সীমা রানী থেকে হিরা মনি : বেঁচে থাকুক লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মীগুলো

আপন অপু:

লক্ষ্মীপুর কি তবে শুধু নামেই লক্ষ্মী রয়ে যাবে! কাজে কোন দিন হবে না? এলাকার নেতাদের মুখে শুনেছি নেতাদেরকে নাকি প্রায়ই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলতেন- আগে লক্ষ্মীপুরের অলক্ষ্মী দূর করো। রাজনৈতিক অর্থে লক্ষ্মীপুরের অলক্ষ্মী দূর হয়েছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ লক্ষ্মীপুর থেকে সংসদে আসন পেয়েছে। আমার কথা সে বিষয়ে না। শুধু এইটুকুই এখান থেকে জানানোর ছিল যে- খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও লক্ষ্মীপুরের অলক্ষ্মী দূর করা নিয়ে কথা বলেছেন।
লক্ষ্মীপুরে এখনো অলক্ষ্মী দূর হয়নি। বরং লক্ষ্মীগুলোকেই একের পর এক ধর্ষণ করা হচ্ছে। ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে। এর দায় কার? কেন এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না ৬২ শতাংশ শিক্ষার হারের প্রিয় লক্ষ্মীপুর জেলা? শুধু শিক্ষিতই নয়, অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশি ধর্ম পরায়ণ এই জেলার মানুষ। ধর্ম পরায়ণতা কি তবে লোক দেখানো? ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে, ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী চললে তো লক্ষ্মীর ন্যায় কোমলমতি স্কুলছাত্রীগুলোকে গণধর্ষণের শিকার হয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ দিতে হতো না।

ঘটনা ২০১২ সালের ১৮ জুলাইয়ের। গভীর রাতে সদর উপজেলার বসুদহিতা গ্রামের লক্ষণ চন্দ্র দেবনাথের বাড়িতে মুখোশ পরা ১৪-১৫ জন ডাকাত হানা দেয়। ডাকাতেরা বাড়ির সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। এ সময় লক্ষণের মেয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সীমাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে গণধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এঘটনায় ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।

আর অতিসম্প্রতি ১২ জুন ২০২০। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গোপিনাথপুর এলাকায় নবম শ্রেনির ছাত্রী হিরামনিকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে সদর উপজেলার দক্ষিণ হামছাদী ইউনিয়নে। ওই কিশোরীর বাবা অসুস্থ, ঢাকায় চিকিৎসাধীন। তার মাও ঢাকায় বাবার সাথে। নানার বাড়ি থেকে শুক্রবার দুপুরে সে বাড়ি আসে। শনিবার তার ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল। বিকেলে ঘরে একা পেয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে ধর্ষণ করে। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

এই যে দুটি ঘটনা! আপনারা হয়তো অনেকেই সীমার কথা ভুলে গেছেন। বিচার হয়েছে সীমাকে ধর্ষণ শেষে হত্যার। কিন্ত সেটা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভুলে গেছে মানুষ। দুর্বৃত্তদের মনে এই বিচার কোন ভয় তৈরী করতে পারেনি। কারণ মানুষ জানেই না এই হত্যার বিচার হয়েছে, ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। জানবে কী করে! বিচারের এতো দীর্ঘসূত্রিতা হলে সেই বিচার কি মানুষের মনে দাগ কাটতে পারে? পারে না। কারণ একটা বিষয় তাৎক্ষণিক জনমনে যে আতঙ্ক বা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে সেটা সময় পার হয়ে গেলে প্রভাবশুন্য হয়ে যায়। এর মাঝেই কতো কতো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে গেছে প্রিয় লক্ষ্মীপুরে তার হিসেব কি আছে? একটি দৈনিক পত্রিকার ১৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলায় গত এক বছরে ৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল গণধর্ষণের ঘটনা। সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে অক্টোবর মাসে, নয়টি। এসব ধর্ষণের শিকার অধিকাংশই শিশু ও কিশোরী।

কিন্তু এগুলাতো শুধু মামলার হিসাবে। মামলা হয়না, শালিসে বা পারিবারিকভাবে চাপা পড়ে যায় কতো কতো ধর্ষণের কথা। আবার কেউ কেউ লজ্জায় সে কথা প্রকাশ করে না। এভাবেই কি তবে ধর্ষণে বা ধর্ষণের পর হত্যার মাধ্যমে পৃথিবী ছেড়ে যাবে লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মীগুলো?

দেশ চরম সঙ্কটের মুখে। সঙ্কটের মুখে লক্ষ্মীপুর জেলা। লক্ষ্মীপুরে ক্রমেই বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। অলরেডি রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত এই জেলা। জেলার মানুষের ভেতরে থাকার কথা ছিল অতঙ্ক। বাঁচার লড়াই করার কথা ছিল। কিন্তু তা না! নরপিশাচগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে! এদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। যেন সীমা হত্যার মতো মানুষ হিরামনি হত্যার কথাও ভুলে না যায়। এমন বিচার হওয়া উচিত যেন, কোন দুর্বৃত্তরা ধর্ষণের কথা মাথায় আনার আগেই এই বিচারের কথা মনে পড়ে।
আমার প্রত্যাশা এই ঘটনার বিচার যেন সারাদেশের জন্য দৃষ্টান্ত হয়। আর একটি লক্ষ্মীকেও হারাতে চাইনা আমরা। প্রাণের লক্ষ্মীপুরসহ পুরো দেশ থাকুক লক্ষ্মীময়।

শিশুসাহিত্যিক আপন অপু
আপন অপু

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী। সম্পাদক- পরিচয়।

আপনার মতামত দিন