেই ভালো লিখছেন । তাদের নিজস্বতা কি গড়ে উঠেছে?

সাইফুল ইসলাম: আমার তো মনে হয় গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না খুব বেশি একটা, তাই জানতে পারছে না সবাই।
আরেকটি  প্রশ্ন, কবিতা লিখতে গেলে কি ছন্দজ্ঞান থাকা আবশ্যক?

ভাস্কর চৌধুরী: ছন্দ কবির মজ্জাগত বিষয়। আগে অনেকেই ছন্দ শিখে কবিতা লিখতেন। কবি আহসান হাবীব ছন্দ মাত্রাজ্ঞানহীন লেখকদের লিখা ছাপতেন না।
গদ্যেরও একটা ছন্দ আছে। পড়লে টের পাবেন। আমরা হয় কম পড়ি, নয়তো বেশি পড়ে গিলতে পারি না। কবিতায় বমি করি।
সবচেয়ে কষ্টের দিক হলো, কবিতার জন্যে এখন কেউ কষ্ট করে না তেমন।

সাইফুল ইসলাম: তরুণ কবিদের প্রতি আপনার পরামর্শ  কি থাকবে?

ভাস্কর চৌধুরী: সাধনা। কষ্ট করে নিজস্ব ভাষা ও বয়ান সৃষ্টি করা। শব্দের ভান্ডার বাড়ানো। জীবন থেকে অভিজ্ঞতা আহরণ করা। এসব মিলিয়ে কবি তাঁর আপন ভুবন তৈরি করবেন। যেন তার অন্তত আশি ভাগ কবিতা পড়েই বলতে পারা যায়, এটি অমুকের লিখা।

সাইফুল ইসলাম: আপনার লেখা একটি কবিতা, ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’ অসম্ভব জনপ্রিয়। হলফ করে বলতে পারি আবৃত্তি শিল্পীরা হাজারের ও বেশিবার বিভিন্ন মঞ্চে আবৃত্তি করেছে। এই কবিতাটা কতসালে লিখেছিলেন? কেন লিখেছিলেন, পিছনের গল্পটা যদি আপনার পাঠকদের বলতেন।

ভাস্কর চৌধুরী: এটি ১৯৯০ সালের ২ সেপ্টেম্বর লিখেছিলাম। এটির মূল কথাটি বুকে ঘুরতো। বন্ধু নিরঞ্জন ১৯৭৬ সালে খুন হবার পর থেকে। পড়ে নিজেই মানুষ শব্দটিকে এখানে আমি কয়েক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে এর একটি রূপকল্প সৃষ্টি করি। এটিই কবিতাটিকে সর্বজনীন করে তুলেছে। আমি মনে করি, আপনি যে কোনো অবস্থান থেকেই মানুষের সেবা করতে পারেন।

সাইফুল ইসলাম: এই কবিতাটি আসলে মানুষের কথা বলেই এতো জনপ্রিয়।
কবি হেলাল হাফিজ সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই, তাঁর লেখা ‘যে জলে আগুন জ্বলে ’ বইটি কেন বিখ্যাত হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

ভাস্কর চৌধুরী: আমার ও তাঁর প্রথম কবিতার বই ১৯৮৬ সালে অনিন্দ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। তখন তাঁর কবিতা ‘এখন যৌবন যার’ কবিতার কথা বলা হতো। পরে শিমুল মুস্তফা তার কবিতা আবৃত্তি করে তাকে স্পেস দেন।
আপনি তার অন্য সব কবিতা তাঁর সমকালীন কবি হুমায়ুন আজাদ, মহাদেব সাহা বা নির্মলেন্দু গুণ থেকে আলাদা করতে পারবেন না।

সাইফুল ইসলাম: আমার ভাবতে ভালো লাগছে এই ভেবে যে, আমি এই প্রথম কোনো একজন কবির সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। আর সেটি আপনি। তাই এলোমেলো প্রশ্ন করছি বলে দুঃখিত। আপনার প্রথম লেখা কবিতার কথা মনে পড়ে? আপনি কেন কবি হলেন? কবি না হলে কি হতেন?

ভাস্কর চৌধুরী: কবি হয়েছি পরে। ১৯৭৫ সাল থেকে তখনকার সকল কাগজে আমার গল্প ছাপা হতো। প্রথম প্রকাশিত বই গল্পের ছিলো। পরে উপন্যাসে চলে যায় ১৯৯৭ সালে। ২০০০ সালের ভেতর ভারতের তিনটি পত্রিকায় পুজো সংখ্যায় আমার উপন্যাস ছাপা হয়েছে।
তার সাথে কবিতাও চলতো। কবি আহসান হাবীব বার বার কবি বলেই সনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু আমি নিজেকে ঔপন্যাসিক ভাবতে পছন্দ করি।

সাইফুল ইসলাম: তাহলে আপনি আগে ঔপন্যাসিক! ইন্টারেস্টিং, অথচ আপনার বিখ্যাত কবিতাটির জন্য আমরা কবি হিসেবেই আপনাকে বেশি চিনি।
কবিদের যাপিত জীবন কেমন হওয়া দরকার বলে আপনার মনে হয়?

ভাস্কর চৌধুরী: সেটি সব রকম হতে পারে। তবে কঠোর সাধনা করে আপনাকে কবিতার নিজস্ব স্টাইল অর্জন করতে হবে।
আপনি আবুল হাসানের কবিতা সমগ্র পরে দেখবেন। কবিতা পত্রিকায় প্রকাশের পর অসুস্থ শরীরে কিভাবে তিনি সেগুলো এডিট করেছেন। আপনি কবিতার জগতে রুদ্রের নাম যুক্ত করতে দ্বিধা করবেন না। অল্প বয়সেই তিনি লিখেছিলেন কালজয়ী অনেক কবিতা।

সাইফুল ইসলাম: আবুল হাসান আমি পড়েছি। আবুল হাসান ও রুদ্র দুজনেই আমার পছন্দের।
কবিদের রাষ্ট্র, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে কি?

ভাস্কর চৌধুরী: আছে আবার নেই। পাঠকের কাছেও কবি দায়বদ্ধ নন। কবিতা প্রকাশিত হবার পর কবি তার কবিতার সাথেই বাঁচেন।  রাষ্ট্রীয় অনেক ব্যাপারে অনেক বিশ্ব মানের কবি যুক্ত হয়ে জেলে গিয়েছেন। তিনি কিন্তু মানুষের পক্ষে থেকেই লিখেছেন। এই পক্ষে থাকাটা কবির একটি দায়।

সাইফুল ইসলাম: আমি নিজেও কবিতা লিখি, কবিতা লিখতে গিয়ে আমাকে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে, কবিতা লিখে চুলায় হাড়ি জ্বালানো সম্ভব নয়, এসব বাদ দিয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দাও। আপনি কি বলবেন এই ব্যাপারে?

ভাস্কর চৌধুরী:  সেটি এখন খুব টাফ প্রশ্ন। যিনি কবিতা লিখতে চান, তিনি এখন হয়তো ভাত কাপড় ফ্ল্যাট বানাতে পারেন না। এখন পড়ার মানুষ কম।
তবু কবির জন্ম কেউ রোধে দিতে পারেন নি। রুদ্র অনেক কষ্ট করেছেন। বন্ধু আমার। কষ্টে ও অসুখে মারাও গিয়েছেন। রুদ্রের অভিজ্ঞতা ছিলো। সাধনা ও সাহস ছিলো।

সাইফুল ইসলাম: রুদ্রের সাথে আপনার ব্যক্তিগত কেমন সম্পর্ক ছিল?
যদি থেকে থাকে তাহলে যদি একটুখানি শেয়ার করতেন।

ভাস্কর চৌধুরী: খুব ভালো থাকলেও দূরে রাজশাহীতে থাকার কারণে সম্পর্ক মেইনটেইন করতে পারিনি।

সাইফুল ইসলাম: কোন কোন লেখকদের সংস্পর্শে এসেছিলেন?

ভাস্কর চৌধুরী: শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,রফিক আজাদ,বেলাল চৌধুরী,আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, আসাদ চৌধুরী, নুরুল হুদা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী,শামসুর রাহমান, আহসান হাবীব । এদের সাথে অনেক আড্ডা হয়েছে। আপনি আমার সাহিত্যতত্ত্ব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ গ্রন্থে এদের সম্পর্কে জানতে পারবেন। হুমায়ুন আহমেদ, মহাদেব সাহা, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জান ইলিয়াস সহ অনেকের সাথে গাঢ় সম্পর্ক আছে ও ছিলো। আবুল হাসান, বা নির্মলেন্দু গুণ, সুবোধ সরকার, শহীদ কাদরী সহ অনেকের সাথেই ছিলো গভীর সম্পর্ক। এখনও জীবিতদের সাথে আছে।

সাইফুল ইসলাম: আপনি কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

ভাস্কর চৌধুরী: হ্যাঁ। প্রথমে গুন দা। পরে বিনয় মজুমদার দ্বারা।

সাইফুল ইসলাম: লেখালেখি শুরু কোন পত্রিকা মারফৎ?

ভাস্কর চৌধুরী: ১৯৭৫ সালে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতা ও ইত্তেফাকে।

সাইফুল ইসলাম: শুরুর দিকে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন কি-না?

ভাস্কর চৌধুরী: না। কোনো দিন নয়। বাবা গাঁয়ের জমিতে একটা লাইব্রেরি বানিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানে কৈশোর থেকে অনেক দুষ্প্রাপ্য বই পড়েছি। আজো নিজের লাইব্রেরিতে পড়ি।

সাইফুল ইসলাম: আমি বলতে চাচ্ছিলাম  লেখা ছাপাতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন কি-না?

ভাস্কর চৌধুরী: না। আগে যখন তরুণ বয়সে লিখতাম, তখন সকল সম্পাদক ভালো লিখা পেলে  ছাপতেন। তখন এইসব কপি পেস্ট ছিল না। আমি রাজশাহী থেকে প্রচুর লিখা পাঠিয়েছি ও তারা ছেপেছেন। এখন পত্রিকার লেখা হয় না। এত লেখা ছাপবে কে। অনলাইনে ছাপে। লিটল ম্যাগ ছাপে।
এখন উপন্যাস ঈদ সংখ্যায় ছাপে। অসুবিধায় পড়ি নি।

সাইফুল ইসলাম: আচ্ছা! আপনি প্রথমে বলেছিলেন কবিতা লিখে ভালোবাসা পেয়েছেন। শুধুই কি ভালোবাসা পেয়েছেন? আর কিছু পাননি, বেঁচে থাকার শক্তি?

ভাস্কর চৌধুরী: হ্যাঁ। এখনো পাচ্ছি। সেটাও পাঠকের ভালোবাসা থেকেই।

সাইফুল ইসলাম: কবিতা লেখার জন্য নাকি অনেক বেদনা- বিচ্ছেদ দরকার। বেদনা ছাড়া কি কবি হওয়া যায় না?

ভাস্কর চৌধুরী: যাবে না ক্যানো? ভালোবাসা নিয়েই কবি গুন ও আবুল হাসান উপরে উঠেছেন।

সাইফুল ইসলাম: কবি কিংবা লেখক হিসেবে আপনি কি স্বপ্ন দেখেন?

ভাস্কর চৌধুরী: কিছুই না। পাঠক যখন ভালোবাসা দ্যান তখন কবির কিছু দরকার হয় না। গরিব ও দরিদ্রের মাঝে সূক্ষ্ম  তফাৎ আছে। কবি দরিদ্র হতে পারেন। গরিব হন না।

সাইফুল ইসলাম: শেষ প্রশ্ন— বাংলা ভাষা, সাহিত্য, কবিতা নিয়ে আপনাকে যদি ভবিষ্যৎ বাণী বলতে বলা হয়। তাহলে কি বলবেন?

ভাস্কর চৌধুরী: আশাবাদী।

সাইফুল ইসলাম: অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। সমৃদ্ধ হয়েছি। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

ভাস্কর চৌধুরী: অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মতামত দিন