স্মৃতিচারণ: মাকে মনে পড়ে

শফিক নহোর

আমি তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি ,‘মা’’ নানি বাড়ি গেলে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত । আমিও মায়ের সঙ্গে যেতাম খুব আনন্দ উল্লাসে । তার বিশেষ কিছু কারণ ছিল,

যে ক’দিন নানি বাড়িতে থাকবো সে ক’দিন লেখাপড়ার ঝামেলা নেই , আমিও একটু পড়া চোর তবে, তার খেসারত আমি এখন বেশ ভালই বুঝি । মাগরিব এর আযান হলো । মা’ নামাজ পড়তে বসেছেন । সন্ধ্যার পরেই আমার খিদে লেগে যায় ।

মা কে বললাম-
-মা’ আমি ভাত খাবো !’
-রান্না শেষ হলেই ভাত খেতে দিবো বাবা ,একটু সবুর কর বাপ ।
এই প্রথম নানি বাড়িতে এতোদিন থাকলাম । আহা রে ! সবার জন্য খুব মায়া হচ্ছে আমার ।
আমি লক্ষ্য করতাম ,
অনেক পথ চলে আসবার পরেও দেখতাম। ‘ মা’ পিছনে তাকিয়ে বার-বার কি যেন দেখতো , গাড়ির পর্দা সরিয়ে । মায়ের চোখে লেগে থাকতো জল ।মা’ বারবার শাড়ির আচল দিয়ে চোখ মুছত, আমাকে বুকে চেপে ধরে রাখত অনেকক্ষণ । মায়ের চোখের কুসুমগরম জল গড়িয়ে পড়ত আমার শরীরে । গরুর গাড়ি ছই চারপাশ শাড়ি দিয়ে ঢাকা থাকত, মা পদা সরিয়ে একটু পরপর দেখত;

এখনকার মানুষ এমন কেন? নানি বাড়ি থেকে আসবার দুই-তিন দেখতাম মায়ের মন খুব খারাপ হয়ে থাকত । তার বিন্দুমাত্র রেশও আমার স্ত্রীর মধ্যে দেখিনা ।‘ এখনকার মানুষ একটু কেমন যেন ?’

মাকে দেখতাম রাত একটু বেশি হলেই- আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো আর বিড়বিড় করে কি যেন বলতো ! ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না আমি ।‘ মা’’ কে প্রশ্ন করতাম-

– মা’’ তুমি আকাশের দিকে এতোক্ষণ তাকিয়ে কি দেখো ! মায়ের সহজ উত্তর ছিল তোর নানা ভাইকে দেখছি তারাদের সঙ্গে !
-‘মা’’ মানুষ মরে গেলে কি তারা হয়ে যায় ?’ ‘মা’’ নিশ্চুপ থাকতেন । তার দু’বছর পরে নানি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন তারাদের দেশে । সে-বছর ও আমি মায়ের সঙ্গে নানিকে শেষ দেখা দেখতে গিয়েছিলাম । খুব কান্না করেছিলাম নানিকে কবরে রেখে আসবার পর । আমার মাঝে মাঝে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতাম মা’’ আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখে,আর বিড়বিড় করে কী যেন বলে । আমি বোকার মতন প্রশ্ন করতাম-
– ‘মা’’ তুমি কার সঙ্গে কথা বলো?’ ও তুই বুঝবি না, রে খোকা ! আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতাম! কিন্তু কিছুই দেখতে পেতাম না । ‘মা’’ কি সত্যিই কিছু দেখতো …!

আমার জন্মের আগেই বাবা গত হয়েছেন । দাদা দাদির নিয়ে প্রশ্ন করলে বলতো মায়ের বিয়ের আগেই আমার দাদা দাদি পৃথিবী ত্যাগ করেছে,সত্যি খুব হতভাগা মনে হয় নিজেকে তখন । বেশ-কয়েক বছর হলো মা’’ আমাকে একা করে অভিমান করে অজানা দেশে চলে গেছে , আমি ও এখন মায়ের মতো গভীর নিশিতে একাকী আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি । মধুময় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়া দু’জনকে দেখি । চোখ ভিজে উঠে ।
– আমার আড়াই বছরের মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করে ।

-বাবা তুমি কি দেখ !
আমি চোখের জল আড়াল করে বলি, কিছু নারে-
-মা,
-এমনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি ।
-তুমি কান্না করছো কেন বাবা ?’
-তোমার কি অনেক কষ্ট ?’
-না রে, মা !’
-আমার কোন কষ্ট নেই ।,
বড় মানুষের কোন কষ্ট থাকে না । কষ্টরা ভয়ে পালিয়ে যায় ।
আমি ও তারাদের সঙ্গে কথা বলি একাকী ,
-ঠিক যেমন করে, মা’ বলতেন । আমার চোখ আরো ঝাপসা হয়ে আসে , মেয়েকে আড়াল করে চোখের জল মুছে নেই । কোন কোন নির্ঘুম রাত, কেটে যায় এমনি একাকী ।

আপনার মতামত দিন