সাহিত্য মানে ভাষার শিল্প !

সাহিত্যের সাধক কেমন হয় কেন হয়

তোফায়েল হোসেন

ভাষার উপর বিস্তর দখল থাকা আর সাহিত্যিক হওয়া একেবারেই ভিন্ন ব্যাপার। অবশ্য সাহিত্যিকের পক্ষে ভাষার উপর ভালো দখল থাকা উপরি সহায়ক। আবশ্যিকও বটে। হয়তো এজন্যই বলা যায়, সকল সাহিত্যিক ভাষাবিদ কিন্তু সকল ভাষাবিদ সাহিত্যিক নয়। কথাটা এতো সরল নয় যদিও। তবে শিরোনামের যথার্থতা বুঝতে কথাটা সহায়ক হবে।

‘সাহিত্য’ শব্দটির অনেক অর্থ। উল্লেখযোগ্য হলো–
ঝোঁক, আবেগ, প্রেরণা, সম্মুখে ঠেলে দেয়া, উদ্বুদ্ধ করা, প্ররোচিত করা, আকস্মিক শক্তি, আকস্মিক বেগ ইত্যাদি। শিক্ষা, বিদ্যা, এমনকি ঘাত, আঘাতও ‘সাহিত্য’ শব্দের অর্থ। সহিত থেকে সাহিত্য। সে অর্থে সাহিত্যের অর্থ সংসর্গ, মিলন, সাহচর্য ইত্যাদি। এক্ষেত্রে ‘ভালোর সহিত থাকা’কে ‘সাহিত্য’ বলার যে ধারা চালু রয়েছে সেদিকে আমরা যাবো না। যদিও এগিয়ে যাওয়ার সার্বিক অর্থ ‘ভালো’ই হয়ে থাকে।

আমরা ‘সাহিত্য’ শব্দের ব্যবহারিক অর্থকে প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা করতে চাই। সাহিত্য মানে ভাষার শিল্প। ভাষাকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করাকেই এক কথায় সাহিত্য বলা যায়। এই যে ভাষাকে উপস্থাপন, এর মাধ্যমে মূলত জীবন ও জগতকে উপস্থাপন করা হয়। আর সেই উপস্থাপনের লক্ষ্য থাকে মানুষ। মোটা দাগে বলা যায়, মানুষের সামনে শিল্পসম্মতভাবে ভাষার মধ্য দিয়ে জীবন ও জগতকে উপস্থাপনের নামই সাহিত্য। ভাষা হলো মানুষের সর্বোৎকৃষ্ট হাতিয়ার। যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। ভাষা বলতে এখানে লিখিত রূপকে বোঝানো হয়েছে। প্রাণীদেরও ভাষা আছে। সেগুলো আকার-ইঙ্গিতের ভাষা। কথ্য ও লিখিত রূপ নাই। মানুষকে উদ্দীপিত, জাগ্রত করার জন্য ভাষাকে শিল্পমন্ডিত করা আবশ্যক। পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন তুলবে, অনুরনন তুলবে, উদ্বেলনে উদাত্ত আহ্বান ধ্বনিত করবে। এর জন্য ভাষার যথাযথ ব্যবহারটি সাহিত্যিকের পক্ষে রপ্ত করা জরুরী। সেজন্য একজন সুসাহিত্যিক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এক সময় ভাষাবিদ হয়ে ওঠেন।

এত সংজ্ঞা-বিবরণে না গিয়ে সরাসরি বলা যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখগণ যা করে পরিচিতি পেয়েছেন তাই সাহিত্য। এভাবে বলার কিছু সমস্যা আছে। যেমন শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে একটি রাজনৈতিক পরিচয় ছিলো যেটা তাকে সাহিত্য চর্চা ছাড়াই ব্যাপক পরিচিতি এনে দিতে পারতো। বঙ্কিমচন্দ্রের পেশাগত পরিচয়ও ইতিহাসে তার নাম লিখে রাখার জন্য পর্যাপ্ত ছিলো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য সাধনা না করে বিপ্লবী রাজনীতিক হতে পারতেন। এক্ষেত্রে ক্ষুদিরাম, বিনয়-বাদল-দীনেশের স্মরণীয় হয়ে থাকার প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৈত্রিক ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচারক হয়ে অদ্যাবধি ইতিহাসে পরিচিত মুখ হিসেবে উপস্থিত থাকতেন কোনো প্রকার গল্প-উপন্যাস না লিখেই। কাজী নজরুল ইসলাম তো কমরেডই হতে চেয়েছিলেন। তাই সাহিত্যিকদের প্রধান কাজ কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখা হলেও তাদের পরিচিতির জন্য এই কাজগুলোই একমাত্র অবলম্বন ছিলো না। এই কাজগুলো না করেও তাদের স্মরণীয় হবার অনেক ক্ষেত্র ছিলো। সেসব ক্ষেত্রেও তারা সফলই ছিলো। কিন্তু তাদের সেই সফলতাগুলো সাহিত্য সাধনার সফলতার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে এই যা।

তাহলে কী সেই প্রেরণা যা একজন মানুষকে অন্য সব সাধনা বাদ দিয়ে শুধু সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন করে দেয়? খ্যাতি-যশ-নাম-অর্থ-প্রতিপত্তি? আমরা উপরের উদাহরণগুলো থেকে সহজেই বুঝতে পারি, এগুলোর কোনোটিই নয়। একজন রাধানাথ সিকদারকে, একজন ফজলুর রহমান খানকে, একজন সত্যেন বোসকে এগুলোর জন্য সাহিত্য চর্চা করতে হয় না। একজন মানুষ কবিতা লিখে আনন্দ পায়, গল্প লিখে আনন্দ পায়, মোট কথা সাহিত্য চর্চা করে আনন্দ পায়, এ আনন্দ তাকে চূড়ান্তভাবে সাহিত্যিক বানাতে পারে না। আনন্দের একঘেয়েমি আছে, আনন্দের ক্লান্তিও আছে। শুধু মানুষকে চমকে দিয়ে আনন্দ পাবার মাঝে কোনো গভীরতা নেই। সাহিত্যিক হতে হলে একজন সৃজনশীল মানুষের সামনে সুগভীর কোনো প্রেরণা থাকতে হয়। প্রেরণাটি আসে তার জীবন থেকে। কোনো বই থেকে নয়, কোনো গোষ্ঠী থেকেও না। বই তাকে কৌশল শেখাতে পারে। কিন্তু প্রেরণা আসে জীবন থেকে।

প্রেরণা হচ্ছে আসল ব্যাপার। একজন মানুষ গভীর ও সুদূরপ্রসারী কোনো প্রেরণা থেকে নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরতে তাগিদ অনুভব করে। নিজের কথা সবার করে তুলে ধরার মাধ্যমে সাহিত্যিক সবাইকে জাগ্রত করার প্রয়াস নেন। জীবনের গভীর ব্যঞ্জণা এবং সুমহান বোধকে উপলব্ধি করার সচেতন স্তরে উন্নীত করার দায়িত্ব পালন করেন। চিন্তার কারিগর কলম শ্রমিক সাহিত্যিকের মূল দায়িত্ব সমাজের অগ্রগামিতাকে বেগবান করা। এই দায়িত্বের বাইরে সাহিত্যিকের আর সব উদ্দেশ্যই উপজাত-অজুহাত মাত্র। শুধুই শিল্পের জন্য শিল্প কথাটা ব্যক্তির জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রযোজ্য, কিন্তু সামষ্টিক অর্থে ব্যক্তি একটি বিরাট কর্মযজ্ঞের অংশ মাত্র। এমনটা আমরা ইউরোপের রেঁনেসার সময়ে দেখেছি। রেঁনেসায় একটি বিপুল স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে ব্যক্তি অনেক সময় মনে করার সুযোগ পায় যে, শুধু শিল্পের জন্য শিল্প। অথচ সামষ্টিক অর্থে সে গভীর কোনো প্রেরণার উৎপাদ-উপকরণ মাত্র।

সাহিত্য কোনো বেগার খাটা নয়। ফরমায়েশী কাজও না। একান্ত নিজের কথা না হলে সাহিত্য হয় না। হলেও তাতে প্রাণ থাকে না। আর প্রাণহীন কথাবার্তা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিতে পারে না। ফলে সাহিত্যের কাজ যে, ‘সাথে থেকে’ ‘প্রেরণা’ দিয়ে ‘উদ্ধুদ্ধ’ করে ‘সম্মুখে এগিয়ে’ নেয়া, সেই কাজটিই আর হতে পারে না। নেহায়েত কিছু সাজানো কথাবার্তার আবোল-তাবোল হয়েই পুস্তকবন্দী থাকে। যারা শুধু ‘সাহিত্যিক হবো’ বলে কিছু নজর কাড়া বই প্রসব করতে প্রবৃত্ত হয় তারা সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পেলেও পেতে পারে কিন্তু সাহিত্যের মূল কাজটি তাদের দ্বারা হয় না বললেই চলে।

তো এই ‘সাথে থেকে প্রেরণা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করে সম্মুখে ঠেলে নেয়া’র অপ্রকাশ্য অথচ সুবিদিত কাজটি যারা করেন সমাজে তাদের গুরত্ব অপরিসীম। তারা অনেক ত্যাগও করেন। এই ত্যাগের মহিমা প্রাণ উৎসর্গের চেয়ে কম কিছু নয়। কেননা শুধু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের জন্য তারা নিজের জীবনকে পদে পদে বাজি ধরেন। অভিজ্ঞতা লাভের এই জুয়োখেলায় সাহিত্যিকের হারজিত বলে কিছু নাই। তবে প্রাণ খুয়ানোর ঝুঁকি থেকে যায়। সেই সাথে ভোগ-বিলাসীতা, প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রবল রমরমাকে বিসর্জন দিয়ে জনান্তিকের জীবন বেছে নেন। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ লিখতে একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পদ্মাপাড়ের জেলেপাড়ায় মাসের পর মাস কাটাতে হয়। জাহাজে করে পাচারকৃত ক্রীতদাসের যন্ত্রণা বুঝতে ‘রুটস’ উপন্যাসের লেখক অ্যালেক্স হ্যালি’কে সাগর পাড়ি দেয়া জাহাজের ডেকে ঘুমিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিতে হয়। প্রেমে পড়ে ও প্রেমে ব্যর্থ হয়ে হৃদয়বৃত্তির এপাশ ওপাশ নিজেকে অনুভব করতে হয়। উচ্চবিত্ত না হয়েও খানিক উচ্চবিত্ততার অভিজ্ঞতা এবং সর্বহারা না হয়েও সহায়-সম্বলহীন মানুষের জীবনকে হাতে-কলমে উপলব্ধি করে নিতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সাহিত্যিক তার লেখার উপাদানগুলোর বড় অংশটাই নেন নিজের জীবনের উপর ঘটে যাওয়া মহিমান্বিত ঘটনাগুলো থেকে প্রাপ্ত দুর্লভ সব অভিজ্ঞতার ভান্ড থেকে। নিজের যন্ত্রণা আর ভালো লাগাকে সবার সাথে ভাগ করে নেন। নিয়ে সবাইকে তাগিদ অনুভব করান। এভাবে আর কতোকাল চলবে এমন প্রশ্নেরও সম্মুখীন করেন পাঠককে। কিংবা এটা এতো ভালো তবে এটা সবার জন্য নয় কেন, এই প্রশ্নও তুলে ধরেন।

সাহিত্যিক তার কলমে যাই তুলে আনবেন তার সবকিছুর মধ্য দিয়েই নিজের যাওয়া নিশ্চিত করতে হয় তাকে। এই জন্য একজন সাহিত্যিকের কর্মকান্ডকে অনেক সময় সাধারণের কাছে পাগলামির মতো লাগে। কিন্তু এক্ষেত্রে সাহিত্যিক পাগল নয়, সাধক। একজন সাধক তার সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য যে গুরুতর ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করে সেটি খালি চোখে তাৎপর্যহীন। অথচ সাধকের কাছে সেটি জীবনের আর সব থেকে অধিক গুরত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যময়। কোনো মহৎ সাহিত্যিক নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরে একটি লাইনও লিখতে পারেন না। হোক সিরিয়াস কিংবা রম্য, নিজের প্রাণ থেকে উঠে না এলে কোনো লেখাই কলমের ডগায় ধরবে না তার। সাহিত্যিক সব সময় নিজের কথাই বলে চলে। নিজের কথা বলতে গিয়েই কথাগুলো সবার হয়ে যায়। সবাই যখন সেই লেখা পড়ে, তখন লেখকের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে আরো আলোকিত হয়। বিবেক ও বুদ্ধির নিরিখে সাহিত্য পাঠ করা মানুষ অধিকতর এগিয়ে থাকা মানুষ। মানুষকে এগিয়ে দেয়ার এই গুরত্বপূর্ণ কাজটি সাহিত্যের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

জীবনের সব কিছু ভোগ করতে চাওয়া মানুষ মোটেও সৃষ্টিশীল নয়। সব কিছু ভোগ করতে চাই, আবার দুচারখান ঝলক মারা লেখাও লিখতে চাই, লিখে সমাজে একটু পরিচিতি পেতে চাই, একটু নামটাম আর প্রতিপত্তি আয়ত্ত করতে চাই, এমন মনোভাবের মানুষগুলো কেরাণীসুলভ লেখক হয়ে থাকে, সমাজের মানুষকে সাথে থেকে প্রেরণায় দীপ্ত করে সম্মুখে ঠেলে নেয়ার কারিগর হতে পারে না তারা। এই ধারার লেখকরা সচরাচর খুব উন্নাসিক হয়। অন্তরে আলো নেই বলেই বাইরের এ হম্বিতম্বি। তবে প্রচারের আলোয় থেকে অনেক সময় জনপ্রিয়ও হয়। কিন্তু মানুষকে ঠেলে সামনের দিকে না নিয়ে বরং পেছনের দিকে নিয়ে চলে। সাহিত্য যে নিজের জীবন দিয়ে সাধনা করে চর্চা করার জিনিস, তাদের দেখলে এটা মনেই হবে না। সাধনায় সিদ্ধি লাভের প্রয়োজনে জীবনের অনেক বৈষয়িক প্রাপ্তিকে যে সচেতন ও অচেতনে প্রত্যাখান করতে হয়, এটাও মনে হবে না তাদের দেখলে। এভাবে গাছেরটা তলারটা খেয়ে প্রাণের সুর বাজানো অসম্ভব।

সাহিত্য দিয়ে প্রাণের ভেতর গিয়ে বাঁশি বাজিয়ে তোলপাড় তুলতে হলে নিজেকে বারবার আগুনে ছ্যাক দিতে হয়। আগুনে পুড়িয়ে অন্তর খাটি করতে হয়। বেদনার তীব্র দহনে পুড়ে পুড়ে নীলকন্ঠ হতে হয়। তবেই সৃষ্টির বীজক্ষেতে সোনার ফসল ফলে। তবেই সাহিত্য মানুষের প্রাণের কথা হয়ে সকলের অন্তরে সুর সঞ্চার করার সক্ষমতা ধারন করে। সেই সুরে মানুষের চেতনা শাণিত হয়। সামনের দিকে এগিয়ে দেয়ার কাজটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়।

আপনার মতামত দিন