ভ্রমণ: কক্সবাজার ও বাবার দেওয়া চমক

নাফিসা আনজুম নোভা

ডিসেম্বর ২০১৬, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শেষ। আমার ঘুরাঘুরি করতে খুবই ভালো লাগে। এইদিকে পরীক্ষার ঝামেলাও শেষ। কিছুদিন আমাদের বাড়ির আশেপাশে এবং আত্নীয় স্বজনদের বাড়িতে ঘুরাঘুরি করলাম। হঠাৎ একদিন বাবা বলল, চল সবাই দূরে কোথাও ঘুরে আসি। কথাটা শুনে আমার খুবই ভালো লাগল।দুইদিন পর সিদ্ধান্ত হলো কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যাবো পরিবারের সবাই মিলে। বলে রাখা ভালো, আমরা ২ ভাই-বোন। আমি আর আমার ছোট ভাই মাহিন; আমার বাবা একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা সহকারী শিক্ষক। সেই সিদ্ধান্তে ব্যাগপত্র গুছিয়ে ২৫শে ডিসেম্বর বিকেলে রওনা দিলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। বাবা কক্সবাজারগামী বাসের অগ্রীম টিকেট কেটে রেখেছিলেন। জানালার পাশের সিটে বসলাম আমি।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেখার জন্য অধীর আগ্রহে ছিলাম। আমি সারারাত অনেক আনন্দিত ছিলাম গাড়িতে। আমার আর তর সয়ছিল না! ঘুমও আসছিল না।
জেলা শহরগুলোতে প্রবেশের সময় বাবা আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। কুয়াশায় ঢাকা ছিল রাস্তাগুলো।২৫শে ডিসেম্বর বড় দিন হওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় দালান গুলো বিভিন্ন ধরনের লাইট দিয়ে সাজানো ছিল। আমার সব থেকে বেশি ভালো লেগেছে ভৈরব ব্রীজ। ছোটবেলায় দেখা সব থেকে বড় ব্রীজ। দুই পাশে ল্যাম্প পোস্ট; ব্রীজের মাঝ খান দিয়ে লাগানো ছিল ছোট ছোট গাছ। আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে! হটাৎ শেষ রাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও জানি না।

পরের দিন সকাল ৮টায় কক্সবাজার শহরে গিয়ে বাস থামলো। ঘুম ভেঙ্গে গেল, বাস থেকে নামলাম। একটা হোটেলে গিয়ে উঠলাম। সেখানেই আমার জীবনে প্রথম লিফটে ওঠা। প্রথম বার খুবই ভয় পেয়েছিলাম। বাবা আমাকে অভয় দিলেন, অত:পর সাহস করে লিফটে উঠলাম। তারপর চলে গেলাম আমাদের বুক করা রুমে। ফ্রেস হয়ে আমরা ব্রেকফাস্ট করলাম তারপর একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর বাবা বলল, এখন বীচে যাব। আমরা বীচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। অল্প সময়ের ব্যবধানে বীচে পৌঁছে গেলাম। হটাৎ বাবা “Happy Birthday To You!” বলে আমাকে চমকে দিল। সত্যিই আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আজ আমার জন্মদিন। বাবা বলল, কেমন লাগল! আমি অবাক হয়ে বললাম, ধন্যবাদ বাবা। সত্যি বলতে আমার এতটাই আনন্দ লেগেছিল যা লিখে প্রকাশ করার মত না! বাবা বলল, তোমার গিফট সময়মত পেয়ে যাবে।

তারপর সেখানে দুপুর পর্যন্ত কাটিয়ে আবার হোটেলে আসলাম, দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় বের হলাম শহর ঘুরে দেখার জন্য। বিভিন্ন দোকান ঘুরলাম। দোকান গুলোতে বেশির ভাগই ছিল শুঁটকি মাছ, আচার আর ঝিঁনুকের মালা। আমি অনেকগুলো মালা আর চকোলেট কিনেছিলাম, বাবা-মা আচার আর শুঁটকিমাছ কিনলেন। কেনাকাটা শেষে ফিরে আসলাম হোটেলে। তারপর দেখলাম আব্বু বার্থডে কেক এর ব্যবস্থা করেছেন। রুমে এসে কেক কাটলাম। আব্বু আর আম্মু তাদের আগে থেকে কেনা গিফট ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। এবারের জন্মদিন পালনটা ছিল খুবই আলাদা!

অনেক ক্লান্ত লাগতেছিল শরীর। ডিনার শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর ৪ টায় ওঠে রেডি হলাম। গন্তব্য টেকনাফ, সেখান থেকে জাহাজে করে সেন্টমার্টিন যাবো। বাসের সামনের সিটে চেপে বসলাম। দুই দিকে পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে আকা-বাঁকা রাস্তা। কত মনোরম যে তার সৌন্দর্য, তা বলে বুঝানোর মত না। খুবই আকর্ষণীয় জায়গাগুলো। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি! প্রকৃতির মনোরম, চিরসবুজ দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম টেকনাফ। সেখানে সকালের নাস্তা শেষ করে জাহাজে উঠলাম। আমার ভয় লেগেছিল তবুও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম নাফ নদীর সৌন্দর্য আর বিশালতা এবং মিয়ানমারের কিছু অংশ। ধীরে ধীরে সাগরের গভীরে যেতে লাগল জাহাজ। কখনো কখনো ছোট-ছোট দ্বীপ দেখা যায় আবার কখনো কখনো চারদিকে পানি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায়না।

২ ঘন্টা পর পৌঁছলাম সেন্টমার্টিনে; যা এত দিন ছিল শুধু বইয়ের পাতায় লেখা গল্প।
সেই দ্বীপ আজ আমার চোখের সামনে! আসলেই সেই অনুভূতি প্রকাশ করার মত না। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন জায়গা ঘুরার পর চললাম প্রবাল দ্বীপের তীরে। সে কী সৌন্দর্য! অনেকগুলো শামুক এক সাথে মিলে তৈরি হয়েছে বড় বড় পাথরের মত। সেই প্রবাল দ্বীপেই রয়েছে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ি “সমুদ্র বিলাস”। কাঠের তৈরি গেইট আর সৌন্দর্যে ভরপুর তাঁর বাড়ি। তবে ভেতরে প্রবেশ নিষেধ! বাইরে থেকেই উপভোগ করলাম সেই বাড়ির মনকাড়া সৌন্দর্য।

দ্বীপ ঘুরে দেখার পর, পরের দিন ফিরে আসলাম টেকনাফ এবং হোটেলে ফিরলাম। তারপর সবাই মিলে বের হলাম হিমছড়ির উদ্দেশ্যে। সেখানকার সৌন্দর্য সত্যি খুবই মনোরম আর অকল্পনীয়! রাস্তার এক পাশে পাহাড়, আরেক পাশে সাগর। সারাদিন হিমছড়ি ঘুরে, কক্সবাজারে চলে আসলাম। রাতে বাস, ফিরবো সেই চির-চেনা শহর শেরপুরে।

সেই দিনগুলো আজও মনে পড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত আর বাবার চমকে দেওয়া! আবারও যেতে ইচ্ছে করে সেখানে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, হিমছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই এতটাই বেশি সুন্দর যতটা বইয়ে বা পত্র-পত্রিকায় লেখা হয় আর টিভিতে দেখানো হয়; আর তা নিজ চোখে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। প্রকৃতপক্ষেই আমাদের দেশে দেখার মত অনেক জায়গা রয়েছে আর তাদের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মত না।

লেখক:
শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি;
আইডিয়াল প্রিপারেটরী এন্ড হাইস্কুল।
খরমপুর, শেরপুর।

আপনার মতামত দিন