স্মৃতিচারণ: চশমা ও ফুলটোক্কার দিনে

মুনিম রাব্বী

সূর্য কিছুটা হেলে পড়লে আর ঘর বন্দি থাকতাম না। তখনকার বিকেলের আলাদা একটা আবেদন ছিল, গন্ধ ছিল। প্রতিদিন রবির আলোয় একটু খানি ক্ষয় ধরলেই আমাদের পেয়ারা গাছে চড়ুইপাখির ঝাঁক এসে বসত । ওদের কলতানে বিকেলের বাতাস ভারী হয়ে উঠত । আকাশ বাতাস সমস্ত-ই কেমন আচমকা বদলে যেত। আমাদের বাসাটা ছিল উত্তরমুখী । বাসার জানালা থেকে উঁকি দিলেই মাঠ দেখা যেত । যেন প্রশস্ত সবুজ মাঠটা একেবারে বুক চিতিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে আমাদের। ঘন দূর্বা ঘাসে ঢাকা মাঠ আর তার চারপাশে ইটের খোপ খোপ প্রাচীর । প্রাচীরের গা ধপধপে সাদা। এত সুন্দর মাঠ আমি আর দেখিনি । মাঠের কোল ঘেঁষেই জোছনা দিঘি। কিংবদন্তী আছে অমাবস্যার রাতেও অনেকেই নাকি এই দিঘিতে চাঁদের ঢেউতোলা প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে। সেই চাঁদ নাকি আকাশের চাঁদের থেকে খানিক অন্যরকম আর উজ্জ্বল দেখাত।রাতে ও দিঘির ধারেকাছে না গেলেও পুরো বিকেল কাটত দিঘির কোলের ওই সবুজ মাঠেই ।
সে যাই হোক , এই সময়ে আমি আমার বন্ধুদের সাথে খেলায় মেতে উঠতাম ।প্রতিদিন বিকেলেই সরকারী অফিসারস কোয়ার্টারের সমস্ত মাঠ কানায় কানায় ভরে উঠত । আমরা সেই মাঠে গোল্লাছুট খেলতাম । সে কি দৌঁড় । কান ছুঁই ছুঁই চুল ছিল আমার । যখন দৌড়তাম সেই চুল কি দারুণ ভাসত বাতাসে। আম খেলাগুলো রকমভেদে পালাবদল হত । নানান রকমের খেলা খেলতাম আমরা। টানা কয়েকদিন হয়ত গোল্লাছুট খেলছি , তারপর কয়েকদিন ফুলটোক্কা , তারপর বৌছি, তারপর কানামাছি এভাবে আবার গোল্লাছুট, আবার ফুলটোক্কা,বৌছি, তারপর আবার কানামাছি  । সারাটা বিকেল তন্ময় হয়ে খেলতাম । আমাদের খেলার সেই মুহূর্তে মাঠ পাড়ার আশপাশটা মুখর হয়ে থাকত। কখন কিভাবে যে সময় কেটে যেত টের পেতাম না। মাগরিবের আজান দিলে চেতনা ফিরত ।
সেদিন আব্বুর অফিস বন্ধ ছিল। আব্বু সপ্তাহে অন্তত একদিন ছুটি পেতেন। কিন্তু এর আগে কোন বিকেলে এভাবে আব্বুকে পাইনি । ব্যস্ততার কারাগার থেকে আব্বু খুব একটা বের হতে পারতেন না । ছুটির দিনেও কোন না কোন ব্যস্ততা জুটেই যেত। আব্বু ছিলেন লম্বা চওড়া সুঠাম একজন মানুষ। মাঠের সাদা প্রাচীরের দেয়াল ছাড়িয়ে আব্বুর হাসি হাসি মুখটা দেখা যাচ্ছে । সেদিন বিকেলে খেলার মাঠে আব্বুর উপস্থিতি আমার উদ্যম চাঞ্চল্যে কিঞ্চিত বাঁধা দিলেও মনটা কেমন যেন উল্লসিত হয়ে উঠল ।মাঠের ছোট্ট গেট দিয়ে আব্বু মাঠে ঢুকলেন । তার গায়ে শরতের মেঘের রঙের শুভ্র পাঞ্জাবী। আমি খেলায় ঠিক মন দিতে পারছিলাম না । আমি ভাবতাম, আব্বু খেলতে জানে না ! বড় বয়সী মানুষেরা আবার খেলে নাকি। তাও আবার এই সব বাচ্চাদের খেলা? এই প্রথম আব্বুকে খুব অচেনা-অজানা মনে হচ্ছিল আমার । আমি ভেবে ভেবে খুব মজা পাচ্ছিলাম , এত বড় একটা মানুষ বাচ্চাদের মত খেলছে , দৌড়চ্ছে ! খেলার নিয়ম অনিয়ম নিয়ে দলাদলিও করছে । আব্বুর চোখে মুখে তার দুরন্ত শৈশবের ছাপ ফুটে উঠেছে । হায় আল্লাহ ! আব্বুও দেখি বোকা হতে জানে । জোড়ে দৌড় দিতে জানে, লাফ দিতে জানে, আবার অহেতুক হাসতেও জানে !

মধ্য বসন্তের হলদে গগনে তখন উচাটন পাখিদের নির্বিঘ্ন চলা ফেরা । দূর্বাঘাসের ধুলো উড়ে গেছে। আলো আর আধারের ভাগাভাগিতে দুনিয়ার সমস্ত ব্যস্ততা সেদিন আমাদের । আমরা ফুলটোক্কা খেলছি। খেলা দারুণ জমে উঠেছে। হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই যাকে বলে। ছোট ছোট কচি কাঁচাদের ভিড়ে আব্বু ও যেন অভিজ্ঞ শিশুর মতন । কপালে কপালে টোকা দিয়ে যাচ্ছি। দুর্দান্ত খেলছে আব্বু। পেটেপেটে তবে এই ছিল? এত ভাল খেলে তবুও রোজ কেন খেলাধুলা বাদ দিয়ে আব্বু অফিসে যায়?
আব্বু চশমা পড়তেন । সোনালী মেটাল ফ্রেমের বেশ বড় চশমা । চশমাটা পরে খেলতে অসুবিধে হচ্ছে আব্বুর। ফুলটোক্কা খেলতে চোখ বাঁধতে হয়। চশমা সহ চোখ বাঁধার যাচ্ছেনা । আব্বুর চশমা খুলে চোখ বাঁধা হল । চোখ বাঁধা নিয়েও সে কি কাণ্ড। কেউ বলল, ওই যে আঙ্কেল সব কিছু দেখতে পাচ্ছে ! আবার আব্বুকে থামিয়ে এঁটে-কষে চোখ বাঁধা হল। তবুও কেউ যেন ঠিকঠাক পেড়েই উঠছেনা না আব্বুর সাথে । বেলা শেষে সবার সাথেই কি দারুণ মিশে গিয়েছে আব্বু । আমরাই সবাই যেন আকারে বড়-সড় পাঞ্জাবী পড়া চুল-দাড়ি পাকা অভিজ্ঞ এক খেলার সাথী পেয়ে গেলাম। আমার বন্ধুরা সবাই তখন আব্বুকে ঘিরে ধরল। রোজ বিকেলে আব্বুকে এভাবে খেলতে হবে। খেলতেই হবে। একদম শক্ত পোক্ত কসম-টসম কাটিয়ে নিল সবাই। আব্বু বহু কষ্টে সবাইকে বুঝালো । রোজ বিকেলে না হলেও অন্তত শুক্রবার আব্বু আমাদের সাথে খেলবে।
আমি সেদিনের পর থেকে অন্য কেউ। রীতিমত বুক ফুলিয়ে হাঁটছি । বন্ধু মহলে আমার খায়-খাতির রাতারাতি বেড়ে গেল। আমার আব্বুকে নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। অন্য বন্ধুরাও নাকি বাড়িতে গিয়ে তাদের আব্বুদের কাছে বায়না জুড়েছে। তাদের সাথে খেলতে হবে। হিমেল , মুশফিক , সৌমিত্রের বাবারা নাকি রাজিও হয়ে গেছে। সৌরভের বাবা বরিশালে থাকে। ওর বাবা খেলতে পারবেনা । তাই ওর ভীষণ মন খারাপ। কিভাবে কিভাবে এক এলাহি কাণ্ড হয়ে গেল সরকারী কলোনিতে। এবার মহা এক খেলার বন্দোবস্তই হবে । ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাকে বলে। দামি দামি পুরষ্কারেরও আয়োজন করা হয়েছে । অফিসারস ক্লাবের সবাই মিলে বার কয়েক মিটিংও করেছে । আমাদের সবার মায়েদের জন্যেও আয়োজন থাকছে। এইবার সৌরভের মন ফিরল। সে এবার খুব খুশি ।
দিন ঠিক হয়েছে । আসছে শুক্রবারেই হবে খেলাধুলার মহা আয়োজন। দিনে দিনে সময় ঘনিয়ে এসেছে। দুই পাশে সামিয়ানা টানানো হয়েছে । সারি সারি চেয়ার বসিয়ে বানানো হয়েছে দর্শক গ্যালারী। আসরের নামাজ শেষেই সবাই মাঠে চলে এসেছে । খবর পেয়ে ছুটে এসেছে বাদাম ওয়ালা , বেলুন ওয়ালা। মাঠের এক পাশে বসেছে ফুসকা , শিঙাড়া আর জিলাপির দোকান। এই প্রথম এত কিছু ফেলে মাঠে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রতিযোগীতায় কয়েকটি ক্যাটাগরি করা হয়েছে । আমরা খেলব ফুটবল আর ফুলটোক্কা ।
প্রথমেই শুরু হল ফুটবল দিয়ে। এ যাত্রায় মানসম্মান ডোবার মত অবস্থা। গত কয়েক দিনের আত্মগৌরব সব মাঠে লাথি গুঁতো খাচ্ছে । হাফ টাইমের আগেই তিনখানা গোল হজম করতে হল। খেলা শুরুর আগেই সেরে ভূত হয়ে যাচ্ছি আমরা। আব্বু প্রথম প্রথম বেশ দৌড়ল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল ফুটবলে লাথি মারতে। এত বড় সাইজের একটা ফুটবলে লাথি মারাটা যে এত কঠিন আব্বুকে না দেখলে বুঝতাম না। নেয়ে ঘেমে আব্বু একাকার। তাই হাফ টাইমে আব্বুকে আর রাখা গেল না। বদলি হিসেবে নামানো হল মস্ত ভুড়ি ওয়ালা শাওনের আব্বাকে। ভুলটা চোখে পড়ল এবার। ভুড়িওয়ালা হলেও শাওনের আব্বু দারুণ খেলছে। তার কৃতিত্বেই দুটি চোখ ধাঁধানো গোল শোধ দিইয়েছি আমরা। যদিও হেরেছি , কিন্তু হারাটা খুব বেশী লজ্জার হয়নি। শাওন এবার বুক ফুলিয়ে আমার সামনে এসে পায়চারি করতে লাগল। মুক বেঁকিয়ে বলল , জানিস তো , বাবায় নাকি মোগো বয়সে এক্কেরে ম্যারাডোনার লাহান খেলতো। আইজ তো খ্যালতেই পারে নাই।পরথমেই যদি বাবারে নামান যাইতো , তাইলে কিন্তু মোরাই জিত্তা যাইতাম।
আমি মাথা নাড়ালাম। স্বীকার করতে হবে। এমন বড় ভুঁড়িওয়ালা একটা মানুষ যে এমন খেলবে তা কে জানত ? হেরে-টেরে আমরা সবাই মাঠে খানিক জিরিয়ে নিলাম। আব্বু টানটান হয়ে শুয়ে আছে। ক্লান্ত হয়ে যে শুয়ে আছে তেমনটা না । কি যেন ভাবছে। আকাশের দিকে চেয়ে আছে এক মনে। অনেক দিন এভাবে নিশ্চিন্তে আকাশটা দেখা হয়নি, তাই হয়ত।
এরপর অন্যদের আরও কয়েকটা ম্যাচ হল।আন্টিদের মধ্যেও বালিশ বদল খেলা হলো। খুব সাদামাটা খেলা। কিন্তু দারুণ জমে উঠেছিল। আজব ব্যাপার হচ্ছে , এখানেও শাওনের আম্মুর বাজিমাত। একেবারে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল । এ যাত্রায় শাওন আমার সামনে আসলে আমিই শাওনকে বললাম, আঙ্কেল আর আন্টির থেইক্কা খেলা-ধুলা কিছু শিইক্ষ্যা লইস ব্যাডা ।
প্রতিযোগিতার একদম শেষ সময়ে এবার ফুলটোক্কা খেলার পালা। এতক্ষণ ঝিম মেরে থাকলেও এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। এ খেলায় আমাদের হারাবে এমন কেউ এ তল্লাটে নেই। যথারীতি দুইটা দল করা হল। সবই ঠিকঠাক কিন্তু আব্বু হঠাৎ কেন যেন বেঁকে বসলেন। তিনি আর খেলবেন না। যথেষ্ট হয়েছে। এখন আর খেলতে ইচ্ছে হচ্ছে না আব্বুর। আমার কপাল হঠাৎ ঘেমে উঠল। খেলাধুলার ব্যাপারে আমারা তখন যথেষ্ট বলতে কিছুই বুঝতাম না। সারাদিন খেললেও ক্লান্ত হতাম না। কিন্তু আব্বু এইটুকুন খেলেই ক্লান্ত হয়ে গেছে। ততক্ষণে আমার চোখ জলে ডুবে গেছে। আমার চোখের সামনে সব কিছু কেমন ঘোলা হয়ে গেছে। আমি নিশ্চয়ই সেটা লক্ষ করেই আমার কাছে উঠে এসে দাঁড়ালেন। আমাকে কাঁধে তুলে এগিয়ে গেলেন। আব্বুর কাঁধে ভর করে সেই প্রথম যেন পাখির মত আকাশ ছুঁয়ে উড়তে লাগলাম । চোখের পানি উবে গেছে।
চশমাটা খুলে একপাশে রেখেছেন আব্বু। আব্বু আমাদের দলের ক্যাপ্টেন।গোল হয়ে আমরা আমাদের গোপন আলাপ সেরে নিলাম। শাওনের বাবা, সৈকতের বাবা ও আমাদের দলে। তারাও বেশ কিছু পরামর্শ করল। শুরু হল খেলা। বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রাও দারুণ। বিশেষ করে হিমেল আর হিমেলের বাবা। বাপ বেটা দুজনই সমান পারদর্শী।প্রথম ধাপেই আমরা এগিয়ে গেলাম । পরের ধাপেই আবার ওরা আমাদের ছুঁয়ে ফেলল প্রায়। তৃতীয় ধাপে আমাদের টপকে গেল। টোকা দেয়ায় আমাদের কিছু ভুল হচ্ছে। এই ভুল গুলো করছি মূলত আমরাই। আমরা গোল হয়ে আবার বুদ্ধি পাকালাম। এবার আব্বু কিন্তু বেশ সিরিয়াস।মাজায় গামছা বেঁধে নেমেছেন একেবারে। শেষের দিকে এসে খেলা জমে উঠেছে। শেষ মেষ সেই খেলায় আমরাই একটুর জন্যে রক্ষা পেলাম। মানে হারতে হারতে জিতে গেলাম। খুশিতে আনন্দে মাঠ ময় দৌড়াতে লাগলাম আমি , শাওন সহ অন্যান্য বাচ্চারা । বড়রা এই আয়োজন নিয়ে জয়ধ্বনি করতে করতে সামিয়ানার নিচে রাখা চেয়ারে বসে পরলেন।

সন্ধ্যা তখন বিকেল তাড়িয়েছে প্রায় । আলো ডুবে যাচ্ছে পশ্চিম কিনারায় । জোছনা দিঘির পানির রং কালো হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অনুষ্ঠান শেষে এবার বাড়ি ফেরার পালা । কিন্তু আব্বুর চশমাটা পাওয়া যাচ্ছে না । কখন, কোথায় কিভাবে হারিয়েছে কিচ্ছু খেয়াল নেই । আব্বুরও ঠিক মনে নেই আব্বু কোথায় রেখেছে। বন্ধুদের নিয়ে অনেক খুঁজলাম । সামিয়ানার নিচে, চেয়ারের আড়ালে খুব খুঁজলাম। আঁধার যখন কাল হয়ে এসেছে তখনও পর্যন্ত খুঁজছিলাম । বাসায় ফিরে যাব, ঠিক তখন, কিছুটা দূরে ঘন দুর্বার আড়ালে ল্যাম্প পোস্টের আলো জ্বলতেই চশমাটি চকচক করে উঠল । কে কী হারিয়েছে কিংবা কে কী ফিরে পেল জানা নাই, কিন্তু আমি যেন আমার প্রাণ ফিরে পেয়েছিলাম । ভাবছিলাম, আব্বুর চশমাটা যে আমারও।

সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ঠিকঠাক সূর্যকে এগারো বার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী। সেই চশমাটি এখনো আছে । খয়েরি রং এর পুরাতন একটা বাক্সে । বক্সটা একসময় সবুজ পাতার মত কিংবা সদ্য ফোটা গোলাপের মত নতুন ছিল। চশমার সোনালী রঙও ফিকে হয়ে গেছে বসন্তের অপরাহ্ণের মতন। চশমার পুরু কাঁচের গ্লাস দুটো হারানো অতীতের অন্তর্জলের আবছা কুয়াশায় ঘোলাটে হয়ে গেছে। তারপরে আর কোন দিন হাড়িয়ে যাওয়া চশমাটা আর খুঁজতে হয় নি আমাকে । ফুলটোক্কা দেব বলে সেই কপালটাই খুঁজেছি শুধু । জানি সে কপাল ধুলোয় ঢেকে গেছে , তবুও ।

(প্রচ্ছদ ছবি আর্ট করেছেন: ছাব্বির আহমেদ)

পড়ুন:https://porichoy.net/ডাক্তারি-দরগাহ/

আপনার মতামত দিন